রাজনীতি

সিটি নির্বাচনে ইভিএম বিতর্ক: কী করবে ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। মতাসীন দল আওয়ামী লীগ এ সিদ্ধান্তের পে থাকলেও জোর বিরোধিতা করছে বিএনপি। ইসি ইভিএমে ভোটগ্রহণের পক্ষে। তবে সিইসি কে এম নুরুল হুদা পরোক্ষভাবে বলেছেন, কেউ না চাইলে ইভিএমে ভোটগ্রহণ থেকে পিছিয়ে আসবে ইসি।
গত ২৫ ডিসেম্বর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বলেন, সংসদসহ বিভিন্ন নির্বাচনে ব্যবহার করে ‘সুফল’ পাওয়াতেই কমিশন ইভিএম ধরে রেখেছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আরেক অনুষ্ঠানে বলেন, ইভিএম সর্বজনস্বীকৃত আধুনিক প্রযুক্তি। এতে সুষ্ঠু ভোট হয়।
তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ইভিএমে ভোট হলে জনগণের রায় প্রতিফলিত হবে না।
ঢাকা উত্তর ও দণি সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে আগামী ৩০ জানুয়ারি। ২৫ ডিসেম্বর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন প্রশিণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনি কর্মকর্তাদের ২ দিনব্যাপী প্রশিণ কর্মশালা উদ্বোধন করেন সিইসি। সেখানে তিনি আরও বলেন, ‘অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ইভিএম টিকে আছে।’
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, ‘আপনারা অনেকে ইভিএমে নির্বাচন করেছেন। ইভিএম নির্বাচন পরিচালনায় কোনো অসুবিধা নেই। এর মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ সফলভাবে করা যায়।’
ইভিএম পদ্ধতির সুফল তুলে ধরে ২৫ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক কেন্দ্র মিলনায়তনে (টিএসসি) এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ইভিএম সর্বজনস্বীকৃত আধুনিক প্রযুক্তি। ইভিএমে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, যেখানে ইভিএমে ভোট হয়েছে সেখানে বিএনপিও জিতেছে। ইভিএম হলে কারও অসুবিধা নেই। ইভিএমে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপে নির্বাচনের নিশ্চয়তা আছে।’
ইভিএম নিয়ে সিইসিসহ অন্য নির্বাচন কমিশনারদের বক্তব্যের পরপরই রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সিটি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘ঢাকার সিটি নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট হলে জনগণের রায় প্রতিফলিত হবে না। বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো সুষ্ঠু ভোট হয়নি।’
বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের পর ঢাকার উত্তর সিটিতে মেয়র পদে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘মেয়র প্রার্থী হিসেবে আমাদের প্রথম আশঙ্কার কথা দলের মহাসচিব বলে দিয়েছেন। ইভিএম নিয়ে আমরা নিজেরাও চিন্তিত। ভোটাররাও চিন্তিত। ভোটাররা ভোট দেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। কারণ তারা মনে করেন, তারা যাদেরকে ভোট দেবেন তাদেরকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে না। বরং সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) যাদেরকে চাইবে তাদেরকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইভিএম নিয়ে ভারতেও আপত্তি উঠেছিল। কারচুপির অভিযোগ ওঠায় অনেক দেশ এখন আর ভোটগ্রহণে ইভিএম ব্যবহার করে না।’
এ বিষয়ে ঢাকা দণি সিটিতে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বলেন, ‘বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দল যখন ইভিএম নিয়ে আপত্তি করছে সেখানে ইসির এত আগ্রহ কেন ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিষয়ে? এতে জনমনে সন্দেহ আরও প্রকট হচ্ছে।’
ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনি কর্মকর্তাদের ২ দিনব্যাপী প্রশিণ কর্মশালার অনুষ্ঠানে সিইসি আরও বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল ইভিএমের বিরোধিতা করলেও ইসি ইভিএম থেকে সরে আসেনি।’
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘যদি সবাই বলেন ইভিএম দিয়ে ভালোভাবে নির্বাচন করা যায় না, তাহলে আমরা ইভিএম ব্যবহার করব না।’
একই অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘ইভিএম নিয়ে অংশীজনের মধ্যে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। ইভিএম প্রশ্নবিদ্ধ হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’
ইসি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদত হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এই নির্বাচনের ভিন্নতা হচ্ছে সম্পূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে ইভিএমে। ইভিএম পরিচালনার জন্য প্রতি কেন্দ্রে ২ জন করে সেনাবাহিনীর টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেয়া হবে। কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করে কমিশনের ভাবমূর্তি। প্রার্থীরা যেন লেভেল প্লেইং ফিল্ড পান সেভাবে কাজ করতে হবে। নিরপে সুষ্ঠু নির্বাচন চায় ইসি।’
নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ইসি সম। এটি সমতার পরীা। নির্বাচন যেন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকে। নির্বাচন নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না ওঠে সেজন্য ইভিএমে ভোট হবে। ইভিএম নিয়ে যেন প্রশ্ন না ওঠে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অনাগ্রহের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে।’
তবে দেশের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন ও সিটি নির্বাচন সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের কোনোরূপ সম্ভাবনা নেই। তাই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উচিত একটি বিতর্কমুক্ত নির্বাচন করার স্বার্থে সিটি নির্বাচনে ইভিএম ইস্যুতে বিএনপির মতামতের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা। এক্ষেত্রে ইসির অনমনীয় মনোভাব জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। সুতরাং সিটি নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার ইস্যুতে ইসির বিতর্কমুক্ত থাকাই শ্রেয়।