প্রতিবেদন

শুধু সৌদি আরবেই এক লাখ ড্রাইভারের চাহিদা : দক্ষ গাড়িচালক তৈরির বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

সাবিনা ইয়াছমিন
একটি যানবাহনের জন্য অন্তত ২ জন চালক থাকার নিয়ম থাকলেও বাংলাদেশে যে পরিমাণ যানবাহন আছে, তার ১০ ভাগের ১ ভাগ চালকও নেই। তাছাড়া প্রতিদিন যে নতুন যানবাহন রাস্তায় নামে সে অনুযায়ী নতুন চালক পাওয়া যায় না। আবার দেখা যায়, একটি কোম্পানিতে বাস যদি থাকে ৬০টি, তাহলে চালক থাকে ২০ জন। অথচ চালক থাকার কথা ১২০ জন। এতে দেখা যায়, ২০ জন চালককে ৬০টি বাস চালাতে হচ্ছে অথবা তুলনামূলক কম দক্ষ চালক দিয়েই গাড়ি চালাতে হচ্ছে। এটি করতে গিয়ে একজন চালককে টানা ৯৬ ঘণ্টাও গাড়ি চালাতে হয়। ড্রাইভিং সিটে বসেই চলে তার ঘুম, খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি। তাছাড়া অদক্ষ চালকের কারণে হরহামেশাই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা।
বাংলাদেশে অন্যান্য পেশার জন্য যে নীতিমালা, প্রশিক্ষণ ও মজুরি কাঠামো আছে, ড্রাইভিং পেশায় তার কিছুই নেই। যানবাহন মালিকের করুণার ওপর নির্ভর করে চালকের মজুরি। বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো লোকজনের ওপরই বাংলাদেশের ড্রাইভিং পেশার ভরসা। বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে প্রথমে কিছুদিন টেম্পোর হেলপারি করে। তারপর বাসের হেলপারি-কন্ডাক্টরি, তারপর ড্রাইভারি। যে ওস্তাদের কাছে ড্রাইভারির হাতেখড়ি, সে ওস্তাদও হেলপার থেকে ড্রাইভার হয়েছেন। ফলে তিনি যে ওস্তাদি দাখিল করেন, তাতে থাকে বিরাট গলদ, পরিণামে বাস দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল।
আশ্চর্য ব্যাপার যে, বাসের একজন চালকের হাতে থাকে অন্তত ৪০ জন যাত্রীর প্রাণ। সেই প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় মাতে একজন প্রশিক্ষণহীন চালক। প্রশিক্ষণ না পাওয়া একজন চালক কী করে ড্রাইভিং সিটে বসে গেল, তা দেখার কেউ নেই। বিআরটিএ’র একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী টাকার বিনিময়ে নির্দ্বিধায় অদক্ষ ড্রাইভারদের হাতে তুলে দেয় নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স, ক্ষেত্রবিশেষে আসল লাইসেন্সই পড়ে নকল ড্রাইভারের হাতে। নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স আবার পুলিশের চেনা। পুলিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় নেমে কিছু টাকার বিনিময়ে সেই নকল লাইসেন্সকে হালাল করে দেয়। এভাবে যাত্রীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় চালকের সঙ্গে জড়িত হয়ে যায় বিআরটিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পুলিশ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, একেবারেই অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় বেড়ে উঠছে ড্রাইভিং পেশাটি। পেশাটির কোনো স্বীকৃতি না থাকায় এবং চালকদের সঙ্গে রাস্তায় পুলিশ ও যাত্রীদের দুর্ব্যবহারের কারণে কোনো শিক্ষিত অথবা ভালো ফ্যামিলির লোকজন সচরাচর এই পেশায় আসতে চান না। ফলে অশিক্ষিত ও দুষ্ট প্রকৃতির কিছু লোকজনের হাতেই বন্দি হয়ে আছে ড্রাইভিং পেশাটি।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকার যে কিছুই করছে না, এমন নয়। কিন্তু ড্রাইভিং পেশাটি দেখভালের জন্য সরকার যাদের দায়িত্ব দিয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে বিরাট গলদ। এ গলদ দূর করা এখন সময়ের দাবি।
ড্রাইভিং পেশাটিকে একটি স্বীকৃত পেশায় দাঁড় করানোর জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সবচেয়ে বেশি দরকার ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ। একজন অপ্রশিক্ষিত ড্রাইভারই যাত্রীদের জীবনের মূল্য না দিয়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে পারে। বিষয়টির প্রতি সচেতন হয়ে সরকার অবশ্য চালকদের প্রশিক্ষণের দিকে নজর দিয়েছে।
দেশ-বিদেশে পেশাদার ড্রাইভারের চাহিদা পূরণের ল্েয দেশের ১ লাখেরও বেশি তরুণকে ড্রাইভিং প্রশিণ দিতে যাচ্ছে সরকার। দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে বেকার জনশক্তিকে প্রশিতি করতে হালকা ও ভারী যানবাহন চালনোর প্রশিণ দেয়া হবে। দ ড্রাইভার গড়ে তুলতে এ জন্য সরকার ব্যয় করবে ২৬৭ কোটি ৩৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে প্রবাসীকল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিণ ব্যুরো (বিএমটিআই)। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ড্রাইভিং প্রশিণ প্রদান’ নামে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। দেশের ৬৪ জেলায় বিদ্যমান কারিগরি প্রশিণ কেন্দ্রে এ বিষয়ে প্রশিণ দেয়া হবে। তরুণদের ড্রাইভিংয়ের পাশাপাশি অটোমেকানিক্সের প্রশিণও দেয়া হবে, যাতে চলতি পথে হঠাৎ কোনো যানবাহন বিকল হলে প্রশিক্ষিত ড্রাইভাররা তাৎণিকভাবে গাড়ির প্রয়োজনীয় মেরামতও করতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে যেমন দক্ষ গাড়িচালকের অভাব রয়েছে, তেমনি বিদেশেও যোগ্য গাড়িচালকের বিপুল চাহিদা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে গাড়িচালকের প্রচুর চাহিদা সম্পর্কে সম্প্রতি সৌদি রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ভালো মানের ১ লাখ চালক পাওয়া গেলে আজকেই চাকরি দিতে পারবেন।
শুধু সৌদি আরবেই নয়, অন্যান্য দেশেও দক্ষ গাড়িচালকের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এমতাবস্থায়, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশিতি ড্রাইভার তৈরি করা গেলে প্রশিক্ষণ শেষের সঙ্গে সঙ্গে তারা দেশ-বিদেশে চাকরি পেয়ে যাবেন।
তাই বিএমটিআইয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ড্রাইভার তৈরির প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশ-বিদেশের উপযোগী ড্রাইভিং প্রশিণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রকল্পের আওতায় দেশের বেকার যুবক-যুবতীরা ড্রাইভিং প্রশিণ নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করবে, যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে।
প্রকল্পের আওতায় ১২৮টি ডাবল কেবিন পিকআপ, ৮টি ট্রাক ও একটি মাইক্রোবাস কেনা হবে। এছাড়া ৩ ধরনের ১৯২টি প্রশিণ যন্ত্রপাতি,৭ ধরনের ২১টি অফিস যন্ত্রপাতি কেনা হবে। আর প্রশিক থাকবেন ব্যবহারিক ১২৮ জন, তাত্ত্বিক ৬৪ জন ও স্কিল ওয়ার্কার ৬৪ জন।
প্রকল্প সূত্রে আরও জানা গেছে, সৌদি আরবে বাংলাদেশি ১ লাখ দ চালকের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় শিগগিরই দেশের ৬১ জেলায় এ প্রশিণ কার্যক্রম শুরু হবে। চলবে জুন ২০২৪ সাল পর্যন্ত। এই ৫ বছরে পর্যায়ক্রমে দ চালক তৈরির পর সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হবে। সেই সঙ্গে দেশেও তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।
জানা গেছে, সৌদিতে একজন চালক মাসে ১ হাজার ৩৫০ রিয়াল বেতন পাবেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না। সরকারি এ প্রশিণ শতভাগ ফ্রি হবে। উল্টো প্রশিণ নিতে এলে দৈনিক ১০০ টাকা করে দেয়া হবে চালকদের।
গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় এ প্রশিণ দেয়া হবে না। তবে এসব জেলার মানুষ পার্শ্ববর্তী জেলায় প্রশিণ নিতে পারবেন। লিখিত ও মৌখিক পরীার মাধ্যমে একটি জেলায় প্রতি শিফটে ২০ জনকে নির্বাচিত করা হবে। প্রকল্পের আওতায় একজনকে ৩ মাসে ৩৬০ ঘণ্টা প্রশিণ দেয়া হবে। প্রতিটি জেলায় দুটি প্রশিণ গাড়ির মাধ্যমে ২০ জন করে দুই শিফটে প্রশিণ দেয়া হবে। এ কাজে ৬১ জেলার জন্য ১২৮টি প্রশিণ গাড়ি কেনা হবে। প্রস্তাবিত ব্যয় অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে ১১৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা খরচ হবে। পরবর্তী বছরগুলোতে ৩৮ কোটি টাকার কিছু বেশি করে খরচ ধরা হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ বাস-ট্রাক চালকদের বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালানো। পাশাপাশি আরেকটি কারণ হলো চালকের দতার অভাব ও যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি।
অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালানোর পেছনেও বেশকিছু কারণ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে চালকের প্রশিণের অভাব, চালকের অতিরিক্ত খাটুনি ও চালকের স্থায়ী নিয়োগের বদলে যাত্রা বা ট্রিপের ওপর মজুরি নির্ধারণ অন্যতম। অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চালালে যানবাহনের মালিকও অনেক খুশি। কারণ তাতে বেশি ট্রিপ মারা যায়, বেশি আয় করা যায়। এ জন্যই চালকরা উৎসাহী হয়ে গাড়ির গতি বাড়ায় এবং দুর্ঘটনা ঘটায়।
সড়ক দুর্ঘটনা একেবারে নির্মূল করা সম্ভব না হলেও তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা অসম্ভব নয়। বাংলাদেশে যে ব্যাপক হারে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, এর কারণগুলো বহুলাংশেই চিহ্নিত, কী করতে হবে তা-ও সংশ্লিষ্টদের জানা। এ বিষয় থেকে উত্তরণে সরকার চালক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। দেশে যেহেতু প্রতিদিনই যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে, সেহেতু পরিবহন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চালক প্রশিক্ষণের বিষয়টি নিয়মিত হওয়া উচিত। চালকদের জন্য মজুরি কাঠামোও নির্ধারণ করা উচিত। তারা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পেলে, তাদের জব স্যাটিসফ্যাকশন থাকলে এবং মালিক কর্তৃক দেয় মজুরির পাশাপাশি সরকারি ভাতার ব্যবস্থা থাকলে তারা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হবে। ফলে সড়কে কমবে মৃত্যুর মিছিল।