প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত : মাদক নির্মূলে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

মো. নিজাম উদ্দিন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা দিয়েছেন। তার নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং সমাজকে মাদকমুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতায় অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে এ সংস্থা।
মাদক নির্মূলে বিশেষ করে ২০১৭ সালের জুন থেকে নানা সৃজনশীল কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সরকারের অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ের ওপর দেয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। সমাজ থেকে মাদক নির্মূলের কাজটি শুধু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একার নয়, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও অন্যদেরও Ñ প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনীও এখন মাদক নির্মূলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, যে কারণে কমে এসেছে মাদক চোরাচালান ও এর ব্যবহার। মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনেও কাজ করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এমনকি দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক ব্যাপক কর্মসূচিও পরিচালনা করছে সংস্থাটি।
সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অত্যন্ত দায়িত্বশীল। মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বড়, মাঝারি ও নিম্ন বিবেচনা করা হয় না; দলমত নির্বিশেষে সবার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এক্ষেত্রে কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দেয় না। সন্ত্রাস-জঙ্গি দমনে সফলতার পর দেশ থেকে মাদক নির্মূলেও কঠোর অবস্থানে থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই মাদক ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘কি ছোট কারবারি, কি গডফাদার Ñ গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে এখন কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ বা বিধিনিষেধ নেই। তাই সমাজ বা রাষ্ট্রে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর; যার সুফল পেতে শুরু করছে দেশের মানুষ।’
এ অবস্থায় ২ জানুয়ারি রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদক নির্মূলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। তা বাস্তবায়নে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টরা কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, মাদক নির্মূলে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, সবাইকে মাদকের কুফল সম্পর্কে জানাতে হবে। যার যার অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। তবেই সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মাদকাসক্তরা যাতে সুচিকিৎসা পান সেজন্য সরকারিভাবে মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি অনেকগুলো বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্র ও ৪টি বিভাগীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৮ হাজারেরও বেশি মাদকাসক্তকে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহিদুজ্জামান, ডা. অরূপ রতন চৌধুরী প্রমুখ।

দুই.
দেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠা মাদক নিয়ন্ত্রণে বহুমুখী চাপ সামাল দিচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সব সংস্থা মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও আইন অনুযায়ী বিশেষায়িত এ অধিদপ্তরের কর্মত্রে বেশি। সরকারের অগ্রাধিকার ইস্যুর কারণে মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে থাকতে হচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে।
অধিদপ্তরের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মাদকের বিষয়ে অভিযোগ জানানোর হটলাইন চালু করা হয়েছে। নতুন মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ বাস্তবায়নে ৬টি বিধিমালার কাজ চলছে। চাকরির জন্য ডোপ টেস্ট বাস্তবায়ন, বন্দরে ড্রাগ ডিটেক্টর মেশিন স্থাপন, আরো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন, মাদক কারবারিদের তালিকা প্রণয়ন এবং নতুন করে অভিযান পরিচালনাসহ বেশকিছু পদপে নিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
ডিএনসির ডিজি মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলে এবার তাঁর স্মৃতির প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উৎসর্গ করা হয়েছে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর থিম হচ্ছে ‘মাদককে রুখব, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ব।’
ডিজি আরো বলেন, সমাজের মানুষের সামনে মাদকের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে এ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ মাদক নিয়ে আমাদের তথ্য দিতে পারবেন। ০১৯০৮৮৮৮৮৮৮ নম্বরে ফোন করলেই দ্রুত সেখানে আমাদের লোকজন পৌঁছে যাবে। নতুন বছরে আমরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রবেশ করছি। নানা সংকটের মধ্যেও আমরা চেষ্টা করছি ভালো কিছু করার। আমাদের গাড়ির সংকট রয়েছে। সেটি নিরসনের চেষ্টা চলছে। এছাড়া জনবল কম হওয়ায় ৩ হাজার ৬৬০ জনকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। প্রশিণ একাডেমি, পরীাগারসহ অনেক বিষয়ে পদপে নেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, বর্তমান ডিজি জামাল উদ্দীন আহমেদ বিগত ৩ বছর যাবৎ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি পদোন্নতি পেয়ে সচিবও (গ্রেড-১) হয়েছেন। তাঁর সময়ে নতুন আইন প্রণয়ন, লোকবল কাঠামো তৈরি, জেলায় কার্যালয় ও পদায়ন, প্রধান কার্যালয় স্থাপন, মাদক কারবারিদের তালিকা প্রণয়ন, সারাদেশে নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো, বিধিমালা প্রণয়ন, ডোপ টেস্টসহ বেশকিছু পদপে নেয়া হয়েছে। এর বেশিরভাগই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নিজস্ব অস্ত্র, লোকবল ও গাড়ি সংকটের কারণে আভিযানিক কার্যক্রম মাঝেমধ্যে বিঘœ ঘটলেও বর্তমান ডিজির হাত ধরে অধিদপ্তর ‘নিজের পায়ে দাঁড়াতে’ যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তিন.
বাংলাদেশে প্রকৃত মাদকাসক্তের সংখ্যা নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৭০ লক্ষাধিক। এর মধ্যে ৮০ ভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ৪০ লাখই তরুণ। এই বাস্তবতায় উদযাপিত হলো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদের ভাষ্যে, সর্বনাশা মাদকের নির্দিষ্ট কোনো দেশ নেই; বিশ্বজুড়েই এর ভয়াবহ আগ্রাসন। উৎকণ্ঠা-কষ্টের শেষ নেই আসক্ত পরিবারগুলোতে। সরকার, সংশ্লিষ্ট বাহিনী ও বেসরকারি সংস্থাগুলো হিমশিম খাচ্ছে মাদক সমস্যা নিরসনে। কারণ ব্যাপক বিস্তৃত এই মাদক নির্মূল খুবই জটিল একটি প্রক্রিয়া ও কঠিন চ্যালেঞ্জ। নতুন এক উদ্বেগের বিষয় হলো মাদকের অপব্যবহার ও চোরাচালানের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ ব্যবহার হচ্ছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদে। স্বাভাবিকভাবেই তা বিপন্ন করছে বিশ্বশান্তি ও সৌহার্দ্য।
সংশ্লিষ্টদের নানা সময়ের বক্তব্য এবং গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের রুট ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ (মিয়ানমার-থাইল্যান্ড-লাওস) এবং ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ (পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরান)-এর একেবারে কেন্দ্রে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে এদেশে মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটছে। তিন দিক দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মাদকের মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, খাত, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেড্রিন, বুপ্রেনরফিন (টিডি জেসিক ইঞ্জেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইচ পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন।
সবচেয়ে ভয়াবহতা ইয়াবাকে ঘিরে। কিছুদিন আগেও যত্রতত্র মিলত ইয়াবা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারি ও অভিযানের ফলে এখন তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। চিহ্নিত বড় মাদক ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ধরাও পড়েছে। ‘ক্রস ফায়ারে’ নিহত হয়েছে কয়েকজন। আবার অনেকে সরকার ও প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে সম্প্রতি আত্মসমর্পণ করেছে। ফলে সারাদেশে মাদকের প্রকোপ অনেকটা কমে এসেছে।
তবে ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশ মাদকের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত সংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে মাদকের কারখানা গড়ে উঠেছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। কঠিন এই বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশের জন্য মাদক নির্মূল আরও বেশি চ্যালেঞ্জের। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাদকদ্রব্যের পাচার রোধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটি নিজস্ব গবেষণা, নীতিমালা ও কৌশল প্রয়োগ করে মাদকের আগ্রাসন কমিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। অধিদপ্তর মনে করে, শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, মাদকের চাহিদা হ্রাসে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন জরুরি। পাশাপাশি মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা যেমন বাড়াতে হবে, সেই সঙ্গে কেউ মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে উপযুক্ত চিকিৎসাও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে হবে।

চার.
বর্তমান সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে যুগোপযাগী করে গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সর্বোচ্চ সাজার বিধান করে আইন প্রণয়নসহ প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। বৃহত্তর একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এখন আরও বেশি দক্ষ ও কার্যকর। এছাড়া মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও পরিবীক্ষণ করা হয়। মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন রোধকল্পে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে স্ট্র্যাটেজিক কমিটি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিবকে আহ্বায়ক করে এনফোর্সমেন্ট কমিটি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে আহ্বায়ক করে মাদকবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি এবং সামাজিক আন্দোলন সংক্রান্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এনফোর্সমেন্ট কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে কোর কমিটি এবং কক্সাবাজার ও টেকনাফে ইয়াবা পাচারবিরোধী টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে। বর্ণিত কমিটি সময়ে সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে থাকে।

পাঁচ.
মাদকের আগ্রাসন রোধে ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উদ্যোগে ১ থেকে ৫ বছর মেয়াদে ২২ ধরনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আয়োজনে বিভিন্ন কর্মশালায় ৪টি প্রধান কাজের জন্য বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরে। সীমান্তপথে মাদকের প্রবেশ রোধ, ব্যাপক প্রচার ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম, মাদকাসক্তদের তালিকা করা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন Ñ এ ৪টি আলাদা কাজের পরিকল্পনা নিয়ে ৪টি দলে ভাগ করে সময়ে সময়ে দেশজুড়ে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাঁদের মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আয়োজিত বিভিন্ন কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ হলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ ও জননিরাপত্তা বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, তথ্য মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, যুব ও ক্রীড়া, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং আইন ও বিচার বিভাগ। এছাড়া সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ উল্লেখযোগ্য বেসরকারি সংস্থাও সময়ে সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আয়োজিত ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করে।

ছয়.
মাদক নিয়ে জনসচেতনামূলক কার্যক্রম চলে সারা বছরই। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, আইজিপি, মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এতে সম্পৃক্ত করা হয়। প্রচারাভিযানে নানা ধরনের কর্মসূচির সঙ্গে মাদকবিরোধী উঠান বৈঠক, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, গোলটেবিল বৈঠক, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, জুমার নামাজের খুতবার আগে মাদকবিরোধী বয়ানের মতো ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত আছে।
ধারাবাহিকভাবে সেমিনার, সভা-সমাবেশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটির মাধ্যমে জনসাধারণকে সচেতন করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়, উপঅঞ্চল ও জেলা কার্যালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কারাগার ও জনসমাগম স্থলে নিয়মিত সভা-সমাবেশ করা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকবিরোধী শিক্ষামূলক গতানুগতিক প্রচারণা থেকে বেরিয়ে সৃজনশীল প্রচারণামূলক কার্যক্রমে জোর দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকাসহ সারাদেশে মাদকবিরোধী দেয়াল লিখন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, যা অব্যাহত রয়েছে। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ বাড়াতে ডিজিটাল প্রচারে গুরুত্ব দিচ্ছে অধিদপ্তর। বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরের জনবহুল স্থানে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী বিলবোর্ড ও ব্যানার স্থাপনের মাধ্যমে মাদকবিরোধী প্রচার-প্রচারণায় নতুনত্ব নিয়ে আসা হয়েছে। শুরু করা হয়েছে ডিজিটাল প্রচার-প্রচারণা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ১৬টি মাদকবিরোধী টিভিসি (বিজ্ঞাপন) তৈরি করে। টিভিসিগুলো ১০টি টিভি চ্যানেলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রচার করা হয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নির্মিত আধুনিক ও আকর্ষণীয় ফিলার বিজ্ঞাপন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে পিক আওয়ারে প্রচার করায় জনসচেতনতা বাড়ছে। তাছাড়া বিভিন্ন মিডিয়ায় মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে।
জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। কারণ নানা শ্রেণিপেশার মানুষের উপস্থিতি ঘটে এখানে। বিশেষ করে তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে জড়িত। তাই জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টির লক্ষ্যে ফেইসবুক পেজ (ডিপার্টমেন্ট অব নারকটিকস কন্ট্রোল)-এর মাধ্যমে অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের অফিসসমূহে কার্যক্রমের তথ্য ও ছবি প্রচার করা হচ্ছে। যেকোনো ব্যক্তি তার মতামত, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ অধিদপ্তরের ফেইসবুক পেজের মাধ্যমে প্রকাশ করছে, যা সহজে কর্তৃপক্ষের নজরে আসছে। এভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেটভিত্তিক কার্যক্রমের ফলে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী মাদক সচেতনতার আওতাভুক্ত হয়েছেন।
মাদক প্রতিরোধ কার্যক্রম আরো গতিশীল করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মাদককে ‘না’ বলা কর্মসূচি। মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অনুমোদিত অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সারাদেশে ১ মিনিট স্ব স্ব অবস্থান থেকে দাঁড়িয়ে মাদকের বিরুদ্ধে ‘না’ বলা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

শেষ কথা
শুধু আইনের প্রয়োগ করে কোনো একক সংস্থা বা সরকারের পক্ষে মাদকের মতো জটিল ও বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে সরকারের পাশাপাশি মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী কর্মকা-ে পরিবার এবং সমাজে কঠোর অনুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ, সমাজের সর্বস্তরের বিশেষ করে শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং গণমাধ্যমের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত মাদকমুক্ত দেশ গড়ার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হবে।