প্রতিবেদন

পিইসি-ইবতেদায়ি জেএসসি-জেডিসিতে ভালো ফল সাফল্যে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
পাসের হার ও সর্বোচ্চ স্কোর জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধিসহ ফলের সব সূচকেই ২০১৯ শিক্ষাবর্ষে সাফল্য দেখিয়েছে পিইসি-ইবতেদায়ি এবং জেএসসি-জেডিসি শিার্থীরা। ভালো এ ফলে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনিও। সংবাদ সম্মেলনে ফলের পরিসংখ্যান তুলে ধরে শিামন্ত্রী বলেন, পরীায় পাসের জন্য শিার্থী ও অভিভাবকরা উভয়ে অনেক কষ্ট করেন। জিপিএ ৫ পাওয়াটাই প্রধান বিষয় নয়, শিার্থীরা পাস করছে, তারা ভালো ফল পাচ্ছে সেটিই আমাদের কাছে প্রধান। আমরা পরীা কমিয়ে কাস মূল্যায়ন বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছি। সে ল্েয কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুত জেএসসি পরীার বদলে কাস মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হবে। এর সঙ্গে ২০২১ সাল থেকে বর্তমান জিপিএ ৫ পদ্ধতি পরিবর্তন করে তা বাস্তবায়ন করা হবে।

পিইসি-ইবতেদায়িতে
পাস ৯৫.৭৩ শতাংশ
প্রাথমিক শিা সমাপনী (পিইসি) ও ইবতেদায়ি পরীায় গড়ে পাস করেছে ৯৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ শিার্থী। এর মধ্যে পিইসিতে ৯৫ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ইবতেদায়িতে ৯৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ শিার্থী পাস করেছে। পিইসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৮৮ জন, আর ইবতেদায়িতে এ সংখ্যা ১১ হাজার ৮৭৭ জন।

২০১৮ সালে পিইসিতে ৯৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ ও ইবতেদায়িতে ৯৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ শিার্থী পাস করেছিল। সেই হিসাবে ২০১৯ সালে প্রাথমিকে পাসের হার কমেছে ২ দশমিক ০৯ শতাংশ। আর ইবতেদায়িতে কমেছে ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
২০১৯ সালের শেষ দিন প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়ের সভাকে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন ও সচিব আকরাম আল হোসেন ক্ষুদে শিার্থীদের এই ফল প্রকাশ করে এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এ সময় সচিব জানান, মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণে পাসের হার কমেছে। এর আগে তারা গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ফলের সার-সংপে হস্তান্তর করেন।
পিইসিতে ২০১৯ সালে ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ১৫১ শিার্থী অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে ২৩ লাখ ৪৩ হাজার ৭৪৩ জন পাস করেছে। আর ইবতেদায়ির সমাপনীতে অংশ নেয়া ৩ লাখ ৪ হাজার ১৭৮ শিার্থীর মধ্যে ২ লাখ ৯১ হাজার ৮৭৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পিইসিতে উত্তীর্ণদের মধ্যে ৯৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ ছাত্র ও ৯৫ দশমিক ৬১ শতাংশ ছাত্রী। ইবতেদায়িতে ৯৫ দশমিক ৫০ শতাংশ ছাত্র ও ৯৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ ছাত্রী পাস করেছে।
পিইসিতে ৮ বিভাগের মধ্যে বরিশাল বিভাগের পাসের হার সর্বোচ্চ ৯৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। জেলার হিসাবে গাজীপুরে পাসের হার সব থেকে বেশি, ৯৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। ভোলার দৌলতখান উপজেলায় শতভাগ শিার্থী পাস করেছে।
ইবতেদায়িতে ৮ বিভাগের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে পাসের হার সবচেয়ে বেশি, ৯৭ দশমিক ৮১ শতাংশ। নওগাঁ জেলায় শতভাগ শিার্থী পাস করেছে। ৮৩টি উপজেলায় শতভাগ শিার্থী পাস করেছে।
পিইসিতে শতভাগ পাস করা স্কুলের সংখ্যা ৬৭ হাজার ৮৯৩টি। একজনও পাস করেনি এমন প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৩৪১টি। ইবতেদায়িতে ১১ হাজার ৩০৮টি মাদ্রাসার শতভাগ শিার্থী পাস করেছে; ৪০টি মাদ্রাসার কেউ পাস করতে পারেনি।
ফল প্রকাশ উপলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কেন পাসের হার কমলÑ এ প্রশ্নে প্রাথমিক ও গণশিা সচিব বলেন, ‘এতদিন যে উপজেলার খাতা সেই উপজেলায় মূল্যায়ন করা হতো। এবার আমরা পরিবর্তন করে দিয়েছি। মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে হয়ত কিছুটা কমতে পারে।’
প্রাথমিক শিা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এফ এম মঞ্জুর কাদির বলেন, ‘পাসের হার প্রতি বছর ক্রমান্বয়ে বাড়বে না। তাহলে তো ১০০ ক্রস করে যাবে। কখনো কমবে, কখনো বাড়বে। প্রশ্ন হয়ত এবার সেভাবেই হয়েছে, যার ফলে পাস কমে এসেছে। এমসিকিউ তুলে দেয়া হয়েছে, এরও একটা প্রভাব থাকতে পারে।’

জেএসসি-জেডিসিতে
পাস ৮৭.৯০ শতাংশ
জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীায় ২০১৯ সালে পাস করেছে ৮৭ দশমিক ৯০ শতাংশ শিার্থী, যা ২০১৮ সালের চেয়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। ওই বছর পাস করেছিল ৮৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিার্থী। ২০১৯ সালে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৭৮ হাজার ৪২৯ জন শিার্থী, ২০১৮ সালে পেয়েছিল ৬৮ হাজার ৯৫ জন। এ হিসাবে ২০১৯ সালে জিপিএ ৫ বেড়েছে ১০ হাজার ৩৩৪ জন। অর্থাৎ পাসের হার ও জিপিএ ৫ দুটোই বেড়েছে।
৩১ ডিসেম্বর শিা মন্ত্রণালয়ের সভাকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করেন শিামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এর আগে সব বোর্ড চেয়ারম্যানকে নিয়ে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে জেএসসি-জেডিসি ফলের কপি হস্তান্তর করেন তিনি।
২০১৯ সালে জেএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৭৬ হাজার ৭৪৭ জন, ২০১৮ সালে পেয়েছিল ৬৬ হাজার ১০৮ জন। অর্থাৎ ২০১৯ সালে জেএসসিতে জিপিএ ৫ বেড়েছে ১০ হাজার ৬৩৯ জন। ২০১৯ সালে জেডিসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১ হাজার ৬৮২ জন, ২০১৮ সালে পেয়েছিল ১ হাজার ৯৮৭ জন।
২০১৯ সালে জেএসসি ও জেডিসি পরীায় পাসের হার ও জিপিএ ৫ দুই সূচকেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। মেয়েদের পাসের হার ৮৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ ও ছেলেদের ৮৭ দশমিক ০৩ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ছিল ৮৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ ও ৮৫ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৯ সালে মেয়েরা জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪৫ হাজার ৮৮৩ জন, ২০১৮ সালে পেয়েছিল ৩৯ হাজার ৯০৫ জন। এবার ৫ হাজার ৯৭৮ জন বেশি মেয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। ছেলেদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৩২ হাজার ৫৪৬ জন, ২০১৮ সালে পেয়েছিল ২৮ হাজার ১৯০ জন।
২০১৮ সালে জেএসসি-জেডিসিতে ৪ হাজার ৭৬৯টি শিাপ্রতিষ্ঠানের সব শিার্থী পাস করেছিল। আর ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিার্থী পাস করতে পারেনি। এ হিসাবে ২০১৯ সালে শতভাগ শিার্থী পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৪৭৪টি। আর কেউ পাস করতে পারেনি এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ১০টি। জেএসসিতে ঢাকা বোর্ডের ৩২৭টি, রাজশাহীর ৮২০টি, কুমিল্লার ২৩৯টি এবং যশোর বোর্ডের ৪৯৬টি শিাপ্রতিষ্ঠানের সব শিার্থী পাস করেছে। আর চট্টগ্রাম বোর্ডের ১০২টি, বরিশালে ৭৮৩টি, সিলেটে ১৭৬টি, দিনাজপুরে ২৮৪টি, ময়মনসিংহ বোর্ডের ১৭৩টি এবং মাদ্রাসা বোর্ডের ১ হাজার ৮৪৩টি প্রতিষ্ঠানের সব শিার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে মাদ্রাসা বোর্ডের ১৯টি, দিনাজপুর বোর্ডের ৯টি, ঢাকা ও রাজশাহী বোর্ডের দুটি করে এবং ময়মনসিংহ বোর্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিার্থী পাস করতে পারেনি।

শিা বোর্ডে পাসের হার
জেএসসি জেডিসিতে ৯টি সাধারণ শিা বোর্ডের মধ্যে ২০১৯ সালে বরিশালে সর্বোচ্চ ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিার্থী পাস করেছে। রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৯৪ দশমিক ১০ শতাংশ, যশোরে ৯১ দশমিক ০৮, সিলেটে ৯২ দশমিক ৭৯, দিনাজপুর ৮৩ দশমিক ৯২, ঢাকায় ৮২ দশমিক ৭২, চট্টগ্রামে ৮২ দশমিক ৯২, কুমিল্লায় ৮৮ দশমিক ৮ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ৮৭ দশমিক ২১ শতাংশ শিার্থী পাস করেছে। মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৮৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে ছিল ৮৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। পাসের হার বেড়েছে ০ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
২০১৯ সালে ৯টি সাধারণ শিা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিা বোর্ডের অধীনে জেএসসি ও জেডিসি পরীায় অংশ নেয় ২২ লাখ ২১ হাজার ৫৯১ শিার্থী, যা ২০১৮ সালে ছিল ২২ লাখ ১৬ হাজার ৯৬১ জন। এ হিসাবে পরীার্থী বেড়েছে ৪ হাজার ৬৩০ জন। অংশগ্রহণকারী শিার্থীদের মধ্যে পাস করেছে ১৯ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৮ জন, যা ২০১৮ সালে ছিল ১৮ লাখ ৯০ হাজার ৫১৮ জন। এ হিসাবে পাসের সংখ্যা বেড়েছে ৫৫ হাজার ২০০ জন।

পাসের হার ও জিপিএ-৫
এ এগিয়ে মেয়েরা
জেএসসি-জেডিসি এবং প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিা সমাপনী পরীার ফলাফলে পাশের হার ও জিপিএ-৫ সব সূচকেই ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে ছিল মেয়েরা।
২০১৯ সালে জেএসসি-জেডিসিতে মোট অংশগ্রহণকারী পরীার্থীর সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ২ হাজার ৫৩, যা গত বছর ছিল ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ১৬৯। ২০১৯ সালে পাস করেছে ২২ লাখ ৮৭ হাজার ২৭১ জন, যা আগের বছর ছিল ২২ লাখ ৩০ হাজার ৮২৯ জন। ২০১৯ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৮ হাজার ৪২৯ জন শিার্থী। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৮ হাজার ৯৫।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেএসসি ও জেডিসি পরীায় পাশকৃত ছাত্রের সংখ্যা ১০ লাখ ৪০ হাজার ৭৪২ আর পাশকৃত ছাত্রীর সংখ্যা ১২ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৯। অর্থাৎ, পাশের সংখ্যায় ছেলেদের চেয়ে ২ লাখ ৫ হাজার ৮৮৭ জন মেয়ে বেশি পাশ করেছে।
সে হিসেবে জেএসসি ও জেডিসি পরীায় ছেলেদের পাশের হার ৮৭ দশমিক ০৩ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ছিল ৮৫ দশমিক ১২ শতাংশ। মেয়েদের পাশের হার ৮৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ছিল ৮৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ছেলেদের পাশের হার ২০১৮ সালের চেয়ে বেড়েছে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর মেয়েদের ২ দশমিক ২১ শতাংশ বেড়েছে। এেেত্র ছেলেদের তুলনায় ১ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি মেয়ে পাশ করেছে।
অন্যদিকে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যায়ও এগিয়ে আছে মেয়েরাই, যেখানে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩২ হাজার ৫৪৬ জন ছেলে। সেখানে মেয়েদের েেত্র এই সংখ্যা ৪৫ হাজার ৮৮৩। এখানেও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ১৩ হাজার ৩৩৭ জনে এগিয়ে।
অন্যদিকে ২০১৯ সালে প্রাথমিক শিা সমাপনী পরীায় মোট ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ১৫১ জন পরীার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে ১১ লাখ ২৪ হাজার ২২৫ জন ছাত্র এবং ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৯২৬ জন ছাত্রী। তাদের মধ্যে ১০ লাখ ৭২ হাজার ১৫৪ জন ছাত্র এবং ১২ লাখ ৭১ হাজার ৫৮৯ জন ছাত্রী পাশ করেছে। মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৮৮ জন, যার মধ্যে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৫১ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩৭ জন ছাত্রী।
এদিকে ইবতেদায়ি শিা সমাপনী পরীায় মোট ৩ লাখ ৪ হাজার ১৭৮ জন পরীার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৩৬ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪২ জন ছাত্রী। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার ৮৩৫ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ৪১ হাজার ৪০ জন ছাত্রী পাশ করেছে। মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১ হাজার ৮৭৭ জন, যার মধ্যে ৫ হাজার ৬৮৫ জন ছাত্র এবং ৬ হাজার ১৯২ জন ছাত্রী। এখানে জিপিএ-৫ এর েেত্রও মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে।