রাজনীতি

দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিএনপির পথচলা: হতাশ দলের তৃণমূলের নেতাকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক
সংগঠন গোছাবে না খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন করবে, নাকি সরকারবিরোধী আন্দোলন করবে Ñ এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে বিএনপি। ওয়ান-ইলেভেনের পর ২০০৯ সাল থেকে, বিশেষ করে খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর থেকে গত ২ বছরে নেতৃত্বসংকটে পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এ রাজনৈতিক দলটি। খালেদা-তারেকের অনুপস্থিতিতে দলের ওপর শীর্ষ নেতৃত্বের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, আবার দলের তৃণমূলও শীর্ষ নেতৃত্বকে বিশ্বাস করতে বা আস্থায় নিতে পারছে না। এমনকি বর্তমান নেতৃত্বকে সরকারের আজ্ঞাবহ বলেও মনে করছেন বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, বর্তমান নেতৃত্বের কোনো সিদ্ধান্তই সঠিক ও সময়োপযোগী ছিল না। ফলে দলের অস্তিত্বই আজ প্রশ্নের মুখে।
সর্বশেষ সংগঠন গোছানোর কাজ শুরু করেছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু সংগঠন গোছানোর কাজ আর খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন বা সরকারবিরোধী আন্দোলন একসঙ্গে চলে না বলে দলটির নেতারা মনে করছেন। তাদের মতে, এটা অসঙ্গতিপূর্ণ বা পরস্পরবিরোধী।
কেন্দ্রীয় নেতারা এগুলোকে পরস্পরবিরোধী বললেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন অন্য কথা। তারা বলছেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা সরকারের লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি করছেন। সরকারের সাথে আঁতাত করে চলার কারণে তারা সংগঠন গোছানোর কাজও করছেন না, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলনও করছেন না। আর সরকারবিরোধী আন্দোলনের তো প্রশ্নই ওঠে না।
এদিকে কোনো আন্দোলনও আপাতত করতে পারছে না বিএনপি। কারণ আসন্ন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দলটি। আগামী এক থেকে দেড় মাস দলটিকে ওই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে। বিষয়টি সম্প্রতি দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তিআন্দোলন বা সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ না নেয়ার ইস্যু পেয়ে গেছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। আগামী মাসখানেক তারা সিটি নির্বাচনের বাজনা বাজাবে এবং ৩০ জানুয়ারি দুপুর বেলা ‘এই সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’ আওয়াজ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে সরকারদলীয় নেতাদের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্যে মেতে উঠবে। তাদের দ্বারা কখনোই সংগঠন গোছানো, খালেদা জিয়ার মুক্তিআন্দোলন বা সরকারবিরোধী আন্দোলন কিছুই হবে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির কোনো কোনো সদস্য আড়ালে-আবডালে বলছেন, আসলে স্ববিরোধী রাজনীতি শুরু হয়েছে একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই। কারণ ওই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদে যোগ দিয়েছেন। অথচ বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
তাঁদের মতে, সংসদে যোগ দিয়ে বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া হয়েছে; যে কারণে সব উপনির্বাচনে অংশ নিতে হয়েছে। আবার এরই পথ ধরে যেতে হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। সবশেষ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাওয়ার সিদ্ধান্তও এরই ধারাবাহিকতা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির কোনো কোনো সদস্যের ভাষ্য, ‘আমরা সরকারের ফাঁদে পা দিয়ে তাদের পেছন পেছন ঘুরছি।’ তাদের মতে, নানা আশঙ্কা সত্ত্বেও বিএনপিকে সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে হচ্ছে।
বিএনপির সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন না হওয়ায় ােভ প্রকাশ করে সম্প্রতি বলেছিলেন, সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া তাদের আর উপায় নেই। কারণ বর্তমান সরকারের সময় খালেদা জিয়া আর মুক্তি পাচ্ছেন না। অতএব সরকারের পতন ঘটাতে পারলেই কেবল খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে। আর এ যুক্তিতেই তাঁরা ‘এক দফা’র আন্দোলনের কথা বলেছেন। কিন্তু এরই মধ্যে ২২ ডিসেম্বর ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। আর বিএনপি এতে অংশ নেয়ার ঘোষণাও দিয়েছে। দলটির নেতাদের মতে, সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাওয়ার হুমকির মুখে ঢাকা সিটির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা বাস্তবে বিএনপিকে ফাঁদে ফেলার সরকারি একটি কৌশল। সরকারের এই ফাঁদে পা দিয়েছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার জামিন না হলে বিএনপি সিটি নির্বাচনে যাবে না Ñ এ কথাটি বলারও সাহস দেখাতে পারেনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য দাবি করেন, আন্দোলন গতিশীল করতে শক্তিশালী সংগঠন প্রয়োজন। তাই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সংগঠন গোছানোর কাজ শুরু করেছেন।
সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা অংশ নিচ্ছি। একইসঙ্গে সরকারবিরোধী আন্দোলনও চলবে।
জানা গেছে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলের অধিকাংশ নেতা সংগঠন গোছানোর বিপ।ে তাদের মতে, এটি সংগঠন গোছানোর সময় নয়, বরং বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় করে সঠিক রাজনৈতিক কর্মকৌশল নির্ধারণ তথা সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার এখনই সময়।
কিন্তু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সংগঠন গোছানোর কাজে হাত দিয়েছেন বলে দলের মধ্যে আলোচনা আছে। তাছাড়া এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা যুক্ত নন বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব রিজভী আহমেদকে দিয়ে তারেক এ কাজ করাচ্ছেন। ফলে বেশিরভাগ নেতাকর্মী এ ঘটনায় ুব্ধ। আবার কমিটি পুনর্গঠন করতে গিয়ে বেশিরভাগ জেলায় দলের মধ্যে বিভেদ তৈরি হচ্ছে। বর্তমান কমিটির নেতারা মনে করছেন, তারা যেকোনো সময় বাদ পড়তে পারেন। আবার পুনর্গঠনের পর এক দল মনে করছে তারা বঞ্চিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতির কারণে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।
বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন করার জন্য বিএনপির সামনে ইস্যুর অভাব না থাকলেও সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি উল্টো সরকারকে সহায়তা করার কাজে নেমেছে। সরকারকে অঘোষিত এই সহায়তা করতে গিয়ে বিএনপি সংগঠন গোছানোর কাজটিকে মূলত স্থগিত করেছে। পাশাপাশি খালেদা জিয়ার মুক্তিআন্দোলন ও সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কবর দিয়েছে। এ নিয়ে হতাশ বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।