ফিচার

স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ

ডা. কাজী মনজুর কাদের
স্তন ক্যান্সার মহিলাদের অন্যতম প্রধান ক্যান্সার। আমাদের দেশে যতটুকু তথ্য-উপাত্ত আছে তাতে দেখা যায়, ব্যাপকতার দিক দিয়ে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের সমান্তরালে এর অবস্থান।
পৃথিবীর অনেক দেশেই মহিলাদের এক নম্বর ক্যান্সার হলো ব্রেস্ট ক্যান্সার এবং সাধারণত প্রতি এক লাখ মহিলার মধ্যে ৮০ জনের বেশি প্রতি বছর এ রোগে আক্রান্ত হন। আমাদের দেশে সকল মহিলা ক্যান্সার রোগীর প্রায় ২০-২৫ শতাংশেরই স্তন ক্যান্সার। এ ক্যান্সার সাধারণত স্তনের দুগ্ধবাহী নালীতে হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি স্তনের অন্যান্য কলা থেকেও শুরু হতে পারে। এটি চাকা হিসেবেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম ধরা পড়ে এবং ক্যান্সার রোগের সাধারণ নিয়মÑ ধীরে ধীরে বড় হয় এবং শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। স্তনের নিকটস্থ বাহুমূলের লসিকা গ্রন্থিগুলোর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় এগুলোতে টিউমার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক।

স্তন ক্যান্সারের উপসর্গ ও লক্ষণসমূহ
যা রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করে
ষ স্তনে চাকা বা পি-।
ষ স্তনের আকারের পরিবর্তন।
ষ স্তনের বোঁটা ভেতরে ঢুকে যাওয়া, অসমান বা বাঁকা হয়ে যাওয়া।
ষ স্তনের বোঁটা দিয়ে অস্বাভাবিক রস
বা রক্তক্ষরণ হওয়া।
ষ চামড়ার রঙ বা চেহারার পরিবর্তন।
ষ উন্মুক্ত ক্ষত।
ষ বগলতলায় পি- বা চাকা এবং
ষ বাহুমূলে স্তনে ব্যথা।
প্রাথমিকভাবে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্য না হলেও এই রোগের ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে সর্বসাধারণের মাঝে প্রচারের ব্যবস্থা নেয়া হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যান্সারের আশঙ্কা কমিয়ে দেবে। এই ঝুঁকি বাড়ে সাধারণত বয়স যখন পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে, মেদবহুল শরীর এবং যারা অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার খেয়ে থাকে, যাদের পরিবারে আরও মহিলাদের স্তন ক্যান্সার আছে বা ছিল, অল্প বয়সে মাসিক শুরু বা অধিক বয়সে মাসিক শেষ হওয়া, একেবারেই গর্ভবতী না হওয়া, অধিক বয়সে প্রথম গর্ভধারণ, বুকের দুধ না খাওয়ানো, স্তনে অন্য ধরনের সাধারণ চাকা, যাদের জরায়ু বা ডিম্বাশয়ে ক্যান্সার হয়েছে, যারা স্তনে তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের মুখোমুখি হয়েছে, যেমন এক্সরে।
তবে মনে রাখতে হবে, স্তনে চাকা বা পি- হলে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; তেমনি সব চাকাই যে ক্যান্সার, তাও নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে স্তনের চাকার ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ পর্যন্ত ক্যান্সার হিসেবে চিহ্নিত হয়; বাকি ৯০ ভাগই সহজে নিরাময়যোগ্য সাধারণ রোগ। সুতরাং সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে স্তন ক্যান্সার রোধে এর ধরন জানা অত্যন্ত জরুরি।
স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয়ের জন্য একটি কার্যকরী পদ্ধতি হলো নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করা। প্রতিটি মহিলাই যদি প্রতি মাসে নিজের স্তন মাসিক শেষ হওয়ার পরপরই একটি নির্দিষ্ট দিনে ভালোভাবে পরীক্ষা করেন তাহলে যেকোনো ধরনের অসামঞ্জস্য ও অসুবিধা নিজেই চিহ্নিত করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারবেন। নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করার ধাপ রয়েছে; সেই মোতাবেক পরীক্ষা করাই শ্রেয়।
ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য সাধারণত
যেসব সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন
ষ স্বাস্থ্য শিক্ষা ও প্রচারের মাধ্যমে।
ষ নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষার অভ্যাস গড়ে তোলা।
ষ চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা স্তন পরীক্ষা
ষ আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ম্যামোগ্রাফি করানো।

স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা
এই চিকিৎসা সমন্বিত ও বহুমাত্রিক। শল্য চিকিৎসা, চিকিৎসা, রেডিও থেরাপি, কেমো থেরাপি, হরমোন চিকিৎসা ও ইমিউনো থেরাপি, টারগেটেড থেরাপি সমন্বিতভাবে প্রদান করা যায়। এর মূল লক্ষ্য ২টি: ১. মূল টিউমার অপসারণ এবং ২. সামগ্রিক চিকিৎসা প্রদান।

শল্য চিকিৎসা (সার্জারি)
সার্জারি স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো চিকিৎসার চেয়ে রোগীকে বেশি আরোগ্য করে। যদি টিউমার স্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, শরীরের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়া টিউমারের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা নগণ্য।

রেডিও থেরাপি
এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য মূল টিউমার এলাকা। সাধারণত অপারেশনের পরও চোখে দেখা যায় না যদি এমন কিছু কোষ থেকে থাকে, তাকে দমন করা সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে। যখন এ রোগ মস্তিষ্ক বা হাড়ে ছড়িয়ে পড়ে তখন জরুরিভাবে পেলিয়েশন বা প্রশমনের জন্য রেডিও থেরাপির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে রেডিও থেরাপি দেয়া যায় বলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা খুবই কম থাকে।

কেমো ও হরমোন থেরাপি
প্রায় প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রেই কেমো ও হরমোন থেরাপি প্রয়োগ করা যায়। সামগ্রিকভাবে শরীরের সর্বত্রই এই রোগের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য এর ব্যবহার অপরিহার্য। দেখা গেছে, খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণীত হলে এবং যথোপযুক্ত চিকিৎসা নিলে শতকরা ৭৫-৮০ ভাগ রোগী ১০ বছরেরও বেশি বেঁচে থাকে। মাঝ পর্যায়ে নির্ণীত হলে এই হার ৫০ থেকে ২৫ শতাংশে নেমে আসে এবং শেষ পর্যায়ে ভালো কিছু করার সুযোগ প্রায় থাকেই না।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো যথোপযুক্ত চিকিৎসা নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে করণীয়
ক্যান্সার সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান, বিশেষ করে এর কারণ এবং কিভাবে প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্ভব সে সম্পর্কিত প্রচার বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহে সামাজিক বাধা ও লাজলজ্জা দূর করে সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা করতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা। মহিলাদের চিকিৎসায় সময়মতো উদ্যোগী হওয়া এবং অবহেলা না করা। সামাজিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে তার পক্ষে নৈতিক ও সামাজিক সমর্থন জোরদার করা এবং সহযোগিতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি ক্যান্সার নিরাময়ে সহায়ক।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল