প্রতিবেদন

আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলো ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
তুরাগ নদের তীরে লাখো মানুষের জমায়েত। কখনো ঘন কুয়াশা, কখনো ঠা-া বাতাস, কখনো ঝিরঝির বৃষ্টি, কনকনে শীত। এর মাঝেই ৯ জানুয়ারি বাদ মাগরিব থেকে একটানা চলতে থাকে বয়ান, জিকির-আসকার, ইবাদত-বন্দেগি, ঘুম, খাওয়া-দাওয়া। এভাবে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের ৩ দিন পার করেছেন মুসল্লিরা। ১২ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। মোনাজাত পরিচালনা করেন রাজধানীর কাকরাইল মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের আহমদ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে মোনাজাতে অংশ নেন।
বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে ১৭ জানুয়ারি থেকে। ১৯ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা। দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় যোগ দেবেন মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীরা।
ইজতেমার প্রথম পর্বে মূল প্যান্ডেলে ৮৭টি খিত্তায় দেশের ৬৪টি জেলার মুসল্লিরা অংশ নেন। ৪৪টি দেশের কয়েক হাজার বিদেশি মেহমানও ইজতেমায় অংশ নেন।
আখেরি মোনাজাতে রাজধানী ঢাকা ও এর চারপাশের জেলাগুলোর মানুষ অংশ নেন। অনেকে মন্তব্য করেন, গতবার ইজতেমায় দু-পক্ষের মধ্যে ঝামেলার কারণে যেসব মুসল্লি আসেননি, তারা এবার এসেছেন। ফলে আখেরি মোনাজাতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
ইজতেমা মাঠে গত কয়েকবারের চেয়ে এবার ভিড় চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সেভাবে হইচই, হুড়োহুড়ি বা কোলাহল নেই। সবাই নিজের মতো করে এক ধরনের শৃঙ্খলা মেনে ইজতেমা সম্পন্ন করেছেন। সবার মাঝেই ছিল সহযোগিতার মনোভাব। মাঠজুড়ে বিশাল শামিয়ানার নিচে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে অবস্থান করেছেন অংশগ্রহণকারীরা।
আখেরি মোনাজাতের আগে ১০ জানুয়ারি শুক্রবার ইজতেমা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় বৃহত্তম জুমার জামাত। জুমার নামাজে ইমামতি করেন হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের আহমদ। দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এতে শরিক হন। জুমার নামাজে অংশ নিতে সকাল থেকেই টঙ্গী, ঢাকা, উত্তরা, আশুলিয়া, সাভার ও এর আশপাশের এলাকার মানুষ ইজতেমা ময়দানে আসতে শুরু করেন। দুপুর ১২টার আগেই ইজতেমা মাঠ ছাপিয়ে আশপাশের খোলা জায়গা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। একপর্যায়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও আশুলিয়া সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মাঠে স্থান না পেয়ে মুসল্লিরা মহাসড়ক ও অলিগলিতে হোগলার পাটি, চটের বস্তা, খবরের কাগজ বিছিয়ে জুমার নামাজে শরিক হন। মুসল্লিদের নামাজের সারি ইজতেমা ময়দান থেকে উত্তরা ও টঙ্গী মিলগেট পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।
একই অবস্থা সৃষ্টি হয় আখেরি মোনাজাতেও। টঙ্গীর আবাসিক ভবনগুলোর ছাদে হাজার হাজার মহিলাকেও আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে দেখা যায়। পুরো টঙ্গী শিল্প এলাকাই যেন হয়ে ওঠে ইজতেমার ময়দান। ১২ জানুয়ারি ভোর থেকেই ঢাকা-ময়মনসিংহ ও আশুলিয়া সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন থেকে ইজতেমা উপলক্ষে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বিমানবন্দর সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ায় লাখ লাখ মুসল্লি ট্রেনে চেপে ইজতেমা ময়দানে পৌঁছান। ট্রেনে ছিল ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড়।
৯ জানুয়ারি বাদ মাগরিব তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বি ভারতের হজরত মাওলানা ইব্রাহিম দেওলার আমবয়ানের মধ্য দিয়ে ইজতেমার প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে বাংলাদেশ ও ভারতের তাবলিগ মারকাজের শূরা সদস্য ও বুজুর্গরা ঈমান, আমল ও দাওয়াতের মেহনত সম্পর্কে ফজিলতপূর্ণ সারগর্ভ বয়ান করেন। আমবয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা খোরশিদ আলম ও শায়খ ইহসানুল হক, তিউনিসিয়ার মাওলানা শেখ ইউনুস আলী, দিল্লির হজরত মাওলানা আহমদ লাট। মূল বয়ান উর্দুতে হলেও বাংলা, ইংরেজি, আরবি, তামিল, মালয়, তুর্কি, ফরাসিসহ বিভিন্ন ভাষায় তাৎণিক অনুবাদ করা হয়।
এবারের ইজতেমায় আম ও খাসবয়ান, তালিম, তাশকিল, ৬ উসুলের হকিকত, দরসে কোরআন, দরসে হাদিস, চিল্লায় নাম লেখানোসহ নতুন জামায়াত তৈরি হয়। তবে এ বছর যৌতুকবিহীন বিয়ে হয়নি।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও রাস্তায় পার্কিং করা গাড়িসমূহ অপসারণ, ধূলাবালি নিয়ন্ত্রণের জন্য সার্বণিক পানি ছিটানোর ব্যবস্থা, রাস্তার দুই পাশে দেয়ালের অশ্লীল পোস্টার অপসারণ ও সিনেমা হলসমূহ সম্পূর্ণ বন্ধের ব্যবস্থা করা হয়। বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য কন্ট্রোল রুমের সামনে ৫৪টি চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।
ইজতেমা ময়দানের সার্বিক নিরাপত্তা ও মুসল্লিদের খেদমতে গাজীপুর সিটি করপোরেশন, র‌্যাব, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, আনসার ও গ্রাম প্রতিরা বাহিনী, ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্রের (ডেসকো) প থেকে আলাদা আলাদা কন্ট্রোল রুম খোলা হয়।
ইজতেমায় আগত দেশি-বিদেশি মুসল্লিদের স্বাগত জানিয়ে তোরণ নির্মাণ করা হয়। নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা এবং র‌্যাব ও পুলিশের ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়। ইজতেমার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১২ হাজার সদস্য, যারা ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বেও দায়িত্ব পালন করবেন।
ইজতেমা কর্তৃপরে চাহিদা মোতাবেক এবার ৭০ ড্রাম ব্লিচিং পাউডার সরবরাহসহ ইজতেমা চলাকালে গার্বেজ ট্রাকের মাধ্যমে দিনরাত বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম নিশ্চিত করা হয়। কন্ট্রোল রুমসহ অন্যান্য স্থানে অস্থায়ী খুঁটি স্থাপনের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা করা হয়। তুরাগ নদের ওপর একাধিক ভাসমান সেতু তৈরি করে দিয়ে মুসল্লিদের দোয়া লাভ করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সেনাবাহিনী মুসল্লিদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানিরও ব্যবস্থা করে।