প্রতিবেদন

জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে রেকর্ড, মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এখন বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই উদাহরণ। অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক, বেশিরভাগ সূচকে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশকে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে ছাড়িয়েছে তো অনেক আগেই।
দীর্ঘদিন ৬-এর ঘরে আটকে থাকার পর প্রবৃদ্ধির হার ৪ বছর আগেই ৭-এর ঘরে পড়েছে। চলতি অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৩ শতাংশ হবে বলে ইতোমধ্যে সরকার থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের নিরন্তর প্রচেষ্টায় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে রেকর্ড এবং মাথাপিছু আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়তির দিকে রয়েছে।
বাংলাদেশের জিডিপি সমীকরণের মূল ৪টি উপাদান Ñ ভোগ, বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় ও আমদানি-রপ্তানির পার্থক্য কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। উপাত্তে দেখা যাচ্ছে যে, ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে পাবলিক ও প্রাইভেট বিনিয়োগে দুটোই বেড়েছে। মোট অঙ্কও বেড়েছে, বর্ধিত জিডিপির অংশ হিসেবেও বেড়েছে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ২০১৭ সালে ছিল জিডিপির ২৩.১০ শতাংশ, তা ২০১৮-তে হয়েছে ২৩.২৬ শতাংশ এবং ২০১৯-এ হবে ২৩.৪০ শতাংশ।
সরকারি বিনিয়োগ ২০১৭-তে ছিল জিডিপির ৭.৪১ শতাংশ, ২০১৮ সালে হয়েছে ৭.৯৭ শতাংশ এবং ২০১৯-এ তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ৮.১৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ফেব্রুয়ারি ২০১৮-তে মোট ঋণ প্রবাহ ছিল ৮ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা, ২০১৯-এর ফেব্রুয়ারিতে তা দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা।
আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে তারা পারিবারিক বা স্থানীয় সঞ্চয় ব্যবহার করেও উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। বিনিয়োগ বিবেচনার ক্ষেত্রে এসব বিনিয়োগ হিসাবভুক্ত না হলেও উৎপাদন পর্যায়ে হিসেবে এসেছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে মেগা প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব বিশাল ব্যয় প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে ধনাত্মক প্রতিক্রিয়া রাখতে বাধ্য।
মাথাপিছু আয় যেহেতু বেড়েছে ভোগও স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। বিভিন্ন উৎসব পার্বণেও ভোগব্যয় চোখে পড়ার মতো।
স্বল্পকালীন বিরতির পর রেমিট্যান্স আয় আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, চলতি আয় বর্ষে একই সময়ে এ অঙ্ক ছিল ১০.৭ বিলিয়ন ডলার। এ বাড়তি ১.২ বিলিয়ন ডলারের একটা বড় অংশ অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে।
রপ্তানিও বেড়েছে। বর্তমান বছরে রপ্তানি বেড়েছে ১২.৫৭ শতাংশ, পূর্ববর্তী বছরে এ হার ছিল ৬.৩৩ শতাংশ।
ভোগ, বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় ও রপ্তানি এগুলো যদি না-ও বাড়ে তবুও একটি বিকাশমান অর্থনীতিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব- ওহপৎবসবহঃধষ ঈধঢ়রঃধষ ঙঁঃঢ়ঁঃ জধঃরড় (ওঈঙজ) হ্রাস পাওয়ার মাধ্যমে অর্থাৎ দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। বাংলাদেশে ওঈঙজ ৩.৯৭ হতে ৩.৮৮-এ নেমেছে। এর ফলে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগদক্ষতা বৃদ্ধিজনিত কারণে অধিকতর দ্রব্য ও সেবা উৎপাদন বাড়তে পারে।
এ কথা সুস্পষ্ট যে, গত ১০ বছর ধরেই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজ চলছে। উন্নয়নকৌশলে উৎপাদনের উপকরণের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করে দক্ষতা পারদর্শিতানির্ভর উন্নয়নকৌশলে জোর দেয়া হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে অর্থ বিভাগ কর্তৃক চলমান একটি প্রকল্পের সহায়তায় ইতোমধ্যে স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি, হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, স্কিল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়েছে। বিভিন্ন ট্রেডে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ চলছে পুরোদমে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনলাইন সেবাও চলছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। অর্থনীতিতে এসবের ধনাত্মক প্রভাবই পড়ছে।
বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোরূপ সংশয় নেই। এডিবির এপ্রিল, ২০১৯ প্রকাশিত বাংলাদেশ ফ্যাক্ট শিট-এ ২০১৮ সালের জুনে সমাপ্ত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলিত হার দেখানো হয়েছে ৭.৯ শতাংশ।
১০ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে (একনেক) মাথাপিছু আয় ও প্রবৃদ্ধি বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে। মাথাপিছু আয় একই হলেও টাকার হিসেবে ৩৮০ টাকা বেড়েছে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত মার্চে খসড়া হিসাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১৩ হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল। গত ১৯ মার্চ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে।
২০১৭-১৮ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ২০১৬-১৭ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ১১ শতাংশ।
এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এখন থেকে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর দ্রুত যাতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা যায় তার ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিবিএসের হালনাগাদ প্রতিবেদন তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছরের জিডিপির আকার চলতি মূল্যে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৪২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ২২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে শিল্প খাতে চূড়ান্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ০৮ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ ও সেবা খাতে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ ও ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
এদিকে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে। দেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় এখন (২০১৮-২০১৯ অর্থবছর) ১ হাজার ৯০৯ ডলার বা ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৪০ টাকা। এই অর্থবছরের ৮ মাসে মাথাপিছু আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১ হাজার ৯০৯ ডলার বা ১ লাখ ৬০ হাজার ৬০ টাকা। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমায় মাথাপিছু আয় ৩৮০ টাকা বেড়েছে। মাথাপিছু আয় ডলারে সমপরিমাণ হলেও টাকার অঙ্কে বেড়েছে। গত বছরে এই অঙ্ক ছিল ১ হাজার ৭৫১ ডলার।