প্রতিবেদন

সন্ত্রাস দমনে কঠোর অবস্থানে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে সরকার যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অবিচল আছে, তা আরেকবার প্রমাণিত হলো ‘হলি আর্টিজান’ মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে।
প্রায় সাড়ে ৩ বছর আগে বর্তমান সরকারের শাসনামলে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটেছিল নারকীয় জঙ্গি হামলা। অনেকেই ভেবেছিল, মামলাটির নিষ্পত্তি ১০-১৫ বছরের আগে হবে না। কিন্তু সরকারের কঠোর অবস্থান এবং সংশ্লিষ্টদের তৎপরতায় দ্রুততার সঙ্গে এই মামলার রায় ঘোষিত হলো। এতে দেশে বিদ্যমান অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠী যেমন হতোদ্যম হলো, তেমনি নিশ্চিত হলো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী হামলা মোকাবিলায় সরকারের দৃঢ় অবস্থান।
বাংলাদেশে ‘খিলাফত’ কায়েম, বিদেশি নাগরিক হত্যা করে আন্তর্জাতিক পরিম-লে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, জনমনে আতঙ্ক তৈরির মাধ্যমে সরকারের অবস্থানকে নড়বড়ে করে দেয়া এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস-এর দৃষ্টি আকর্ষণই ছিল হলি আর্টিজান হামলার মূল উদ্দেশ্য। নির্মম ওই হামলার মূল পরিকল্পনা করেছিল নব্য জেএমবির প্রধান সমন্বয়ক তামিম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান ও সারোয়ার জাহান।
হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল ৫ জঙ্গি, যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে নিহত হয়। হামলা প্রচেষ্টায় জড়িত ছিল নব্য জেএমবির ৭ জঙ্গি। এই ৭ জঙ্গিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- দিয়েছে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান। রায় শুনে দ-িত আসামিরা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দেয়। একই সঙ্গে বলে, ‘আমরা কোনো অন্যায় করিনি’। এ সময় তাদের অনেককে হাসতেও দেখা যায়। এ সময় তাদের মাথায় ছিল ‘আইএস টুপি’।
রায়ে বিচারক বলেন, পরিকল্পনাকারী ৩ জন ও অভিযুক্ত ৭ জঙ্গি একই অভিপ্রায় নিয়ে ৫ জঙ্গি রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিরবাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বলকে দিয়ে গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় বড় ধরনের হামলা চালিয়ে বহু দেশি-বিদেশি মানুষকে হত্যা করায়। সেই অভিপ্রায় বাস্তবায়নের জন্য আসামিদের মধ্যে কেউ পরিকল্পনা, কেউ অস্ত্র সংগ্রহ, কেউ প্রশিণ ও প্ররোচনা এবং কেউ পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়ে হামলা করে। এ কারণে ওই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী, সমন্বয়কারী, হামলাকারী ও হামলা প্রচেষ্টায় জড়িত কারো ভূমিকা ছোট বা বড় করে দেখার সুযোগ নেই। সকলেই একই অভিপ্রায় নিয়ে ওই নারকীয় হামলা প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ করে একই অপরাধ করেছে।
রায় ঘোষণার আগে বিচারক বলেন, রায় ঘোষণার পর মামলার পগণ প্রতিক্রিয়া দেখাবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য। সবকিছু বিবেচনা করেই রায় দেয়া হয়েছে।
এরপরই জনাকীর্ণ আদালতে রায় ঘোষণা করেন তিনি। রায়ে বিচারক বলেন, তামিম চৌধুরী, মারজান ও সারোয়ার জাহানের পরিকল্পনায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ৭ আসামির মধ্যে জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী পরিকল্পনা ও প্রশিণ দিয়ে সদস্য রিক্রুট এবং অস্ত্র সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করে। রাকিবুল হাসান রিগেন মূল হামলাকারীদের প্রশিণ ও প্ররোচনা দেয়। আব্দুস সবুর খান হামলার পরিকল্পনা ও অনুমোদন দেন। আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ অস্ত্র ও গুলি আনা-নেয়া করে এবং হামলার জন্য বসুন্ধরায় ভাড়া বাসার ব্যবস্থা করে। মামুনুর রশিদ অস্ত্র সরবরাহ করে এবং আসামি শরিফুল ইসলাম খালেদ হামলার পরিকল্পনার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে দেশি-বিদেশি ২৩ জনকে হত্যা, গুরুতর জখম এবং অন্যদের আঘাত করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(২)(অ) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে রাষ্ট্রপ। এজন্য ৭ জঙ্গিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ওই ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তাদেরকে মৃত্যুদ-ের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হলো। তাদের মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে মৃত্যুদ- কার্যকরের নির্দেশ দেয়া হলো। মৃত্যুদ-ের এ রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার ১ মাসের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ পাবে দ-িতরা।
এদিকে হামলার সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এ হামলা মামলার রায় ঘোষণার পর সরকারের শীর্ষ মহল থেকে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে এ রকম হত্যাকা- হলে তার বিচার অত্যন্ত দ্রুত হয় এবং সব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেই বিচার সম্পন্ন করার দৃষ্টান্ত আমরা বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করতে পেরেছি।
তবে আসামি পরে আইনজীবীরা বলছেন, তারা ন্যায়বিচার পাননি, রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
রায়ে বলা হয়, তামিম চৌধুরীর নেতৃত্বে এ হামলা সংঘটিত হয়। আসামি আসলাম হোসেন র‌্যাশের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
২০১৬ সালের পহেলা জুলাই রাতে হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা দেশি-বিদেশি নাগরিকসহ ২৩ জনকে হত্যা করে। পরে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত হয় ৫ জঙ্গি। এ ঘটনায় গুলশান থানায় দায়ের করা হয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা।
হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা হয় ১ জুলাই ২০১৬ রাত পৌনে ৯টায়। সন্ত্রাস দমন আইনে গুলশান থানায় মামলা দায়ের হয় ২০১৬ সালের ২ জুলাই। অভিযোগপত্র দাখিল হয় ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই। ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালনালে অভিযোগ গঠন হয় ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর। স্যাগ্রহণ শুরু হয় ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর। স্যাগ্রহণ শেষ হয় ২০১৯ সালের ২৭ অক্টোবর। যুক্তিতর্ক শেষ হয় ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর এবং রায় ঘোষিত হয় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর।
গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার বিচার বাংলাদেশের জন্য এক মাইলফলক বলে মন্তব্য করেছে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৬ সালের জুলাইয়ে হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলা ঘটনার বিচার সমাপ্ত হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ল্য করেছে। এ রায় বাংলাদেশের জন্য এক মাইলফলক। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার পুরো তদন্তকাজে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করতে পেরে সম্মানিত। বাংলাদেশকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং বিশেষ করে আইনের শাসন পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়তা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ।

নজিরবিহীন সেই হামলা
গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে হলি আর্টিজান বেকারি ও রেস্টুরেন্ট। দেশি-বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয় ওই রেস্টুরেন্টে সেদিন অতিথিদের মধ্যে জাপান ও ইতালির নাগরিকদের দুটি বড় দল ছিল। এছাড়া ছোট ছোট দলে বিভক্ত কিছু বাংলাদেশি এবং ভারত ও শ্রীলঙ্কার কয়েকজন নাগরিক ছিলেন।
তখন রাত পৌনে ৯টা। কারো কারো টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ খাবারের অর্ডার দিয়েছেন। হঠাৎ করে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেকারিতে ঢুকে পড়ে ২-৩ জন। পেছনে পেছনে আরো ২-৩ জন। তাদের কাঁধেও ব্যাগ। হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। তারা গুলি করতে করতে বেকারিতে ঢুকে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। হঠাৎ গুলি ও বোমার শব্দে আতঙ্কিত অতিথিরা ছোটাছুটি করতে শুরু করেন। কিন্তু তাদের থামিয়ে দেয় অস্ত্রধারী আগন্তুক দল। ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে তারা বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে জিম্মি করে ফেলে সবাইকে।
অস্ত্রধারীরা আগে লনে আক্রমণ করে। তারপর ভেতরে যায়। বিদেশিসহ ২০ জনকে প্রথমে গুলি করে, তারপর চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। যাদের বাঁচিয়ে রাখা হয় তাদেরকে সারা রাত বসিয়ে রাখা হয়। কাউকে কাউকে ঢাল হিসেবে ছাদে নিয়ে অস্ত্র হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। অনেককে রাতভর টয়লেটে, স্টোর রুমে আটকে রাখা হয়। সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দলের অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টের’ মধ্য দিয়ে জিম্মিদশার অবসান ঘটে। উদ্ধার করা হয় জীবিত জিম্মিদের। অভিযানে নিহত হয় ৫ জঙ্গি। এরপর একে একে উদ্ধার করা হয় দেশি-বিদেশি ২০ জনের লাশ। হলি আর্টিজানের পাচক সাইফুলের লাশও উদ্ধার করা হয়। আর আহত অবস্থায় উদ্ধারের পর জাকির হোসেন শাওন নামে হলি আর্টিজানের আরেক কর্মী ৯ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

জঙ্গিরা যেসব দেশি-বিদেশি
অতিথিকে হত্যা করে
জঙ্গিরা যেসব অতিথিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে তাদের মধ্যে ১৭ জন বিদেশি, ৩ জন বাংলাদেশি। বিদেশিদের মধ্যে ৯ জনই ইতালির নাগরিক। তারা হলেন নাদিয়া বেনেদিত্তি, ভিনসেনজো আলেস্ত্রো, কদিও মারিয়া দানতোনা, সিমোনা মন্তি, মারিয়া রিবোলি, আদেয়া পলিজি, কদিও কাপেল্লি, ক্রিস্টিয়ান রসি ও মার্কো তোনদাত। অন্যদিকে জাপানের ৭ নাগরিক নিহত হন। তারা হলেন তানাকা হিরোশি, ওগাসাওয়ারা, সাকাই ইউকু, কুরুসাকি নুবুহিরি, ওকামুরা মাকাতো, শিমুধুইরা রুই ও হাশিমাতো হিদেকো। নিহতদের মধ্যে ১ জন ভারতীয় নাগরিক। তার নাম তারিশি জৈন। আর নিহত ৩ বাংলাদেশি হলেন ফারাজ আইয়াজ হোসেন, অবিন্তা কবির ও ইশরাত আখন্দ। তাদের মধ্যে অবিন্তা কবির যুক্তরাষ্ট্রেরও নাগরিক।
অভিযানের শুরুতে নিহত হন
দুই পুলিশ কর্মকর্তা
জঙ্গিদের হামলার পরপরই বাইরে থাকা পুলিশ সদস্যরা গুলি ছোড়েন। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা খবর পেয়ে তাৎণিক হলি আর্টিজানের চারদিকে বাহিনী মোতায়েন করেন। পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), সোয়াট, র‌্যাব হলি আর্টিজান ঘিরে ফেলে এবং ভেতরে থাকা অতিথিদের উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তারা অভিযান শুরু করলে গুলি চালান জঙ্গিরা। জঙ্গিদের হামলায় ঘটনাস্থলে মারা যান ডিবির তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল করিম ও বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন।

আহত হন যারা
জঙ্গিদের ছোড়া গুলি ও বোমার আঘাতে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর অন্তত ৩০ সদস্য আহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন র‌্যাব-১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তুহিন মাসুদ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শেখ মো. মারুফ হাসান ও পুলিশের গুলশান অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল আহাদ।

আদালতে বিদেশি
সাংবাদিকদের সন্তোষ
রায় শোনার জন্য ৩ জন জাপানি সাংবাদিক ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হন। তারা হলেন তোহরু ফাকিদা, যিনি জাপানি সংবাদপত্র জিজি প্রেসের দিল্লি প্রতিনিধি, জাপানি দৈনিক ইওরি শিমবুন প্রতিবেদক শাও কমিরি ও জাপানি দৈনিক পত্রিকা দি আশাহি শিমবুনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক তাকেশি নারাবি। রায়ের পর তারা বলেন, ‘ভালো বিচার হয়েছে।’