রাজনীতি

নবম কাউন্সিলে পুরনো নেতৃত্বেই আস্থা রাখলো এরশাদের জাতীয় পার্টি

নিজস্ব প্রতিবেদক
গঠনতন্ত্র সংশোধন করে এরশাদের জাতীয় পার্টির নবম কাউন্সিলে নতুন সৃষ্টি করা ‘প্রধান পৃষ্ঠপোষক’ পদে রওশন এরশাদকে নির্বাচিত করা হয়েছে। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহোদর জি এম কাদের। মহাসচিব হয়েছেন মশিউর রহমান রাঙ্গা।
দলের বাদবাকি পদগুলো নির্বাচিত চেয়ারম্যান পূরণ করে পরবর্তীতে তাদের নাম ঘোষণা করবেন। তবে ২৯ ডিসেম্বর ১ জন সিনিয়র ও ৬ জন কো-চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা করেন জি এম কাদের। সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করা হয়েছে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে।
রওশন এরশাদ প্রধান পৃষ্ঠপোষকের এই পদ প্রত্যাখ্যান করেছেন। রওশনপন্থিরা বলেছেন, জাতীয় পার্টিতে রওশনকে কোণঠাসা করার জন্য ‘অলীক’ এই পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। রওশনের এই ‘অবমাননাকে’ তারা ‘বিদিশার চাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় জাপার এবারের কাউন্সিল। এরশাদের মৃত্যুর পর প্রথমবারের মতো সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব পেল দলটি। আগামী ৩ বছর নির্বাচিতরা দায়িত্ব পালন করবেন। তবে সম্মেলনে এরশাদের সহধর্মিণী রওশন এরশাদ ও ছেলে সাদ এরশাদ উপস্থিত ছিলেন না। রওশনের অনুপস্থিতি অনেককে হতাশ করেছে।
সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে ১৮ দফা তুলে ধরে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে জি এম কাদের বলেন, দল ভাগাভাগির চেষ্টার ফাঁদে পা দেবেন না। দলকে চাঙা রাখতে হলে বা শক্তিশালী করতে ঐক্য ধরে রাখতে হবে। ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
মতাসীন মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টির কাউন্সিলে শুভেচ্ছা বার্তা নিয়ে আসেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। নিজ দলের প থেকে দেয়া শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির অবদানের কথা আমরা ভুলিনি। সেদিন জাপা সমর্থন দিয়েছিল বলে আওয়ামী লীগ মতায় এসেছিল। জাতীয় পার্টির কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
সম্মেলনে রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত সাবেক মন্ত্রী ও জাপার শীর্ষ নেতা ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বক্তব্য দেয়ার সময় নেতাকর্মীরা ‘দালাল, দালাল, ধর, ধর’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। এ সময় সম্মেলনস্থলে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। আনিসুল ইসলামকে মঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার দাবি জানান সবাই। পরে অন্য নেতাদের প থেকে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।
সম্মেলনে আলোচনা পর্ব শেষে গঠনতন্ত্র সংশোধনী প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস করানো হয়। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার শেখ সিরাজুল ইসলাম জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রওশন এরশাদ ও চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরের নাম প্রস্তাব করেন। এ সময় উপস্থিত কাউন্সিলররা কণ্ঠভোটে তা পাস করেন। এরপর জাতীয় পার্টির মহাসচিব হিসেবে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে নির্বাচন করেন দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের। সম্মেলনে আসা কাউন্সিলররা পার্টির চেয়ারম্যানকে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের মতা দেন। পরবর্তীতে তিনি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবেন।
শেখ সিরাজুল ইসলাম জানান, জাতীয় পার্টিতে প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদ ছাড়াও সৃজন করা হয়েছে অতিরিক্ত মহাসচিবের পদ। দেশের ৮ বিভাগে ৮ জন অতিরিক্ত মহাসচিব নির্বাচিত হবেন। তারা প্রত্যেকেই প্রেসিডিয়াম সদস্যের পদমর্যাদা লাভ করবেন। এছাড়াও কো-চেয়ারম্যান পদে আসছেন আরও ৫ নেতা।
রওশনের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদটি কার্যত অলঙ্কারিক হলেও বলা হচ্ছে দলের সর্বোচ্চ পদ। কোনো সভায় তিনি উপস্থিত থাকলে প্রধান অতিথির পদ অলঙ্কৃত করবেন। গঠনতন্ত্রে আগের মতোই দলের সর্বময় মতার অধিকারী থাকছেন চেয়ারম্যান।
এদিকে গঠনতন্ত্রের সংশোধিত ধারা অনুযায়ী কেউ অন্য দল থেকে জাপায় আসতে চাইলে পদত্যাগপত্র দেখাতে হবে। বৈদেশিক কমিটি উপজেলা কমিটির মর্যাদা পাবে। এছাড়া দপ্তর সম্পাদক হবেন ২ জন। জাতীয় তরুণ পার্টি, মোটরযান শ্রমিক পার্টি, জাতীয় শ্রমিক পার্টিকে জাতীয় পার্টির অঙ্গসংগঠনের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।
নবম কাউন্সিলে দলের নেতাকর্মীদের কোনো প্রকার ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, জাতীয় পার্টি দুর্বল নয়। যদি দুর্বল হতো তাহলে সম্মেলনে লোকজনের জায়গা দিতে পারছি না কেন? মানুষ মনে করে, দল বিভক্ত। দলে কি আসলে কোনো বিভক্তি আছে? নেই। অনেকেই মনে করেছিলেন, দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ না থাকলে জাতীয় পার্টি থাকবে না। কিন্তু সকলের সহযোগিতা ও আন্তরিকতায় জাপা এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।
দলের নেতাকর্মীদের ষড়যন্ত্রের শিকার না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দল নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। দলের মালিকানা আপনাদের। দলের ভালো হলে আপনাদের ভালো, আর তি হলেও আপনাদের তি। এ কথাটি অন্তরে ধারণ করবেন।
দলের প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, আমরা ৫৪ জেলায় এরই মধ্যে কমিটি করেছি। আগামী ১ মাসের মধ্যে বাকি জেলাতেও কমিটি করা হবে।
নবম কাউন্সিলে বক্তব্য রাখেন, সভাপতিম-লীর সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, মুজিবুল হক চুন্নু, কাজী ফিরোজ রশীদ, মশিউর রহমান রাঙ্গা, সালমা ইসলাম, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, নাজমা আখতার, ফখরুল ইমাম, নাসরিন জাহান রতœা, সাহিদুর রহমান টেপা, সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, লিয়াকত হোসেন খোকা, খালেদ আখতার, ফয়সল চিশতী, মীর আব্দুস সবুর আসুদ, ব্যারিস্টার দিলারা খন্দকার, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন, আলমগীর সিকদার লোটন প্রমুখ।
২০১৬ সালের মার্চে জাতীয় পার্টির অষ্টম কাউন্সিলে দলটির তৎকালীন চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার ভাই জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের পদে বসান। পরে রওশনের জন্য সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান পদ তৈরি করেন এরশাদ। মৃত্যুর আগে গত মে মাসে জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন এরশাদ।
গত ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) মারা যান এরশাদ। তার কিছুদিন পর মসিউর রহমান রাঙা এক সংবাদ সম্মেলন করে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরের নাম ঘোষণা করেন। এর বিরোধিতা করে রওশনপন্থিরা সেপ্টেম্বর মাসে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে রওশন এরশাদকে জাপার চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। পরে দুই পরে সমঝোতার কথা জানিয়ে মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা সংবাদ সম্মেলন করে জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান এবং রওশনকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ঘোষণা করেন।