ফিচার

দেখে আসুন শশীলজ রাজবাড়ি

আহমেদ রাজু
রাজবাড়ি মানেই পুরনো স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত বিশাল আকারের দালানকোঠা, ফুলের বাগান ও দিঘি। কালের বিবর্তনে দেশের বেশিরভাগ রাজবাড়িই আজ ধ্বংসের মুখে। তবে কিছু বাড়ি শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়।
স্বদেশ খবর চলতি সংখ্যার আয়োজন ময়মনসিংহের শশীলজ রাজবাড়ি। বিদেশ ভ্রমণের আগে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানার ও দেখার জন্য যে কেউই ঘুরে আসতে পারেন শশীলজ রাজবাড়ি থেকে। রাজধানী ঢাকা থেকে গিয়ে এ রাজবাড়ি দর্শন করে দিনে দিনেই আবার ফিরে আসা যাবে।
প্রাচীন ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহ। শহরে অবস্থিত রাজা শশীকান্ত আচার্যের ২০০ বছরের পুরনো রাজবাড়িটি মূলত শশীলজ নামে পরিচিত। প্রায় ৯ একর জমির ওপর লালচে-হলুদ ইট দিয়ে গাঁথা ১৬টি গম্বুজের দ্বিতল জমিদারবাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল। বাড়ির সামনে উঠানজুড়ে রয়েছে বাগান। শশীলজ নামের এই জমিদারবাড়িটির মূল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী।
জানা যায়, মুক্তাগাছার রাজা সূর্যকান্তের কোনো সন্তান না থাকায় তিনি স্থানীয় এক ছেলেকে দত্তক নেন, যার নাম শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী। তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে বিলাসবহুল বাড়িটির নাম রাখা হয় শশীলজ।
বিখ্যাত এই ভবনটি ১৮৯৭ সালের ১২ জুন গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হলে অত্যন্ত ব্যথিত হন মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। এরপর ১৯০৫ সালে ঠিক একই স্থানে নতুন রূপে শশীলজ নির্মাণ করেন তারই ছেলে ও পরবর্তী জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী। ১৯১১ সালে শশীলজের সৌন্দর্যবর্ধনে শশীকান্ত আচার্য আরও কিছু সংস্কারকাজ সম্পন্ন করেন। নবীন জমিদারের প্রাণান্ত প্রয়াসে শশীলজ হয়ে ওঠে অনিন্দ্যসুন্দর, অপরূপ।
১৯৫২ সাল থেকে শশীলজের বিভিন্ন কে মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ময়মনসিংহ সদরে দৃষ্টি ফেললে উদ্ভাসিত হয় উঁচু দেয়ালঘেরা শশীলজের প্রবেশদ্বার। ভেতরে প্রবেশ করলেই শানবাঁধানো প্রবেশপথের সামনে শশীলজের সাজানো বাগান। বিচিত্র প্রজাতির ফুলশোভিত সেই বাগানের মধ্যভাগে বৃত্তাকার জলফোয়ারা। ফোয়ারার কেন্দ্রে অনুচ্চ বেদির ওপর দ-ায়মান গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত স্বল্পবসনা নারীমূর্তি।
বাগানের ঠিক পেছনেই লালচে ইট আর হলুদ দেয়ালে নির্মিত শশীলজ। বারান্দা অতিক্রম করে কয়েক ধাপ সিঁড়ি পেরোলেই রঙ্গালয়। সুদৃশ্য সেই রঙ্গালয়ের এক প্রান্তে বিশ্রামঘর। বিশ্রামঘরের পর কাঠের মেঝেযুক্ত হলঘর। হলঘরের পাশেই বর্ণিল মার্বেল পাথরে নির্মিত আরেকটি জলফোয়ারা।
শশীলজে রয়েছে ৩৬টি ঘর। সেসব ঘরের ছাদ থেকে ঝুলছে ঝাড়বাতি। ভবনের ভেতরে রয়েছে মার্বেল পাথরের ফোয়ারা।
অতীতে দুষ্প্রাপ্য নাগলিঙ্গমগাছ ছিল, যা তখন হাতির খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
ভবনের পেছন দিকে রয়েছে গোসলখানা। ধারণা করা হয়, এখানে বসেই রানী পাশের পুকুরে ভেসে বেড়ানো হাঁসের খেলা দেখতেন। পুকুরঘাটটি ছিল মার্বেল পাথরের।
লোকমুখে শোনা যায়, মহারাজ শশীকান্ত আচার্যের যুগে পেছন দিকের মার্বেল পাথর দিয়ে ঘাটলা বাঁধা পুকুরটিতে বিশালাকৃতির অনেক মাছ রয়েছে, ঠিক সন্ধ্যার সময় টিপটিপ বৃষ্টি ঝরলে মাছগুলো ভেসে ওঠে। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি মাছ দৃষ্টিহীন।
জমিদারি প্রথা শেষ হলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার জামিদারদের সকল ভবন ও সম্পত্তি সরকারের খাস জমি ও ভবন হিসেবে ঘোষণা দেয়। সরকার শশীলজকে ‘মহিলা শিকিা প্রশিণ মহাবিদ্যালয়’ ঘোষণা দিয়ে শিা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ করে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার হেরিটেজ ভবন হিসেবে মূল ভবনটিকে মহিলা শিকিা প্রশিণ মহাবিদ্যালয় থেকে আলাদা করে প্রতœতাত্বিক ও জাদুঘর অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে। বর্তমানে এটি ‘ময়মনসিংহ জাদুঘর’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
শশীলজে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘অয়োময়’ নাটকের জমিদারবাড়ির দৃশ্যগুলো ধারণ করেছিলেন। তখন শশীলজ দেশব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

যেভাবে যাবেন, যেখানে খাবেন
ঢাকা থেকে এনা ও শৌখিন পরিবহনের বাসে ২০০ থেকে ২২০ টাকা ভাড়ায় ময়মনসিংহ যাওয়া যায়। মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাস থামবে। সেখান থেকে রিকশায় যেতে পারবেন শশীলজ। ভাড়া নেবে ৩০-৪০ টাকা।
ট্রেনেও যেতে পারবেন ময়মনসিংহ। ঢাকা থেকে তিস্তা, মোহনগঞ্জ, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও হাওর এক্সপ্রেস যায় ময়মনসিংহ। ভাড়া নেবে শ্রেণিভেদে ১২০-৩৬০ টাকা। ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন থেকে ২০ টাকা রিকশা ভাড়ায় শশীলজ যেতে পারবেন।
খাওয়ার জন্য ময়মনসিংহে রয়েছে বেশকিছু রেস্টুরেন্ট। ঘরোয়া পরিবেশে খাওয়ার জন্য সুনন্দা কেবিন অন্যতম। শশীলজ থেকে ফেরার সময় মুক্তাগাছার ম-া কিনে নিয়ে আসতে পারেন। বাস বা ট্রেনে বসে ম-ার স্বাদ নিতে নিতে ফিরে আসবেন ঢাকা।