প্রতিবেদন

চোরাচালান প্রতিরোধে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে শেষ হলো বিজিবি-এমপিএফ সীমান্ত সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিবেদক
সীমান্তে যৌথ টহলে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। মিয়ানমার থেকে আসা মারণনেশা ইয়াবার চালান প্রতিরোধে আরও কঠোর অবস্থানে থাকবে দু’দেশ। এছাড়া সীমান্তে যেকোনো ধরনের চোরাচালান, মানব পাচার, অনুপ্রবেশ এবং সন্ত্রাসী কর্মকা- বন্ধ করতে দু’দেশ যৌথভাবে কাজ করবে। কোনো দেশেরই মাটি ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকা- করতে দেয়া হবে না। এ বিষয়ে উভয় দেশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।
গত ৮ জানুয়ারি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও মিয়ানমার পুলিশ ফোর্সের (এমপিএফ) সিনিয়র পর্যায়ে ৫ দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন শেষে এ কথা বলা হয়।
সম্মেলনে ১৪ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ছিলেন।
অপরদিকে মিয়ানমারের সফররত ৮ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মিয়ানমারের চিফ অব পুলিশ জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মায়ো থান।
বিজিবি মহাপরিচালক জানান, ৯টি বিষয়ে একমত হয়েছে দু’প। বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে মাদক চোরাচালান রোধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, অস্ত্র চোরাচালান, মানব পাচার, পণ্য চোরাচালান ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এক দেশ অপর দেশকে সহযোগিতা, সীমান্তের উভয় পাশে ১৫০ ফুটের মধ্যে যেকোনো ধরনের সীমানা লঙ্ঘন না করা এবং গুলি চালানোর ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে একে অপরকে জানানো।
এছাড়া সীমান্তে যৌথ টহলে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। বিজিবি ও এমপিএফের মধ্যে সাংস্কৃতিক দল বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য উভয়প সম্মত হয়েছে।
বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ইয়াবা চোরাচালান আগের চেয়ে কমেছে। ইয়াবাসহ যেকোনো চোরাচালান ও অপরাধমূলক কাজ বন্ধে উভয় দেশই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে। ইয়াবা প্রতিরোধে এমপিএফের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারাও ইয়াবাসহ চোরাকারবারি গ্রেপ্তার করছে। এ মারণনেশা যাতে পুরোপুরি রোধ করা যায়- সেই বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা বলেছে, ইয়াবাসহ চোরাচালান রোধে আরও কঠোর হবে। চোরাচালান তারাও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়।
বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অদূরে অবস্থিত মিয়ানমার-চীন সীমান্তে চীন ও কোচিন রাজ্যে ইয়াবা তৈরির কারখানাগুলো অবস্থিত। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য হয়ে ইয়াবা বাংলাদেশে আনা হয়।
২০১৭ সালে মাদকসেবীদের ওপর পরিচালিত সরকারি জরিপ অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত মাদকদ্রব্যের শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ ইয়াবা। আর মাদকসেবীদের শতকরা ৭৫ ভাগ যুবক। মাত্র ৭ ভাগের বেশি মাদকসেবীর বয়স ৪০ বছরের ওপরে। একই জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করে।
ইয়াবার উৎপাদন ও চোরাচালান বন্ধে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বেশ কয়েকবার আলোচনা হয়েছে। বেশ কয়েকটি বিজিবি-এমপিএফ সীমান্ত সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব বৈঠক ও সম্মেলনে মিয়ানমারের প থেকে মাদক চোরাচালান বন্ধ করার আশ্বাস দেয়া হলেও ইয়াবা চোরাচালান বন্ধ হয়নি।
বর্তমান সরকার ২০১৮ সালের মে মাস থেকে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে, যা এখনো চলমান। এসময় মাদক চোরাচালানের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৪০০-এর বেশি চোরাচালানি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। আবার কিছু কিছু েেত্র মাদক চোরাকারবারীরা নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।
বাংলাদেশে ইয়াবা এখন প্রধান মাদকদ্রব্য। এর উৎপাদন হয় মিয়ানমারে এবং এর পাচারের প্রধান রুট ছিল কক্সবাজার জেলার টেকনাফ। বিজিবি ও র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযানের মুখে পাচারকারীরা সাম্প্রতিক সময়ে টেকনাফ রুট পরিবর্তন করে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবার চালান পাঠাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তরী বাহিনী একসাথে কাজ করলে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকদ্রব্য প্রবেশ বন্ধ হবে। দেশ তিনটি খোলা মনে আন্তরিকতার সাথে একসাথে কাজ করলে ইয়াবা সমস্যার সমাধান হবে। এ বিষয়ে বিজিবির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কারণ বিজিবি সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে। তাদের তৎপরতায় ইতোমধ্যে মাদক চোরাচালান অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষ করে বিজিবি সদস্যরা আরো সক্রিয় হলে কোনো মাদকই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবে না। তাই মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বিজিবিকে আরো যুগপোযোগী ও আধুনিক করে গড়ে তোলার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।