প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : পরিবেশের অবনতি রোধকল্পে সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশের আরো অবনতি রোধকল্পে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্যারিস চুক্তির সকল ধারাসহ প্রাসঙ্গিক সকল বৈশ্বিক চুক্তি ও প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
২ ডিসেম্বর স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ-২৫) লিডার্স সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যর্থতার ফলাফল সকল দেশের ওপর সমানভাগে, বিশেষ করে যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বেশি দায়ী তাদের ওপর বর্তাবে এবং আমাদের নিষ্ক্রিয়তা প্রত্যেক জীবিত মানুষের জন্য হবে মারাত্মক।
মারাত্মক পরিস্থিতি এবং মারাত্মক পরিস্থিতিতে রূপ নেয়া ঠেকানোর পদক্ষেপ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলা বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এবং রাজনীতিকদের দায়িত্ব উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সিদ্ধান্তহীনতার কারণে আমরা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারি না।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, এখন থেকে সকল আলোচনায় ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ নীতিকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং পর্যালোচনার মাধ্যমে লস অ্যান্ড ড্যামেজ অর্থায়ন বিবেচনায় ওয়ারস ইন্টারন্যাশনাল মেকানিজমকে আরো জোরালো সমর্থন দিতে হবে। কারণ জলবায়ু অর্থায়নের বৈশ্বিক চিত্রপট খুবই সমন্বয়হীন, জটিলতাপূর্ণ ও অপ্রতুল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্যারিস চুক্তিতে ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথকীকৃত দায়িত্ব’ নীতির ভিত্তিতে বিশেষ পরিস্থিতি এবং স্বল্পোন্নত দেশসমূহ ও ‘বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশসমূহ’-এর প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। জলবায়ু অর্থায়নের প্রত্যেক সরবরাহ প্রক্রিয়ায় এই স্বীকৃতি মেনে চলতে হবে। প্যারিস চুক্তির কাঠামো ও বাস্তবায়নের আলোকে সমতা অথবা স্বচ্ছতার ধারণা একটি মৌলিক ইস্যু, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সহযোগিতায় এই চুক্তির সুফল অর্জিত হতে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মানবসভ্যতার ক্ষতি করছে এবং পৃথিবীকে ধ্বংস করছে। এটি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশসমূহের অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। আমরা আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানবইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইপিসিসি’র ১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড রিপোর্ট যদি যথেষ্ট ক্ষতিকর হয়, তবে বৈশ্বিক জলবায়ু ২০১৮-এর ওপর সাম্প্রতিক ডব্লিউএমও’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমরা যা ভাবছি, পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ।
পরিস্থিতি পয়েন্ট অব নো রিটার্নের দিকে দ্রুত ধাবমান হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ ৪৫ শতাংশ কমিয়ে এনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব হ্রাস করানো এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ বন্ধে সক্ষমতা অর্জন করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি এটিকে হালকা করে দেখার চেষ্টা করি তা হলে আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবো এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এ দেশের বিপুলসংখ্যক লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ এই হার ৯ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি ৬.৭ শতাংশে নেমে যেতে পারে।
সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ২০৮০ সাল নাগাদ প্রায় ৪ কোটি লোক গৃহহীন হবে। গত এপ্রিলে ইউনিসেফ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থিতিস্থাপকতা ও অভিযোজন বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ৬০ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে এবং বাংলাদেশে ১ কোটি ৯০ লাখ শিশু ইতোমধ্যে ঝুঁকিতে পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী প্রভাব বন্ধ করা না গেলে আমরা কখনোই এসডিজি অর্জন এবং দারিদ্র্য নির্মূল করতে পারবো না। যদিও সম্পদের স্বল্পতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
বদ্বীপ অঞ্চলে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডসের সহায়তায় ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ প্রস্তুত করেছে। আমরাই প্রথম এলডিসিভুক্ত দেশ, যারা ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছে। আমরা এ পর্যন্ত আমাদের নিজস্ব উৎস থেকে প্রশমন ও অভিযোজন ক্ষেত্রে ৪১ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয় করেছি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। এই ইস্যু মোকাবিলায় বাংলাদেশে ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান ও বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্রাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্লান ২০০৯ রয়েছে। পাশাপাশি ন্যাশনাল স্ট্রাটেজি অন দ্য ম্যানেজমেন্ট অব ডিজাস্টার অ্যান্ড ক্লাইমেট ইনডিওস ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্টও রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সরকার ৬৪ জেলার সবক’টিতে সেক্টরভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করেছে। প্যারিস চুক্তি মোতাবেক দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার ঘোষণা করেছে এবং আশা করছে, অন্যরাও তাদের নিজস্ব অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ২০৪১ সাল নাগাদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের শতকরা ৩০ ভাগ অর্জনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা গ্রহণ এবং যথাযথভাবে কাজ সম্পাদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নৈমিত্তিক বৃক্ষরোপণের বাইরে আমরা ২০২০ সাল নাগাদ ১ কোটি গাছ রোপণ করতে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ তার উদ্ভাবনী অভিযোজন ও প্রশমন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জলবায়ু-স্থিতিশীল দেশে পরিণত হয়েছে এবং সফলভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি কমাতে সক্ষম হয়েছে, অন্যান্য দেশের জন্য যা অনুসরণযোগ্য হতে পারে। আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি ও অনুশীলন ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও অনুসরণযোগ্য হচ্ছে।
বাংলাদেশের সংসদে সম্প্রতি বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অন্যান্য দেশের পার্লামেন্টে উদ্যোগ গ্রহণের বৈশ্বিক জরুরি আহ্বান জানিয়ে জলবায়ু ঝুঁকির বর্তমান অবস্থা ঘোষণার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতির তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ২০১৬ সাল ছিল ৩ গুণ Ñ এ কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির ঘটনা বাংলাদেশে অনুরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ১১ লাখ রোহিঙ্গার উপস্থিতি পরিবেশগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কক্সবাজারে একটি পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতির অবস্থা সৃষ্টি করেছে। বন, পাহাড়, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জীবন-জীবিকার ক্ষতি করেছে। তাই আমরা ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন কি ধরনের বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, তার একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। আমি সতর্ক করে দিতে চাই যে, সহিষ্ণুতা ও অভিযোজনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমাদের উচিত শিল্পবিপ্লবপূর্ব পর্যায়ের অবস্থায় অর্থাৎ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির প্রবণতা বন্ধ করতে কাজ করা।
শেখ হাসিনা বলেন, যেহেতু আমাদের কোনো ভুল না থাকা সত্ত্বেও আমাদের লোকজন বাস্তুচ্যুত হবে, তাই আমরা আশা করি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের আবাসনের দায়িত্ব নেবে এবং তাদের জীবিকার সুযোগ দেবে। অনেকের মধ্যে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণের আগ্রহের অভাব সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ সম্মিলিত প্রয়াসের ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী এবং জাতিসংঘ হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত প্ল্যাটফরম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সম্ভবত আমাদের সময়ের সবচেয়ে কঠিন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানবইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক অতিক্রম করছি। আমরা যদি শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের শিশুরা আমাদের ক্ষমা করবে না। ১৯৯২ সালে ধরিত্রী সম্মেলন শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা গ্রিন হাউস গ্যাস হ্রাসের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম হইনি। এর নিঃসরণ এখনো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রবণতা বিশ্বের জন্য এখনও টেকসই নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালেতে ২০০৯ সালের নভেম্বরে ফোরামের প্রথম বৈঠকের পর থেকে বৈশ্বিক জলবায়ু ভূপৃষ্ঠের যথেষ্ট পরিবর্তন করেছে। হতাশার বিষয় হলো ইউএনএফসিসিসি প্রক্রিয়ার আওতায় এই অগ্রগতি খুবই ধীর এবং অত্যন্ত অপ্রতুল। বিশেষত আমাদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে জাতীয়ভাবে দৃঢ় অভিযোজন উদ্যোগের সমর্থনে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ এখনো কঠিন বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব দেশ ইতোমধ্যে যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করেছে বিশেষত সেসব দেশের ক্ষেত্রে শর্ত ও ক্রাইটেরিয়াসহ তহবিল ও প্রযুক্তির সরাসরি ও সহজ প্রাপ্তি সহায়ক হতে পারে। আমাদের মতো সর্বাপেক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, যেগুলোকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন সেসব দেশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছে না। নতুন ক্লাইমেট ভালনারেবল ফান্ড (সিভিএফ) ও ভি-টুয়েন্টি ট্রাস্ট ফান্ড সৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি নতুন স্পেশাল রেপোর্টার-এর সম্ভাবনা হবে একটা বড় সাফল্য। সিভিএফ এবং ভি-টুয়েন্টি সাউথ সাউথ এবং ট্রায়ঙ্গেল কো-অপারেশনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আমরা এর সাফল্যকে আরো বিকশিত করতে চাই। আমরা আমাদের অভিযোজন প্রচেষ্টা জোরদার করতে নেদারল্যান্ডসে ২০২০ জলবায়ু অভিযোজন সম্মেলনের দিকেও নজর রাখছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেজ, ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট, কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট কার্লোস আলভারাডো কুইসাদা, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট হিলদা হেইন, ইউএনএফসিসিসির নির্বাহী সম্পাদক প্যাট্রিসিয়া এস্পিনোসা এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বাচলেট জেরিয়া লিডার্স সামিটে বক্তব্য রাখেন।