প্রতিবেদন

বিজিবি দিবস উদযাপন: বিশ্বমানের সীমান্ত বাহিনীতে পরিণত হচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’ খ্যাত ২২৪ বছরের ঐতিহ্যবাহী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দিবস ১৮ ডিসেম্বর উদযাপিত হয়েছে। দিবসে বাহিনীর পক্ষ থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিশ্বমানের সীমান্ত বাহিনীতে পরিণত হয়েছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জাতির গৌরব ও আস্থার প্রতীক বিজিবি। মহান মুক্তিযুদ্ধে এ বাহিনীর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা বিজিবি’র অনুপ্রেরণার উৎস।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে বিজিবি (তৎকালীন ইপিআর) সদর দপ্তর, পিলখানায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাপুরুষোচিত আক্রমণে ইপিআরের অনেক বাঙালি সদস্য শহীদ হন। আরো অনেকে দখলদার বাহিনীর হাতে আটক ও নিষ্ঠুর নির্যাতনে পরবর্তীতে শাহাদত বরণ করেন। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ইপিআরের সিগন্যাল সেন্টারের কর্মীরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ওয়্যারলেসযোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেন। এ বাহিনীর প্রায় ১২ হাজার বাঙালি সদস্য মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং শত্রুর মোকাবিলা করে ৮১৭ জন সদস্য শাহাদত বরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বাহিনীর ২ জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৮ জন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম এবং ৭৭ জন বীর প্রতীক খেতাব অর্জন করে বিজিবি’র ইতিহাসকে মহিমান্বিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বাহিনীকে ২০০৮ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়।
কালের বিবর্তনে এ বাহিনীর নাম বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় সংঘটিত অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে যুগোপযোগী করতে ‘বিজিবি পুনর্গঠন রূপরেখা-২০০৯’ প্রণয়ন করা হয়। সে অনুযায়ী এ বাহিনীর নতুন নামকরণ করা হয় ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’। ২০১০ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন ২০১০’ পাসের মাধ্যমে এ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিগত ৯ বছরে এ বাহিনী সর্বক্ষেত্রে সরকারের যুগান্তকারী উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কর্মকা- বাস্তবায়নের ফলে শৃঙ্খলা, মনোবল, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের উৎকর্ষ বৃদ্ধির মাধ্যমে বিজিবি আজ জনসাধারণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরে বিজিবি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিজিবিকে বিশ্বমানের সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ভিশন-২০৪১’ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সরকার এ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিজিবি পুনর্গঠনের আওতায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে একটি বিশ্বমানের আধুনিক সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় বিজিবির সুনাম অক্ষুণœ রাখার জন্য এই বাহিনীর সদস্যদের দেশপ্রেম ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং চেইন অব কমান্ড মেনে চলার আহ্বান জানান।
এর আগে বিজিবি সদস্যরা মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানান। কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একটি সুসজ্জিত খোলা জিপে করে প্যারেড পরিদর্শনকালে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম এবং প্যারেড কমান্ডার কর্নেল এ এম এম খায়রুল কবির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
এছাড়া মোটর শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এবং বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ ও বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থীরা ‘স্বাধীনতা ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক ডিসপ্লে প্রদর্শন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিজিবি দিবস উপলক্ষে বীরত্ব ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিজিবির কর্মকর্তাদের মাঝে বর্ডার গার্ড পদক-২০১৯, রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক-২০১৯, বর্ডার গার্ড পদক সেবা-২০১৯ ও রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক সেবা-২০১৯ বিতরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণকারী প্যারেড কমান্ডার এবং অন্যান্য কন্টিনজেন্ট কর্মকর্তার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরের বীর উত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরে বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে বিজিবি সদস্যদের বিশেষ দরবারে অংশগ্রহণ করেন।
তিনি ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বাহিনীর তৎকালীন মহাপরিচালকসহ যেসব অফিসার, সদস্য ও বেসামরিক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন, আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি।
বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে সম্পৃক্ত উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী বিডিআর সদস্যদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে এ বাহিনী এখন সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।