প্রতিবেদন

উচ্চশিক্ষাকে কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছাতে পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ব্যয় বাড়ানোর তাগিদ

সাবিনা ইয়াছমিন
উচ্চশিক্ষাকে কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছাতে দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ব্যয় বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ গবেষণা হলেও এ কাজে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খুব একটা অগ্রগতি নেই। হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই নামকাওয়াস্তে গবেষণা পরিচালনা করছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও গবেষণায় কাক্সিত মানে পৌঁছতে পারেনি। ফলে দেশের উচ্চশিা কাক্সিত মানে পৌঁছতে পারছে না।
দেশে এখন কমবেশি ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সেগুলোর মধ্যে ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় ১ টাকাও ব্যয় করেনি। সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত গবেষণায় ব্যয় করেছে ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়। ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছে ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়। আর ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছে ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত গবেষণায় ব্যয় করেছে ৬১টি বিশ্ববিদ্যালয়।
শিাবিদরা বলছেন, ১ বছরে ২০ লাখ টাকা গবেষণায় ব্যয় করা কোনো গবেষণাই নয়। আসলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুই-তৃতীয়াংশই গবেষণা খাতে নামকাওয়াস্তে খরচ দেখিয়েছে।
একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যত শিক-শিার্থী আছেন সে তুলনায় গবেষণা খাতে ব্যয় খুবই নগণ্য বলে মনে করছেন শিাবিদরা। ৩৭ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৬টি গবেষণা খাতে কোনো ব্যয়ই করেনি। আর সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত গবেষণায় ব্যয় করেছে ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকাশনাই নেই।
গত ৩০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে ৪৫তম বার্ষিক প্রতিবেদন হস্তান্তর করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ২০১৮ সালের তথ্যে প্রণীত ওই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রমের চরম দুরবস্থা দেখা গেছে। তবে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে গবেষণা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, তাদের ব্যয় ছিল ৩৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, ভারতে গবেষণা এগিয়ে নিয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কিন্তু আমাদের মেধাবী ছেলে-মেয়েরা গবেষণার জন্য বিদেশে গিয়ে আর ফিরে আসছে না। তাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশে রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জুনিয়র ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো পদ সৃষ্টি করতে হবে। আর ইউজিসিকেও পৃথকভাবে গবেষণার জন্য বরাদ্দ করে তা মনিটর করতে হবে।
ইউজিসি বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ জ্ঞান সৃষ্টি এবং তা গবেষণা ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এক-তৃতীয়াংশই নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করে। তাই তারা গবেষণা নিয়ে চিন্তা করে না।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে
২০১৮ সালে গবেষণা খাতে সবচেয়ে
বেশি ব্যয় করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের ব্যয় ছিল ৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এরপর দ্বিতীয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং তৃতীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যয় করেছে ২ কোটি ৭ লাখ টাকা। এছাড়া ১ কোটি টাকার ওপরে গবেষণায় ব্যয় করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ১ কোটি ৪০ লাখ; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ১ কোটি ৯৯ লাখ; শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১ কোটি ৯৪ লাখ; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ১ কোটি ৮৬ লাখ; জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ১ কোটি ৪২ লাখ ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস ১ কোটি ৬ লাখ টাকা।
অপরদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে ১ টাকাও ব্যয় দেখানো হয়নি।
যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে ১ টাকাও ব্যয় করেনি তাদের অন্যতম পিপলস ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, পু-্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, রয়াল ইউনিভার্সিটি, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি, জেডএইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
আর সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত যারা ব্যয় করেছে তাদের মধ্যে আছে সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বরেন্দ্র ইউনিভার্সিটি, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, টাইমস ইউনিভার্সিটি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এনপিআই ইউনিভার্সিটি ও নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, খুলনা।
এছাড়া ২০ লাখ টাকার মধ্যে ব্যয় করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ও ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ অন্যতম।
তবে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির পর গবেষণায় ব্যয় করা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি ৬ কোটি ৭৬ লাখ; নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ৫ কোটি ৫৬ লাখ; সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি ৪ কোটি ৮২ লাখ; আমেরিকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ৪ কোটি ৩৪ লাখ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। তবে ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের নামে গবেষণা ব্যয় ৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা দেখানো হলেও তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন খোদ ইউজিসির কর্মকর্তারাই।