প্রতিবেদন

সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা সত্ত্বেও জঙ্গিগোষ্ঠী এখনও গোপন তৎপরতায় লিপ্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা সত্ত্বেও জঙ্গিগোষ্ঠী এখনও গোপন তৎপরতায় লিপ্ত বলে জানা যাচ্ছে। নিষিদ্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) শীর্ষস্থানীয় নেতা সালাউদ্দিন সালেহীন সানি ভারতে ৬ বছর ধরে পলাতক থেকে গোপন তৎপরতা চালাচ্ছে। সেখান থেকেই বিভিন্ন গোপন অ্যাপসে নির্দেশনা দিচ্ছে মোস্ট ওয়ান্টেড এই জঙ্গি। সে অনুযায়ী বাংলাদেশে জেএমবিকে সংগঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে তার অনুসারীরা। এছাড়া জঙ্গিগোষ্ঠীর আরেকটি অংশ ‘লোন উলফ’ হামলার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে বলে জানা গেছে।
২৪ নভেম্বর রাজধানীর ভাটারা থেকে জেএমবি নেতা আবু রায়হান মাহমুদ ওরফে আবদুল হাদীকে গ্রেপ্তারের পর এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, রায়হানের সঙ্গে সালেহীনের নিয়মিত যোগাযোগ হতো কয়েকটি গোপন অ্যাপসে। সালেহীনের নির্দেশ ও পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশে জেএমবিকে সংগঠিত করার কাজ করছিল রায়হান।
২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে জেএমবি সদস্যরা। ছিনিয়ে নেয় প্রিজনভ্যানে থাকা সালেহীন, বোমা মিজানসহ তিন জঙ্গিকে। এরপরই সালেহীন ও মিজান ভারতে পালিয়ে যায়। গত বছরের আগস্টে ভারতের বেঙ্গালুরু থেকে গ্রেপ্তার হয় মিজান। কিন্তু সালেহীন এখনো অধরা।
২০০৫ সালে সারাদেশে সিরিজ বোমাহামলা মামলায় ফাঁসির দ-প্রাপ্ত সালেহীন ভারতের কোথায় আছে তা জানে না বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এ ল্েয জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান ডিআইজি মনিরুল ইসলাম।
সিটিটিসিপ্রধান বলেন, ভাটারা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া রায়হান সালেহীনের শ্যালক। সালেহীনই ২০১৭ সালে রায়হানকে জেএমবির বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আমির ঘোষণা করে তাকে কিছু দায়িত্বও দেয়।
সূত্র জানায়, অ্যাপসের মাধ্যমে রায়হানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আসছিল সালেহীন। কিভাবে জেএমবিকে সংগঠিত করতে হবে, অর্থ জোগাড় ও দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল সে। কিন্তু কোথা থেকে সালেহীন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে এ ব্যাপারে এখনো মুখ খোলেনি রায়হান।
ত্রিশালে প্রিজনভ্যান থেকে পালানোর পর সালেহীনকে ধরিয়ে দিতে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ সদর দপ্তর। ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ তাকে মোস্ট ওয়ান্টেড ঘোষণা করে। গণমাধ্যমের খবর, ভারতে গিয়ে এই জঙ্গি পশ্চিমবঙ্গে জেএমবির নতুন শাখা খোলে। যার নাম জামাআতুল মুজাহিদিন ইন্ডিয়া (জেএমআই)।
২০১৪ সালের অক্টোবরে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের খাগড়াগড়ের একটি বাড়িতে বিস্ফোরণে দুজন নিহত হয়। এরপর ভারতের এনআইএ সালেহীন ও বোমা মিজানের খোঁজ করতে থাকে। বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গেও তারা দফায় দফায় তথ্য বিনিময় করে। ফলে গত বছর মিজান গ্রেপ্তার হয় ভারতে। দেশটির আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো জেএমবির এক সময়ের শূরা কমিটির সদস্য সালেহীনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে বলে জানা গেছে।
গত বছর সালেহীনকে উদ্ধৃত করে ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ‘ভারত যাতে হিজরত আর জিহাদের একটি কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়, সে জন্য আমরা কাজ করছি, যাতে ভারতের মানুষ নতুন খিলাফতের ভিত্তি গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
২০০৫ সালে দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় বিভিন্ন থানায় সালেহীনের বিরুদ্ধে ৪০টির বেশি মামলা হয়। এর মধ্যে ১৩ মামলায় তার সাজা হয়। তিনটিতে হয় মৃত্যুদ-।

‘লোন উলফ’ হামলার পরিকল্পনা
জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে র‌্যাবের হাতে ঢাকা, গাজীপুর ও সাতীরা থেকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা বড় ধরনের হামলা চালাতে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করছিল। এছাড়া একাধিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। প্রশিতি জঙ্গিদের দিয়ে লোন উলফ (একাকী) হামলার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
সুনিশ্চিতভাবে কাউকে বা কোনো অনুষ্ঠানে বহু মানুষকে হত্যা করতে এ পদ্ধতিতে হামলা হয়ে থাকে। এ ধরনের হামলা মূলত আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের জঙ্গিরা করে থাকে। আনসার আল ইসলাম আইএসকে অনুসরণ করে থাকে। এজন্য আইএসের আদলে হামলার পরিকল্পনা ছিল।
সম্প্রতি র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মোজাম্মেল হক।
তিনি আরও জানান, রাজধানীর উত্তরা, গাজীপুর ও সাতীরার শ্যামনগর এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে আনসার আল ইসলামের ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৪। তাদের কাছ থেকে বিপুল উগ্রবাদী বই, মোবাইল, ল্যাপটপ ও জঙ্গিবাদী ট্রেনিংসহ বিভিন্ন কনটেন্ট জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে শফিকুল ইসলাম ওরফে সাগর ওরফে সালমান মুক্তাদির, ইলিয়াস হাওলদার ওরফে ছাত্তার, ইকরামুল ইসলাম ওরফে আমীর হামজা, আমীর হোসাইন ওরফে তাওহীদি জনতার আর্তনাদ, শিপন মীর ওরফে আবদুর রব ও ওয়ালিউল্লাহ ওরফে আবদুর রহমান।
র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক আরও জানান, একাকী হামলার ‘লোন উলফ’ পরিকল্পনা মোতাবেক রাজধানীর উত্তরা এলাকায় আনসার-আল ইসলামের কয়েকজন একসঙ্গে মিলিত হয়। তবে বাস্তবায়নের আগেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায় র‌্যাবের অভিযানে। জঙ্গিরা গোপন অ্যাপস ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে। সে বিষয়টি র‌্যাব জানতে পারে ও মনিটরিং করতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় অভিযান চালিয়ে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জঙ্গি সংগঠনটির সদস্যরা সাধারণত বড় ধরনের কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া কখনও একত্রিত হয় না। নিজেদের মধ্যে পরিচিত না হয়েই তারা কাট আউট পদ্ধতিতে চলাচল করে। সাংগঠনিক কার্যক্রমও চালায় অ্যাপস ব্যবহার করে।
গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই ২ থেকে ৫ বছর ধরে জঙ্গি সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত। তারা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিপ।ে তারা যেকোনো মূল্যে ‘ইসলামি খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বলে মনে করে, তাদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করে তারা।
অতীতের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আনসার আল ইসলামের সদস্যরা টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা চালায় না। তারা এেেত্র সাধারণত চাপাতি ব্যবহার করে থাকে।
আনসার আল ইসলাম বর্তমানে মূলত দুই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রথমত, মোটিভেশনাল কার্যক্রমের মাধ্যমে সদস্য বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, শিা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এ ধরনের কার্যক্রম চলছে। দ্বিতীয়ত, তারা মনে করে যারা তাদের জন্য বাধা তাদের সবাইকে হত্যা করলে ‘ইসলামি খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।