প্রতিবেদন

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের হ্যাটট্রিক জয় ॥ এমপি হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরো তিন নারী

বিশেষ প্রতিবেদক
যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি থেকে এমপি নির্বাচনে জয়লাভ করে হ্যাটট্রিক করেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্রী টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। লেবার পার্টির ভরাডুবির মধ্যেও টিউলিপসহ বাংলাদেশি ৪ কন্যা এমপি নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়লেন। টিউলিপ ছাড়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অন্য তিন ব্রিটিশ নারী হলেন রূপা হক, রুশনারা আলী ও আফসানা বেগম।
১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে থেকেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ৫ নারীকে নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু সব হিসাবনিকাশ পাল্টে দিয়ে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির এমন নিরঙ্কুশ বিজয় আর লেবার পার্টির এমন পরাজয় হবে, তা কেউ ভাবেনি। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বর্তমান এমপি রুশনারা আলী, টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক ও রূপা হকের পাশাপাশি লেবার পার্টির প্রার্থী আফসানা বেগম এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী বাবলিন মল্লিক Ñ এই ৫ বাংলাদেশি কন্যাকে নিয়ে আশাবাদী ছিলেন প্রবাসীরা। তবে বাবলিন মল্লিক জয়ী হতে পারেননি। বাকি ৪ জনই জয় ছিনিয়ে এনেছেন।
বাংলাদেশের ৪ কন্যার এই বিজয়ে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে বইছে আনন্দের বন্যা। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বেড়ে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ৪ জন এমপি নির্বাচিত হওয়ায় প্রবাসীরাও উল্লসিত।
নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়ে হ্যাটট্রিক করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক ও রূপা হক। ২০১৫ সাল থেকেই তাঁরা নির্বাচিত হয়ে আসছেন। লন্ডনের হ্যামস্টেড ও কিলবার্ন আসন থেকে ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নিজের আসন পোক্ত করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। লেবার পার্টির প্রার্থী হয়ে ওই নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ৯৭৭ ভোট। ২০১৭ সালের নির্বাচনে তিনি পান ৩৪ হাজার ৪৬৪ ভোট।
যুক্তরাজ্যের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কয়েকটি আসনের মধ্যে টিউলিপের আসনটি উল্লেখযোগ্য। লন্ডনের অন্য আসনগুলোর মতো এখানে বাংলাদেশিদের তেমন আধিপত্য নেই। এই আসনে ভোটের ফলাফলের অন্যতম নিয়ামক ইহুদি সম্প্রদায়। তবে এই আসনে তাঁর অবস্থান খুবই পোক্ত। যে কারণে এবারও টিউলিপ দল থেকে মনোনয়ন পান এবং বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। নির্বাচনে ২৮ হাজার ৮০ ভোট পেয়ে জয়ী হন টিউলিপ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির জনি লাক পেয়েছেন ১৩ হাজার ৮৯২ ভোট।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ও শফিক সিদ্দিকের মেয়ে টিউলিপ লন্ডনের মিচামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে বাংলাদেশ, ভারত ও সিঙ্গাপুরে। ১৫ বছর বয়স থেকে তিনি লন্ডনের হ্যাম্পস্ট্যাড অ্যান্ড কিলবার্নে বসবাস করছেন। এই এলাকায় স্কুলে পড়েছেন ও কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে পলিটিকস, পলিসি ও গভর্নমেন্ট বিষয়ে তাঁর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির সদস্য হওয়া টিউলিপ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গ্রোর লন্ডন অথরিটি এবং সেইভ দ্য চিলড্রেনের সঙ্গেও কাজ করেছেন। ২০১০ সালে ক্যামডেন কাউন্সিলে প্রথম বাঙালি নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। নির্বাচনে জয়লাভের পর টিউলিপ এক টুইট বার্তায় তাঁর নির্বাচনি আসনের ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘আমাকে পুনরায় নির্বাচিত করায় হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্নের ভোটারদের আরেকবার ধন্যবাদ। আমার ভোটার ও পরিবারকে ধন্যবাদ। কিন্তু জাতীয় ফলাফল বিশেষ করে অনেক মেধাবী এমপি হেরে যাওয়ায় দুঃখ লাগছে। সামনে কঠিন সময়। তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’
উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশের পাবনার মেয়ে রূপা হক। এ নিয়ে টানা ৩ বার তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হলেন। রূপা হক ২৮ হাজার ১৩২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির জুলিয়ান গেল্যান্ট পেয়েছেন ১৪ হাজার ৮৩২ ভোট।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রথম বাংলাদেশি নারী এমপি রুশনারা আলী। ২০১০ সালে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে মোট ভোটারের ৪২.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি হন রুশনারা। এবার তিনি আরো বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেন। লন্ডনের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসন থেকে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। ৪৪ হাজার ৫২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির নিকোলাস স্টোভোল্ট পেয়েছেন মাত্র ৬ হাজার ৫২৮ ভোট।
জীবনে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে চমক দেখিয়েছেন আরেক বাংলাদেশি কন্যা আফসানা বেগম। বাংলাদেশি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের পপলার অ্যান্ড লাইমহাউস আসন থেকে তিনি নির্বাচন করেন। এই আসনটি সব সময় লেবার পার্টির দখলে থাকে। এবার এই আসনে লেবার পার্টির প্রার্থী হন আফসানা বেগম। এর আগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কেউ এই আসনে মনোনয়ন পাননি। গত ২২ বছর ধরে এই আসনে লেবার পার্টির এমপি ছিলেন জিম ফিটজপেট্রিক। তিনি আর নির্বাচন না করার ঘোষণা দিলে এ আসনটিতে কোনো নারীকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেয় লেবার পার্টি।
নির্বাচনে ৩৮ হাজার ৬৬০ ভোট পেয়ে আফসানা নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী শন ওক পান মাত্র ৯ হাজার ৭৫৬ ভোট। আফসানা জয়ী হওয়ায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপির সংখ্যা বেড়ে ৪ জন হলো। জয়লাভের পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি তাঁর আসনের ভোটার, সমর্থক এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।