কলাম

বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে চায় আমেরিকা

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)
পত্রিকার খবর অনুযায়ী এক দশকেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। পেন্টাগণের ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি র‌্যান্ডল জি শ্রাইভার ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় সংক্ষিপ্ত সফরের সময় প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত করতে আমেরিকা আগ্রহী।
প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে দুই দেশ বহু আগে থেকেই একসঙ্গে কাজ করে আসছে, যা এখনো চলমান। ন্যাটোসহ বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সামরিক সহযোগিতামূলক চুক্তি আকসা (অ্যাকুইজেশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিস অ্যাগ্রিমেন্ট) এবং তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে প্রবর্তিত জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (জেসোমিয়া) স্বাক্ষর করার জন্য বাংলাদেশের প্রতি নতুন করে আহ্বান জানিয়েছেন র‌্যান্ডল জি শ্রাইভার।
এ ধরনের চুক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে করার ব্যাপারে আমেরিকার আগ্রহ বহু পুরনো। এর আগে সেই নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে বিএনপির প্রথম সরকারের সময় থেকে পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় প্রায় একই প্রকৃতির চুক্তি সোফা (স্ট্যাটাস অব ফোর্সেস অ্যাগ্রিমেন্ট) করার জন্য আমেরিকার পক্ষ থেকে বহু চেষ্টা-তদবির করা হয়েছে; কিন্তু কোনো সরকারই তাতে রাজি হয়নি।
বাংলাদেশের কোনো সরকারই কেন রাজি হয়নি, তার কারণ জানা যায়নি।
অনেকেই মনে করে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণের যে প্রেক্ষাপট আগামী দিনে তৈরি হতে চলেছে, তার কথা ভেবেই যুক্তরাষ্ট্র হয়ত চেয়েছে শুরু থেকেই বাংলাদেশ তাদের ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থাকলে ভৌগোলিকভাবে তারা অনেক সুবিধা পাবে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন সবে ভেঙে গেছে। চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব বা প্রতিযোগিতার কোনো বাহ্যিক প্রতিফলন তখনো দেখা যায়নি। তবে বিশ্বের বড় বড় রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক বললেন, অভিন্ন শত্রু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার ব্যাপারে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করলেও সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যখন দেখা যাবে নতুন বিশ্বব্যবস্থার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে চীন-আমেরিকা।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকার থিংকট্যাংকগুলো ভাবতে লাগল, এটি তাদের আদর্শ ও মূল্যবোধের মহাবিজয়। আদর্শিক যুদ্ধে তারা জয়ী হয়েছে। কমিউনিস্ট বিশ্ব আজ পরাজিত এবং আমেরিকার সক্ষমতা রয়েছে বিশ্বব্যবস্থা নিজেদের মতো করে সাজানোর। চীন-মার্কিন সম্পর্কের বিষয়ে সবচেয়ে অভিজ্ঞ, ঝানু এবং আমেরিকার সফল নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার তাঁর প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার রচনা ‘হেনরি কিসিঞ্জার অন চায়না’ গ্রন্থে চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতার অনিবার্যতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
১৯৭১ সালে চীনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের কারিগর বলা হয় কিসিঞ্জারকে। কমন শত্রু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দুই রাষ্ট্রের পথ যে আবার ভিন্ন হবে, তা কিসিঞ্জার যেমন বলেছেন, তেমনি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির হিসাব-নিকাশও সে কথাই বলে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৯৭২ সালে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের শুরুতেই চীনের তৎকালীন নেতা মাও জেদং মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বলেছিলেন, আপাতত স্থগিত রাখলেও চীন একসময়ে তাইওয়ানকে মূল ভূখ-ের সঙ্গে একত্র করবে এবং তার জন্য যুদ্ধ করতে হলেও করবে।
এরপর অনেক জল গড়িয়েছে। চীনের বর্তমান স্ট্রংম্যান প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং ঘোষণা করেছেন, ২০৪৯ সালের মধ্যে চীন এক ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হবে এবং বিশ্বের অন্যতম সামরিক শক্তিতে পরিণত হবে। সঙ্গত কারণেই এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক ২০১৮ সালে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি ঘোষণা করার পর এই তৎপরতা লক্ষণীয় হয়ে উঠলেও ২০১০ সালে আমেরিকা কর্তৃক এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নতুন সামরিক নীতি ঘোষণা করার পর থেকে বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। অন্য কথায় ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিকে বলা যায়, নতুন বোতলে পুরনো মদ। ২০১১ সালে অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন বন্দরে নতুন সামরিক ঘাঁটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভাষণে বারাক ওবামা বলেছিলেন, ২০১০ সালে ঘোষিত আমেরিকার নতুন সামরিক নীতির মাধ্যমে এ অঞ্চলে আমরা আমেরিকার মূল্যবোধের মাহাত্ম্য তুলে ধরার সুযোগ পাব।
যে কথা বলছিলাম, আমেরিকা তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে চাইছে যেকোনো ফরমে বাংলাদেশকে একটি সামরিক ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে নিতে। সামরিক সহযোগিতা এই সময়ে এটি আর জিরো সাসপেন্স নয়, এক দেশের সঙ্গে সহযোগিতা অন্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করবে এমন নয়। তবে সামরিক জোট আর সহযোগিতার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো দেশকে একচ্ছত্র কোনো সামরিক সুবিধা দেয়ার ব্যাপারেও অনেক চিন্তার বিষয় আছে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশের সঙ্গে আমাদের সামরিক সহযোগিতা রয়েছে, কিন্তু কোনো দেশের সঙ্গেই আমরা সামরিকভাবে জোটবদ্ধ নই। এ পর্যন্ত সব দেশের সঙ্গেই আমাদের সহযোগিতার ক্ষেত্রটি ধ্রুপদি, যেখানে এক দেশের সঙ্গে সহযোগিতা অন্য দেশের জন্য কোনো ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে না। তবে অস্ত্র-সরঞ্জাম কেনাবেচার ব্যাপারে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার ডায়মেনশনটি ভিন্ন।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য চায়নার মতো সহজলভ্য সোর্স আর দ্বিতীয়টি নেই। একই ধরনের সরঞ্জাম পশ্চিমা দেশগুলো থেকে কিনতে হলে দ্বিগুণেরও বেশি মূল্য দিতে হবে। তবে প্রযুক্তিগত আধুনিকতা ও গুণগত মানে পশ্চিমা বিশ্ব এখনো অনেক এগিয়ে। তবে এক্ষেত্রে নিজের আর্থিক সঙ্গতির কথাটিও বাংলাদেশকে সব সময় মনে রাখতে হয়েছে।
নতুন করে আকসা ও জেসোমিয়া যখন সামনে আনা হচ্ছে তখন ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক ঘোষিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির কথাটি সঙ্গত কারণেই সামনে আসছে। এই নীতি ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই অনেকে বলছে, এই স্ট্র্যাটেজির মূল লক্ষ্য প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চীনের প্রাধান্য ও প্রতিপত্তি ঠেকিয়ে রাখা। জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শরিক। চীনের সঙ্গে যদি কখনো আমেরিকার সামরিক সংঘাত হয়, তাহলে মালাক্কা প্রণালি চীনের জন্য বন্ধ করে দেয়াই নাকি ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির হিডেন লক্ষ্য। এ কারণেই আজ চীনের জন্য মিয়ানমার এত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। যদি মালাক্কা প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে চীনের লাইফলাইন ভারত মহাসাগরে প্রবেশের জন্য মিয়ানমার ছাড়া আর কোনো বিকল্প চীনের জন্য খোলা নেই। আরেক বিকল্প হিসেবে চীন পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে গোয়াদার সমুদ্রবন্দর প্রস্তুত করছে। সেই ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে চীনের জনবসতির ভরকেন্দ্র পূর্ব প্রান্ত এবং যুদ্ধের থিয়েটার দক্ষিণ চীন সাগর থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের গোয়াদার বন্দরের সুবিধা নেয়া চীনের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তবে ভরসার জায়গা হলো হেনরি কিসিঞ্জার তাঁর রচিত ‘হেনরি কিসিঞ্জার অন চায়না’ গ্রন্থের ৫২৩ পৃষ্ঠায় উভয় দেশের জন্য মহাবিপদ সংকেত জারি করে রেখেছেন। বলেছেন, চীন-মার্কিন যুদ্ধ উভয় দেশের জন্য আত্মঘাতী হবে।
দীর্ঘদিন চুপ থাকার পর আমেরিকার পক্ষ থেকে আবার যখন সোফা বাদ দিয়ে তার চেয়ে আরো বিস্তৃত আকসা চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য দেনদরবার শুরু করা হয়েছে তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো নতুন দিকের সূচনা হতে যাচ্ছে?
অনেকেই বলছে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) পাল্টা হিসেবে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি খাড়া করা হয়েছে। আকসা, জেসোমিয়া ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির অংশ।
ইন্টারনেট খুঁজে দেখলাম, একশরও বেশি দেশের সঙ্গে আমেরিকা আকসা স্বাক্ষর করেছে। ইন্টারনেটের তথ্যানুযায়ী এই চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা ও স্বাক্ষরকারী দেশ নিজ নিজ প্রয়োজন অনুসারে তাবৎ সামরিক লজিস্টিক, যেমন খাদ্য, জ্বালানি, ট্রান্সপোর্টেশন, অ্যামুনেশনসহ সব ধরনের সামরিক সরঞ্জাম আদান-প্রদান করতে পারবে। এই আদান-প্রদান শুধু কি শান্তির সময়ের জন্য, নাকি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও এর কার্যকারিতা থাকবে, এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে এর মাধ্যমে আমেরিকা উল্লিখিত লজিস্টিক সরবরাহ এ অঞ্চলে অবস্থিত তাদের ফোর্সের জন্য অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশের ভূমি, বন্দরসহ অন্যান্য সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে বলেই তো মনে হচ্ছে।
আমরা এ পর্যন্ত একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে পারায় ভবিষ্যতের কোনো শঙ্কা আমাদের চিন্তাশক্তিকে দিগভ্রান্ত করতে পারেনি। আমাদের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এই সময়ে চীনের সমর্থন ও সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। জেসোমিয়া বা জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন সম্পর্কে এর নাম থেকে যতটুকু বোঝা যায়, তাতে যদি এমন হয় যে আমেরিকার সরবরাহ করা সামরিক সরঞ্জামাদির প্রযুক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি প্রয়োজন, তাহলে তার একটি জাস্টিফিকেশন হয়ত আছে। কারণ আমেরিকা অবশ্যই চাইবে তার উন্নত প্রযুক্তির তথ্য যেন অন্য কোনো রাষ্ট্রের হাতে না পড়ে। সোফা, আকসা ও জেসোমিয়া যা-ই বলি না কেন, কোনোটিকেই বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বাংলাদেশকে ঘিরে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি এবং সর্বোপরি আমাদের শুধু যে উন্নয়নের যাত্রা শুরু হয়েছে, তা যেন কিছুতেই বাধাগ্রস্ত না হয়। এগুলোই হবে যেকোনো সিদ্ধান্তের অনুঘটক। তবে আমেরিকা এখনও বিশ্বের পরাশক্তি এবং আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। তাই আমেরিকার পক্ষ থেকে যখন সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত করার প্রস্তাব এসেছে তখন সেটি অবশ্যই যথাযথভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
নিউ অরলিনস, ইউএসএ