কলাম

সামাজিক সচেতনতাই পারে এইডস দূর করতে

ডা. মো. আশরাফুল হক
এইচআইভি/এইডস প্রথম ধরা পড়ে কঙ্গোতে ১৯২০ সালে, যখন শিম্পাঞ্জি থেকে মানুষের শরীরে তা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭০ দশকে তা মহামারি আকার ধারণ করে আশপাশের দেশগুলোতে। বিকৃত যৌনাচারের কারণে পশু থেকে মানুষ আক্রান্ত হয়।
সে-ই শুরু, এখনো চলছে। এতে আক্রান্তরা সবাই যে একই রকম যৌনাচারে লিপ্ত হওয়ার কারণে ভুক্তভোগী হয়েছে বা হচ্ছে, তা নয়। রক্তের মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়ছে মানুষ থেকে মানুষে।
বাংলাদেশে প্রথম এইডস রোগী ধরা পড়ে ১৯৮৯ সালে। তবে এর আগেই বিশ্বের সামগ্রিক পরিস্থিতির বিবেচনায় ১৯৮৫ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘধঃরড়হধষ অওউঝ ঈড়সসরঃঃবব (ঘঅঈ) গঠন করে। ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে এটি কখনোই আমাদের দেশে মহামারি আকার ধারণ করেনি। তবে দারিদ্র্য ও উচ্চহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আনুপাতিক কর্মসংস্থানের অভাব, লিঙ্গবৈষম্য ইত্যাদির কারণে এটিকে একেবারে নির্মূল করাও সম্ভব হয়নি।
টঘঅওউঝ-এর ২০১৮ সালের তথ্য অনুসারে দেশে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার, যার মধ্যে ১৫ বছরের ওপরের পুরুষ রোগীর সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার ৭০০, মহিলার সংখ্যা ৪ হাজার ৮০০’র বেশি এবং শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫০০। নতুনভাবে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০, যার মধ্যে পুরুষ ১ হাজার, মহিলা ৫০০’র কিছু কম এবং শিশু ১০০’র কম। প্রতি হাজারে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ০.০১ জন। প্রতিবছর শিশুদের এইডস হওয়ার সংখ্যাও বেশ আতঙ্কজনক, প্রায় ৪ হাজার ৫০০ জন। আক্রান্ত ১৪ হাজারের মধ্যে ৫ হাজার ১০০ জন তাদের বর্তমান চিকিৎসার অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত, বাকিরা উদাসীন বলা চলে।
যৌনকর্মীর সংখ্যা আনুমানিক ১ লাখ ১৪ হাজার প্রায়, যার মধ্যে এইচআইভি বিষয়ে জানে ৩১.২ শতাংশ, কনডম ব্যবহার করে ৬৬.৭ শতাংশ, এইচআইভি সচেতনতা প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে ১৫.২ শতাংশ, সিফিলিসে আক্রান্ত ২.১ শতাংশ।
পুরুষ-পুরুষ যৌনতায় আক্রান্ত প্রায় ১ লাখ ১ হাজার ৭০০, কনডম ব্যবহার করে প্রায় ৪৫.৮ শতাংশ, এইচআইভি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে ৪.৪ শতাংশ, সিফিলিসে আক্রান্ত ১.১ শতাংশ প্রায়।
শিরাপথে ইঞ্জেকশন নিয়ে থাকে প্রায় ৩৩ হাজার ১০০ জন, যার মধ্যে ২৬.৮ শতাংশ তাদের এইচআইভি বিষয়ক অবস্থান সম্পর্কে জানে এবং তাদের মধ্যে ৩৪.৯ শতাংশ লোক কনডম ব্যবহার করে যৌনমিলনের সময়।
তৃতীয় লিঙ্গের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ২০০, যার মধ্যে কনডম ব্যবহার করে ৪১.১ শতাংশ প্রায়, এইচআইভি প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্তের সংখ্যা প্রায় ৩৩.৩ শতাংশ।
এইচআইভি সংক্রান্ত জ্ঞান রয়েছে ১৫ থেকে ২৪ বছরের মেয়েদের মধ্যে ১২.৭ শতাংশের, আর ছেলেদের মধ্যে রয়েছে ১৪.৪ শতাংশের।
যেসব কারণে আমাদের দেশে এর বিস্তার হয় তার মধ্যে রয়েছেÑ
১. পেশাদার রক্তদাতা: দুর্ঘটনা হোক বা কাক্সিত অপারেশনেই হোক, নানা কারণে আমাদের রক্তের প্রয়োজন হয়। রক্তের কোনো বিকল্প নেই। রক্তদানের বিষয়ে আমাদের উদাসীনতার কারণে রক্তের অভাব সব সময়ই থেকে যায়, দ্বারস্থ হতে হয় অন্যজনের। এই সুযোগটি নেয় পেশাদার রক্তদাতারা।
২. সঠিক যৌন শিার অভাব: আমাদের শিাস্তরের যে পর্যায়ে সঠিক যৌন শিা দেয়া উচিত সেই স্তরে আমরা সেটি প্রয়োগ করতে পারি না নানা কারণে। ফলে এটি হয়ে থাকে নিষিদ্ধ জিনিস। মানুষের অদম্য প্রবৃত্তি হলো নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ। আকর্ষণ নিবৃত্ত করতে অনেকেই বিকৃত পথে যেতেও কুণ্ঠা বোধ করে না।
৩. ধর্মীয় শিার দুর্বলতা: ধর্মীয় শিা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। সেই ধর্মীয় শিা যারা দেবেন তাদের সঠিক জ্ঞান ও উৎকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারী হতে হয়। সেই স্থানটিতে ঘাটতি থাকলে তার পরিণাম হয় ভয়াবহ। মাঝেমধ্যে পত্রপত্রিকায় তারই প্রকাশ আমরা দেখতে পাই।
৪. জন্মনিরোধক ব্যবহারে উদাসীনতা: শারীরিক মিলনের মাধ্যমে এটি ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে সবচেয়ে বেশি। মিলনের সময় তাই কনডম ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু অনেকেই ভেবে থাকে এটি ব্যবহারে তৃপ্তি আসে না ঠিকমতো, তাই উদাসীনতা দেখায় এটি ব্যবহারে। যেহেতু এই রোগের প্রাথমিক লণ প্রকাশিত হয় গতানুগতিকের চেয়ে বেশ দেরিতে, তাই সর্বনাশ না হওয়া পর্যন্ত অনেকেই সঠিক পথে আসে না।
৫. ব্যবহৃত ইঞ্জেকশন সঠিকভাবে ধ্বংস না হওয়া: শিরাপথে যারা ইঞ্জেকশন নেয় তারা সাধারণত সহজে প্রাপ্য সিরিঞ্জ ব্যবহার করে। আজকাল ফার্মেসিতেও দেদার ইঞ্জেকশন দেয়া হয়। সেই সিরিঞ্জ সঠিকভাবে ধ্বংস না করে সাধারণ বর্জ্যরে মতো ফেলে দেয়া হয়। এমনকি সব হাসপাতালেও এসব বর্জ্য সঠিক উপায়ে ধ্বংস করা হয় না। ফলে যারা আবর্জনা পরিষ্কার করে তাদের কাছে এটি সহজেই পৌঁছে যায়। কিছু লাভের আশায় তারা সেগুলো বিক্রি করে দেয় অথবা নিজেরাই ব্যবহার করে, যদি তারা সেই ক্যাটাগরির হয়ে থাকে। ফলে একজনের শরীর থেকে অন্যজনের কাছে ছড়িয়ে পড়ে জীবাণু।
৬. উচ্চ জন্মহারের সঙ্গে আনুপাতিক কর্মসংস্থানের অভাব: কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকেই যৌনকর্ম পেশা বেছে নেয়, যেহেতু বিনা পুঁজিতে আয় সম্ভব। এসব যৌনাচারে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকেই।
৭. বিনোদনের অভাব: আমাদের দেশে বিনোদনের যেসব স্থান রয়েছে তার বেশির ভাগই সামর্থবানদের জন্য। নিম্নবিত্তদের জন্য বলতে গেলে কিছুই নেই। বিনোদন ছাড়া মানুষ সুস্থ থাকতে পারে না। বিনোদনের জন্যই অনেকে জড়িয়ে পড়ে অবৈধ পথে।
৮. পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রীর অভাব: যে মাত্রায় আমাদের দেশে এই রোগের চিকিৎসাসামগ্রী প্রয়োজন, তার অভাব সব সময়ই কিছু না কিছু থেকেই যায়। ফলে চিকিৎসা চলমান অবস্থা থেকে স্বল্প মাত্রা হলেও ঝরে পড়ে এবং আগের মতো রোগ ছড়াতে থাকে।
৯. বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রভাব: ১০ লাধিক রোহিঙ্গা আগমনে বর্তমানে আমরা বিপর্যস্ত। এসব জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই তাদের দেশে সামগ্রিক সুবিধাবঞ্চিত ছিল। রোগ প্রতিরোধ মতা থাকা তো দূরের কথা, তাদের অনেকেই বিপজ্জনক মাত্রায় রোগাক্রান্ত। আয়ের সুবিধার অভাবে তারা আমাদের দেশের অনেকের সঙ্গেই নানাভাবে শারীরিকভাবে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে ল্যমাত্রা অর্জনে সমস্যা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর।
এইচআইভি সম্পর্কিত জাতীয় প্রতিক্রিয়া বেশ কয়েকটি আইন ও কৌশল দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, এর মধ্যে রয়েছেÑ
১. নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন আইন (২০০২)।
২. জাতীয় এইচআইভি অ্যাডভোকেসি এবং যোগাযোগ কৌশল (২০০৫-২০১০)।
৩. জাতীয় এসটিআই (ঝঞও) পরিচালনার নির্দেশিকা (২০০৬)।
৪. রক্তের সুরার জন্য জাতীয় নীতি ও কৌশল (২০০০)।
৫. ভিসিটির (ঠঈঞ) জন্য নির্দেশিকা (২০০৮)।
৬. পিএলএইচআইভি (চখঐওঠ) হস্তেেপর জন্য জাতীয় এসওপি (২০০৯)। ওষুধ ব্যবহার এবং এইচআইভির জন্য জাতীয় তি হ্রাস কৌশল (২০১০-২০২২)।
৭. এইচআইভি/এইডস সম্পর্কিত ঝঃরমসধ এবং বৈষম্য হ্রাস সম্পর্কে প্রশিণ ম্যানুয়াল (২০১০)।
৮. এইচআইভি/এইডস ঝঃরমসধ এবং বৈষম্য টুলকিট (২০১১)। জাতীয় অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল (অজঞ) থেরাপি গাইডলাইনস (২০১১)।
৯. এইচআইভি/এইডস সম্পর্কিত সংশোধিত তৃতীয় জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা (সংশোধিত: ২০১১-২০১২)।
১০. সংশোধিত জাতীয় এইডস এমঅ্যান্ডই (গ্ঊ) পরিকল্পনা (২০১১-২০১৭)।
১১. পিএলএইচআইভির (চখঐওঠ) জন্য জাতীয় পুষ্টি নির্দেশিকা (২০১২)। ১২. বাংলাদেশে এইডস প্রতিক্রিয়া হ্রাসকারী শাস্তিমূলক আইন সম্পর্কিত জাতীয় পরামর্শ (২০১৩)।
১৩. এইচআইভি এবং জন্মগত ভারটিকেল ট্রান্সমিশন প্রতিরোধের জন্য জাতীয় নির্দেশিকা সিফিলিস (২০১৩)।
১৪. ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিশেষত ঝুঁকির মধ্যে বেশির ভাগের জন্য জাতীয় এইচআইভি ঝুঁকি হ্রাস কৌশল।
১৫. বাংলাদেশে এইচআইভি এবং এইডসে কিশোর-কিশোরীরা (২০১৩-২০১৫)।
১৬. আইডিইউ (ওউট) এবং এফএসডাবিব্লউ (ঋঝড) এবং যৌন সংখ্যালঘুদের জন্য ড্রপ-ইন সেন্টারগুলোর জন্য এসওপি (ঝঙচ) (২০১০ এবং ২০১২)।
১৭. বাংলাদেশে জাতীয় এইচআইভি প্রতিক্রিয়ার লিঙ্গ মূল্যায়ন (২০১৪)।
১৮. দ্রুত ট্র্যাক কৌশলগুলোর জন্য বিনিয়োগের েেত্র: এইচআইভিতে বিনিয়োগের বিকল্পগুলোকে প্রাধান্য দেয়া।
১৯. ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস শেষ করতে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া (২০১৫)।
২০. বাংলাদেশে এইচআইভি প্রতিক্রিয়ার জন্য লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলার জাতীয় কৌশল (২০১৭-২০২২)।
২০. ড্রাগ ব্যবহার এবং এইচআইভির জন্য জাতীয় য় হ্রাস কৌশল (২০১৭-২০২২)।

মূল প্রতিবন্ধকতা
যদিও এইচআইভির জন্য বাংলাদেশ উর্বর ত্রে হিসেবে বিবেচিত নয়, তবু দারিদ্র্য, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, লিঙ্গবৈষম্য ইত্যাদির কারণে ঝুঁকি থেকেই যায়।
এইচআইভি মোকাবিলায় যেসব সমস্যা রয়ে গেছে তার মধ্যে রয়েছেÑ
১. উদাসীনতা: রোগটির পরিণতির বিষয়ে উদাসীনতা যেহেতু রোগের লণ তৎণাৎ পরিলতি হয় না।
২. ধর্মীয় মূল্যবোধের ঘাটতি।
৩. ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর মধ্যেও মানসিক প্রবৃত্তির ঘাটতি।
৪. সুস্থ বিনোদনের সুযোগ না থাকা।
৫. আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রচার।
৬. যৌন নির্যাতন মারাত্মক আকার ধারণ করা।
৭. যৌনকর্মীদের উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকা।
৮. আইন ব্যবহারে উদাসীনতা।
৯. পাঠপরিক্রমায় সঠিক যৌন শিা সঠিকভাবে উপস্থাপনের অভাব।
১০. কোন স্থানে গেলে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে, সেটির প্রচারে ঘাটতি।
১১. চিকিৎসা কোথায় কোথায় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেই বিষয়ে জানার অভাব।
১২. ল্যাব পরীার সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকা।
১৩. ভাইরাস পরীার সুবিধা সব সময় চলমান না থাকা।
১৪. কিছু েেত্র সমন্বয়ের ঘাটতি প্রভৃতি।
এসব সমস্যা সমধানের সহজ রাস্তা বের করা গেলে অওউঝ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ঈড়সসঁহরঃরবং সধশব ঃযব ফরভভবৎবহপব সার্থক করা সম্ভব হবে বলে বিশ্বাস করা যায়।
লেখক: ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ