ফিচার

নিউমোনিয়ার কারণ প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়

ডা. কামরুল ইসলাম
আমাদের দেশে বহুল পরিচিত একটি প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগের নাম নিউমোনিয়া। এদেশে শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে এই নিউমোনিয়া। তাই স্বদেশ খবর চলতি সংখ্যায় এ রোগের কারণ ও এর প্রতিকার নিয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো।

নিউমোনিয়া কি?
নিউমোনিয়া হচ্ছে ফুসফুসের প্রদাহজনিত একটি সংক্রামক রোগ। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক কিংবা যেকোনো ধরনের পরজীবী সংক্রমণের কারণে এই রোগ হয়। এ রোগ হলে শরীরে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের স্বাভাবিক আদান-প্রদান প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

কিভাবে ছড়ায়?
এটি একটি বায়ুবাহিত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত রোগীর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে নিউমোনিয়ার জীবাণু সহজেই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং নিশ্বাসের মাধ্যমে এই জীবাণু সুস্থ মানুষের শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়।

নিউমোনিয়ার উপসর্গ
সাধারণ সর্দিকাশি দিয়েই নিউমোনিয়ার লণ শুরু হয়। শিশুর বয়সভেদে রোগের উপসর্গেও তারতম্য দেখা দেয়। শিশুর নিউমোনিয়া হলে যেসব লণ বা উপসর্গ দেখা যেতে পারে সেগুলো হলো: প্রচ- জ্বর, কাঁপুনি, কাশি, সর্দি, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, শ্বাসে শাঁ শাঁ শব্দ, শ্বাসকষ্ট (নাসারন্ধ্র ফুলে ফুলে ওঠা, দ্রুত পেট ওঠা-নামা, পাঁজরের মাংশপেশি দেবে যাওয়া), নির্জীব হয়ে পড়া, দুধ চুষে খেতে না পারা, ঠোট ও আঙুলের নখ ধূসর অথবা নীলাভ রঙ ধারণ করা, বমি, পেট ব্যথা, বুক ব্যথা ইত্যাদি।

নিউমোনিয়া কাদের হয়?
সব বয়সেই নিউমোনিয়া হতে পারে। তবে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। দেখা গেছে, যেসব শিশু অপুষ্ট হয়ে জন্ম নিয়েছে, কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, ঠিকমতো বুকের দুধ খায়নি, সময়মতো টিকা নেয়নি, ঘনবসতি বা স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে বাস করে, যে ঘরে বড়রা ধূমপান করে Ñ তাদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি হয়।
এছাড়া বয়স্কদের বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস, হাঁপানি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগ থাকার কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধমতা কমে গেছে, তারা অতি সহজেই নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হতে পারে।

নিউমোনিয়া হলে কি হয়?
বাতাস থেকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন গ্রহণ এবং শরীরের অপ্রয়োজনীয় কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দেয়াটাই হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রধান কাজ। নিউমোনিয়ার কারণে ফুসফুস তিগ্রস্ত হয় বলে বাতাসের এই আদান-প্রদান বাধাগ্রস্ত হয়। যার ফলে অক্সিজেন পাওয়া থেকে শরীর বঞ্চিত হয় এবং বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শরীরে জমা হয়; যা দ্রুত মস্তিস্ক, হৃৎপি-, কিডনি ইত্যাদিকে তিগ্রস্ত করে শিশুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে।
জীবাণু দ্বারা শ্বাসনালি আক্রান্ত হলেই কাশি ও জ্বরের সাথে শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পায়। এই গতি ২ মাসের কম বয়সী শিশুদের ৬০; ২ মাস থেকে ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৫০; ১ বছরের বেশি এবং ৫ বছরের নিচের শিশুদের প্রতি মিনিটে ৪০ বা তার চেয়ে বেশি হলে চিকিৎসকরা নিউমোনিয়ার কারণেই দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে বলে ধরে নেন।
জ্বরের সাথে শিশুর শ্বাসকষ্ট শুরু হলেই তাকে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। ২ মাসের কম বয়সী শিশুদের নেতিয়ে যাওয়া, খিঁচুনি হওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খেতে না পারার লণ থাকলে দ্রুত ডাক্তার বা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

নিউমোনিয়ার চিকিৎসা
লণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে দেরি না করে শিশুকে নিকটস্থ হাসপাতাল বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সঠিক সময়ে দ্রুত চিকিৎসা পেলে এই রোগ হতে পুরোপুরি আরোগ্য লাভ সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে কম সংক্রমিত শিশুকে বাড়িতে রেখেই ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা করানো সম্ভব। এেেত্র শিশুকে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসে আরামে শ্বাস নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুর খাবার এবং শরীরের পানির পরিমাণ ঠিক রাখতে হবে। নাক যেন বন্ধ না থাকে, সবসময় খেয়াল রাখতে হবে। বেশি আক্রান্ত নিউমোনিয়া রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে।

নিউমোনিয়া প্রতিরোধে করণীয়
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। শিশুর নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে শিশুর মা। জন্মের ১ ঘন্টার মধ্যে শিশুকে শালদুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যা নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত ভ্যাকসিন হিসেবে কাজ করবে।
শিশু জন্মের প্রথম ৬ মাস তাকে শুধু বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। ৬ মাস পর বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। বাড়ির সকলকে অবশ্যই দিনে কয়েকবার সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। বিশেষ করে বাইরে থেকে ঘরে আসার পর এবং শিশুকে কোলে নেয়ার আগে। গর্ভধারণকালে মায়েদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাদের যথাযথ যতœ নিতে হবে যাতে অপরিণত বা স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম না হয়। কোনো শিশু অপরিণত বয়সে বা স্বল্প ওজন নিয়ে জন্ম নিলে তাদের ব্যপারে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধমতা অনেক কম থাকে, তাই তার যথাযথ পুষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুকে সময়মত সরকারিভাবে প্রদত্ত সবগুলো টিকা দিতে হবে। ঠা-া-কাশিতে অথবা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগী থেকে দূরে রাখতে হবে। শিশুর থাকার জায়গা এবং বাড়ির পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বাড়িতে আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশুকে সিগারেট বা চুলার ধোঁয়া থেকে দূরে রাখতে হবে।