আন্তর্জাতিক

রোহিঙ্গা মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় মিয়ানমারের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।

স্বদেশ খবর ডেস্ক
রোহিঙ্গা মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় মিয়ানমারের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।
গত ২৭ ডিসেম্বর সংস্থাটির ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৩৪টি দেশ প্রস্তাবের পে এবং ৯টি দেশ বিপে ভোট দিয়েছে। ভোটদানে বিরত ছিল ২৮টি দেশ।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ওপর ধরপাকড়, নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যাকা- শুরু হলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এ যাবৎ ৩টি প্রস্তাব পাস হয় জাতিসংঘে। রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেয়ার লড়াইয়ে জরুরি পদপে নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে প্রস্তাবে।
সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব কোনো দেশ মেনে চলতে আইনত বাধ্য না হলেও এতে বৈশ্বিক মতামতের প্রতিফলন ঘটে। গত ১৪ নভেম্বর জাতিসংঘের থার্ড কমিটিতে অধিকাংশ সদস্যরাষ্ট্রের সমর্থনে এই প্রস্তাবটি অনুমোদন পেয়েছিল।
এই প্রস্তাব পাসের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলের সার্বিক সমর্থনের ব্যাপারটি পুনরায় দৃশ্যমান হলো বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন।
একই অধিবেশনে মিয়ানমার পরিস্থিতির বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালনা অব্যাহত রাখার ল্েয অর্থ মঞ্জুরির সর্বসম্মত একটি সিদ্ধান্তও হয়েছে।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল স্বাধীন তথ্যানুসন্ধানী মিশন তৈরি করে। রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারও চলছে। এর শুনানি শেষ হয়েছে, এখন রায়ের অপো।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) এই বিচারের মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নতুন প্রস্তাব পাস করাকে গুরুত্বের সঙ্গেই দেখা হচ্ছে।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। যদিও কয়েক শ’ বছর ধরে তারা দেশটিতে বসবাস করছেন। ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করে বৌদ্ধসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি। এরপর থেকে রোহিঙ্গারা মূলত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছে।
মিয়ানমারের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাসের আগে গত ১২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে) স্পষ্টভাবে বলেছে, মিয়ানমার এই গণহত্যার দায় এড়াতে পারে না। আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে দেশটির শীর্ষ বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চি নির্লজ্জভাবে গণহত্যার বিষয়টি অস্বীকার করলেও নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করে নিয়েছেন।
হেগের পিস প্যালেসে মিয়ানমার তাদের প্রথম দিনের (১১ ডিসেম্বর) শুনানিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করলেও গণহত্যা হয়নি বা এর উদ্দেশ্য ছিল না বলে দাবি করে। দেশটির এজেন্ট হিসেবে যাওয়া স্টেট কাউন্সেলর ও শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চি এবং তাদের পে দাঁড়ানো আইনজীবীরা একই সুরে কথা বলেন। তারা এ ঘটনার অভ্যন্তরীণ বিচার চলছে দাবি করে মামলা খারিজের আবেদন জানান। গাম্বিয়ার এই মামলা করার অধিকার নেই বলেও দাবি করেন তারা। এমনকি মামলায় অন্তর্বর্তী কোনো আদেশ দেয়া হলে তা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলবে বলে উল্লেখ করেন সু চি।
১২ ডিসেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন পর্বে গাম্বিয়ার আইনজীবীরা মিয়ানমারের সব যুক্তি খ-ন করেন।
এ অবস্থায় নিজেদের যুক্তি উপস্থাপন পর্বে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে মিয়ানমারের আইনজীবীরা। তারা রাখাইনে গণহত্যা হয়েছে কি হয়নি- এ ব্যাপারে যুক্তিতর্কে যেতে পারেনি। বরং মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়ে থাকলে অভ্যন্তরীণভাবে বিচারের সেই পুরনো দাবিই তুলে ধরে।
সু চি আদালতে দুটি দাবি জানান: ১. মামলাটি তালিকা থেকে বাদ দেয়া; ২. মামলা চললেও যেন অন্তর্বর্তী কোনো আদেশ না দেয়া হয়।
উভয়পরে শুনানি শেষে আইসিজের দেয়া বিবৃতিতেও চূড়ান্তভাবে দেশটির এই দুই দাবির কথাই তুলে ধরা হয়েছে। অপরদিকে অন্তর্বর্তী নির্দেশনা চেয়ে ৬ েেত্র দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন জানিয়েছে মামলার বাদীপ গাম্বিয়া। দেশটির এজেন্ট হিসেবে আইনমন্ত্রী আবু বকর তামবাদু অন্তর্বর্তী ৬টি ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলে ধরেন।
আইসিজের বিবৃতিতে গাম্বিয়ার যে দাবিগুলো উল্লেখ করা হয় সেগুলো হলো: ১. গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমারকে দ্রুত ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনে উল্লেখিত ধারাগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। ২. রোহিঙ্গাদের ওপর সব ধরনের নির্যাতন বন্ধে মিয়ানমারকে তাদের সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য নিরাপত্তা রাকারী বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ৩. গণহত্যার কোনো প্রমাণ নষ্ট করা যাবে না। ৪. জটিলতা বাড়ায় এমন কোনো পদপে মিয়ানমার বা গাম্বিয়া কেউ নিতে পারবে না। ৫. অন্তর্বর্তী আদেশের পরিপ্রেেিত কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে ৪ মাসের মধ্যে মিয়ানমার ও গাম্বিয়া তা আদালতে পেশ করবে। ৬. গণহত্যার অভিযোগ তদন্তে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনসহ অন্যান্য স্বাধীন তদন্ত সংস্থাকে মিয়ানমারে প্রবেশের অনুমতি প্রদান এবং সহযোগিতা করতে হবে।
উভয়পরে আবেদন, যুক্তিতর্কের পর তা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ শুরু করেছেন আইসিজের বিচারকরা। আদালতের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইসিজে প্রেসিডেন্ট আবদুল কোয়াই আহমেদ ইউসুফের নেতৃত্বে নিয়মিত ১৫ বিচারক ও অ্যাডহক দুই বিচারক মিলে যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত ও আবেদনের বিচার-বিবেচনা শুরু করেছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, আগামী মাসের মধ্যেই (জানুয়ারি, ২০২০) তারা অন্তর্বর্তী আদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের মামলার চূড়ান্ত রায় হতে সাধারণত কয়েক বছর সময় লেগে যায়। কিন্তু গাম্বিয়ার আবেদন আমলে নিয়ে আদালত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিতে পারেন। এটি হলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার আগে মিয়ানমারকে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। নয়তো মামলা যতদূর এগোবে মিয়ানমার ততই বিপদে পড়বে।
ধরে নেয়া যায়, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে Ñ এ অভিযোগকে আমলে নিয়ে সিদ্ধান্তের পথে এগোবেন বিচারকরা। অপরদিকে শুনানিতে রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ না করার মধ্য দিয়ে সু চি ও মিয়ানমার সরকারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, জাতিসংঘে নিন্দা প্রস্তাব পাসের পর যেকোনো মুহূর্তে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিতে পারে আইসিজে। অন্তর্বর্তীকালীন আদেশটি যে মিয়ানমারের বিপক্ষেই যাবে, তা নিশ্চিতভাবেই বোঝা যাচ্ছে।