প্রতিবেদন

বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩১ ডিসেম্বর গণভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২০ শিাবর্ষের জন্য সারাদেশে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিার্থীদের হাতে প্রতীকীভাবে নতুন বছরের নতুন পাঠ্যপুস্তক তুলে দেয়ার মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী বই উৎসব কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
একই অনুষ্ঠানে এ বছরের প্রাথমিক শিা সমাপনী (পিইসি) ও ইবতেদায়ী এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীার ফলাফল প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শিামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) এবং প্রাথমিক ও গণশিা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন প্রাথমিক শিা সমাপনী (পিইসি) ও ইবতেদায়ী পরীার ফল প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।
শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়ার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে খেলায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবনের খেলার মাঠে তিনি শিশুদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠেন। পরে তাদের চকলেট উপহার দেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে শিা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর নবনিযুক্ত মুখ্য সচিব ড. আহমাদ কায়কাউস, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের বিদায়ী সচিব মো. সোহরাব হোসেইন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব সাজ্জাদুল হাসান, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, প্রাথমিক ও গণশিা সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেইন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গরিব বাবা-মার ওপর যেন চাপ না পড়ে, সেজন্য আমরা বছরের শুরুতেই বই দিচ্ছি। স্কুল ও কলেজ সরকারি করে দিচ্ছি। শিার্থীদের যেন নদী-নালা, খাল-বিল পার হতে না হয়, সেটা বিবেচনায় রেখে স্কুল করে দিচ্ছি। শিকদের বেতন বাড়িয়ে দিয়েছি। উচ্চশিাসহ সর্বস্তরে বৃত্তি দেয়া হচ্ছে। স্কুলে টিফিনের ব্যবস্থা করেছি। কোনো শিার্থী যেন ঝরে না পড়ে, এজন্য সরকারের প থেকে সাহায্য করা হচ্ছে।
৩১ ডিসেম্বর প্রতীকীভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়ার পরদিন ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বই উৎসব পালিত হয়। বছরের প্রথম দিনই দেশের ৪ কোটি ২৭ লাখ স্কুল শিার্থীর হাতে ৩৫ কোটি ৩৯ লাখ নতুন ঝকঝকে পাঠ্যবই তুলে দেয়া হয়।
যথারীতি এবারও বই উৎসবের কেন্দ্রীয় আয়োজন ছিল দুটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বই বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করে প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়। রাজধানীর অদূরে সাভারের অধর চন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে উৎসবের আয়োজনে ছিল শিা মন্ত্রণালয়। দুই অনুষ্ঠানেই শান্তির প্রতীক সাদা পায়রা এবং রঙিন বেলুন উড়িয়ে দেয়া হয় নীল আকাশে। শিশুবান্ধব এ অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, বিশিষ্ট নাগরিক, সাহিত্যিক, শিক, তারকা ক্রিকেটারসহ উপস্থিত ছিলেন অনেকেই। ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু, শিরীন আক্তার, বিশ^সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, প্রাথমিক শিা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এফ এম মঞ্জুর কাদির, অতিরিক্ত মহাপরিচালক সোহেল আহমেদ প্রমুখ।
প্রাথমিক ও গণশিা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ৫৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছেন। এর ফলে প্রাথমিক শিার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সকল শিা প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য আনন্দপূর্ণ করার উদ্যোগ নিয়েছি। ২০৪১ সালে আমাদের এই শিশুরা সোনার বাংলা গড়ে তুলবে। আমাদের দেশের এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও কর্মমুখী শিায় শিতি করতে হবে। নতুন বছরের শুরু থেকে মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করে আদর্শ মানুষ হতে হবে।
খেলার মাঠের এই অনুষ্ঠানে নতুন বই পেয়ে দারুণ উল্লসিত ছিল শিার্থীরা। ড্রাম ও বাঁশির বাদন আর শিশুদের কলকাকলিতে মুখর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ। শিশুদের বইয়ের আকর্ষণের বাইরেও আগ্রহের কেন্দ্রে ছিলেন প্রিয় অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। শিশুদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দিয়ে উৎসাহ জোগান খ্যাতিমান ক্রিকেটার সাকিব। শিশুদের হাতে বই তুলে দেয়ার প্রস্তুতির সময় তিনি শিশুদের সঙ্গে গল্পও জমিয়েছেন। তাদের নানা গল্প ও আনন্দ উচ্ছ্বাসে নিজেকে শামিল করেন সাকিব। বই উৎসবের এই দৃশ্যে অনেকের চোখ আটকে যায়।
এদিকে অধর চন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শিা মন্ত্রণালয়ের বই উৎসবকে ঘিরে ছিল নানা আয়োজন। যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেনের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিা বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব মুনশী শাহাবুদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
শিামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, শিার্থীদের ওপর থেকে পরীার চাপ কমানো এবং শিাকে আনন্দময় করতে পরীার মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনে কাজ করছে সরকার। সেেেত্র ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শারীরিক শিা, খেলাধুলা, চারু ও কারু এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি প্রভৃতি বিষয় এ বছর থেকে ধারাবাহিক মূল্যায়নের আওতায় আসবে।
জানা গেছে, এবার সারাদেশে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ১৯৮ জন শিার্থীকে দেয়া হচ্ছে ৩৫ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৯৭ কপি বই। যার মধ্যে প্রাথমিকে ১০ কোটি ৫৪ লাখ ২ হাজার ৩৭৫ কপি এবং মাধ্যমিকে ২৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ১৭৯ কপি বই।
বই ছাপানো ও বিতরণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি করে থাকে জাতীয় শিাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এনসিটিবি জানিয়েছে, পাঠ্যবই ছাপাতে এবার প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা খরচ করেছে সরকার। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা এবং মাধ্যমিক স্তরসহ অন্য বই ছাপাতে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১০০ কোটি টাকা কম।
প্রাক-প্রাথমিক স্তরে দুই বিষয়ে ৩২ লাখ ৭২ হাজার ১৮৬ জন শিার্থীকে ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৬টি বই বিতরণ করা হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির আদিবাসী শিার্থীরা পেয়েছে ৯৭ হাজার ৫৭২ শিার্থীর মধ্যে ২ লাখ ৩০ হাজার ১০৩টি বই। মাদ্রাসা শিায় এবতেদায়ি পর্যায়ে ৩২ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৫ শিার্থীর মধ্যে ৩৬ বিষয়ে ২ কোটি ৩২ লাখ ৪৩ হাজার ৩৫টি বই বিতরণ করা হয়েছে।
দাখিলে ২৬ লাখ ২৬ হাজার ৬২৫ শিার্থীর মধ্যে দেয়া হয় ৩৯ বিষয়ে ৩ কোটি ৮৫ লাখ ৩৭ হাজার ৯০৫টি বই। আর কারিগরিতে ২ লাখ ৭১ হাজার ৮৯৩ শিার্থীর ৬১ বিষয়ে ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৩৩টি, এসএসসি ভোকেশনালে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫০ শিার্থীর ১৯ বিষয়ে ৩৫ লাখ ২ হাজার ৭৬৫ এবং দাখিল ভোকেশনালে ১২ হাজার ২৫৫ শিার্থীর মধ্যে ১৭ বিষয়ে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৬৫ বই বিতরণ করা হচ্ছে। এবার ৭৫০ প্রতিবন্ধী শিার্থীকে ১১০ বিষয়ে ৯ হাজার ৫০৪টি ব্রেইল বই দেয়া হয়েছে।
প্রতি বছরের মতো এবারও চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাঝে তাদের মাতৃভাষায় লেখা বই দেয়া হচ্ছে। তবে এবার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিার্থীদের পাশাপাশি তৃতীয় শ্রেণির শিার্থীরাও মাতৃভাষায় লেখা বই পাচ্ছে।
সরকারের এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে জানা গেছে, ২০০৯ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত কয়েকটি ক্যাটাগরির কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অর্ধেক নতুন ও অর্ধেক পুরনো পাঠ্যবই বিনামূল্যে দেয়া হতো। এসব বইও সময়মতো শিার্থীরা পেত না। বই পেতে পেতে মার্চ-এপ্রিল পার হয়ে যেত। এতে কাস শুরু হতেও অনেক দেরি হতো।
প্রতিবারই অসাধু প্রেস মালিকদের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ত পাঠ্যবই ছাপার কাজ। সময়মতো বই না পাওয়ায় এবং উচ্চ দরে বাজার থেকে বই কিনতে না পেরে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে ঝরে পড়ত। হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বাদ দিলে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মোট জনসংখ্যাও ৪ কোটি নয়। সেখানে বছরের প্রথম দিনই দেশের প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ৪ কোটির বেশি শিার্থীর হাতে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি বই তুলে দিচ্ছে সরকার, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।