প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

সীমান্ত সুরা এবং সীমান্ত অপরাধ দমন এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ -বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
সদ্যবিদায়ী বছরের ২৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি’র মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম। পরে ওই সীমান্ত সম্মেলন উপলক্ষে ২ জানুয়ারি বিজিবি সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিক এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে বিজিবিকে আধুনিকায়নের কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, চোরাকারবারিদের নিত্যনতুন কৌশলের কারণে বিজিবিকে ঢেলে সাজানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সীমান্ত সুরা এবং সীমান্ত অপরাধ দমনই এই মুহূর্তে বিজিবি’র জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শিগগিরই দুটি হেলিকপ্টার কিনছে বিজিবি। এর একটি আগামী ১৭ জানুয়ারি দেশে আসবে। এছাড়া মিয়ানমার সীমান্ত এবং সেন্টমার্টিনের নিরাপত্তায় রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিজিবি ডিজি জানান, ভারতে চলমান এনআরসি (জাতীয় নাগরিকপঞ্জি) ও সিএএর (সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট) নিয়ে বিজিবি উদ্বিগ্ন নয়। এ ব্যাপারে এখনই সুস্পষ্ট করে কিছুই বলার নেই। তবে অবৈধভাবে কাউকে ভারতে বা ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। এ ব্যাপারে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। বিদায়ী বছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে প্রায় ১ হাজার জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের অবৈধ অনুপ্রবেশের সঙ্গে জড়িত ৩ জন দালালকেও আটক করা হয়েছে। তারা সবাই বাংলাদেশি বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এ সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে ২৫৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বিজিবি ডিজি আরো জানান, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সম্মেলনে ভারতের এনআরসি ও সিএএ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কারণ, ভারতের এনআরসি ও সিএএ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা নিয়ে বিজিবি’র উদ্বেগের কিছু নেই। নিয়ম মোতাবেক সীমান্তে কড়া পাহারা দেয়া হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধ করতে দেয়া হবে না।
মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, যারা অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হয়েছে, তারা ভারতে চলমান এনআরসি বা সিএএর কারণে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে কি না তা স্পষ্ট নয়। দায়েরকৃত মামলায় আটককৃতদের বিরুদ্ধে শুধু তাদের অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ আনা হয়েছে। আটককৃত প্রত্যেকের বাড়ির ঠিকানা যোগাড় করা হয়েছে। সেসব ঠিকানায় সরেজমিনে গিয়ে তদন্তও করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, তারা সবাই বাংলাদেশি। তবে তাদের কাছে বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো নাগরিকত্বের কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। পরিবার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ অন্যান্য মাধ্যমে বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে। আটককৃতদের মধ্যে নারী, শিশু, পুরুষ ও ৩ জন দালাল আছে। এর মধ্যে শুধু বিদায়ী বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরেই অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হয়েছে ৪৪৫ জন। এদের প্রায় সবাই কাজের সন্ধান ছাড়াও বিভিন্ন কারণে ভারতে গিয়েছিলেন।
ভারতে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে সংকট তৈরির পর গত ২ মাসে দেশটি থেকে বাংলাদেশে মোট ৪৪৫ জন অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে জানিয়ে মেজর জেনারেল সাফিনুল বলেন, গত ১ বছরে এ সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। তবে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, তারা সবাই বাংলাদেশি। যেসব বাংলাদেশি ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে, তারা বিভিন্ন সময়ে দালালের মাধ্যমে কাজের সন্ধানে ভারতে পাড়ি দিয়েছে।
বিজিবিপ্রধান জানান, সাতক্ষীরা এবং ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়েই বেশিরভাগ অবৈধ প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। অবৈধ প্রবেশের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে ২৫৩টি মামলা হয়েছে।
সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের হিসাবে বিদায়ী সালে সীমান্তে মোট ৩৫ জন মারা গেছেন। ভারতের হিসাবে তা আরও কম। এ বিষয়ে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে আমরা আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, সীমান্ত হত্যা বন্ধে দুই দেশ এক হয়ে কাজ করবে।
এ সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিজিবি ডিজি বলেন, আত্মরার প্রয়োজন ছাড়া বিজিবি কখনো গুলি ছোড়ে না।
বিজিবিপ্রধান বলেন, ভারতের কোনো সীমান্তে আমরা কাঁটাতারের বেড়া দিইনি। তবে মিয়ানমারের সঙ্গে ৬৭০ কিলোমিটার বর্ডারে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ২৭৭ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি গত সীমান্ত সম্মেলনে ভারতকে জানানো হয়েছে। এ কাজ বাস্তবায়নে বিএসএফের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
দেশের পশ্চিমাংশের সীমান্ত খুবই জটিল উল্লেখ করে মেজর জেনারেল সাফিনুল বলেন, কারও রান্নাঘর বাংলাদেশে, আবার থাকার ঘর ভারতে। ভারতের সীমান্ত এলাকার নাগরিকদের অনেকের আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বাংলাদেশে। আবার বাংলাদেশের অনেকের নিকটাত্মীয়ের বাড়ি ভারতে। এসব মানুষ জরুরি প্রয়োজনে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশ নিতে চায়। তাই ভিসার পরিবর্তে তাদের জন্য অল্প সময়ের তাৎণিক পাস দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আছে।