কলাম

ধর্ষণ প্রবণতা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা জরুরি

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিার্থী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত মজনু নামে এক সিরিয়াল র‌্যাপিস্টকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
অল্প কিছুদিন ধরে দেশে ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে; বাড়ছে ধর্ষণের পর হত্যা করার মতো নৃশংস কা-ও। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৮ বছরে ৮ হাজারের বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অপরাধবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে এবং সাক্ষীর অভাবে অধিকাংশ ধর্ষক পার পেয়ে যায়। ফলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকে। এর পাশাপাশি নৈতিকতা, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবয় এবং মানুষের হীন মনমানসিকতা ধর্ষণ ও ধর্ষণপরবর্তী হত্যার জন্য দায়ী।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সমাজ বা রাষ্ট্রে ধর্ষণের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, বাস্তবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ, অনেক েেত্রই সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে কাউকে বিষয়টি জানানো হয় না; আইনের আশ্রয় নেয়া হয় না। এতে ধর্ষণের অনেক ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।
আইনে আছে, ১৮০ দিনের মধ্যে ধর্ষণের বিচার হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে বিচার হতে ৮ থেকে ১০ বছর লেগে যায়। বিচারের এ দীর্ঘসূত্রতার কারণে মূলত ধর্ষকরা আরো একটি ধর্ষণকার্যে উদ্বুদ্ধ হয়।
ধর্ষণের এই মচ্ছব প্রতিরোধে তাই বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টদের কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশে ধর্ষণের ঘটনা বারবার ঘটছে। বেশিরভাগ ঘটনায় কিছুদিন আমরা সবাই নড়াচড়া করি, লাফঝাঁপ করি, প্রতিবাদ করি, বিােভ করি; গণমাধ্যমও সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। এরপর ধীরে ধীরে এসব বিষয় হারিয়ে যায়, অন্য বিষয় সামনে আসে।
যারা ধর্ষণের মতো কা- ঘটাতে পারে, তাদের বিবেকবোধ, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা মোটেও নেই। আমরা তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের সুফল যেমন পাচ্ছি, পাশাপাশি পাচ্ছি কিছু কুফলও। এখন অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েরা মোবাইল ফোনে এক কিকেই যেকোনো অশ্লীল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারে, যা তাদের মস্তিষ্কে ছাপ ফেলছে; ভোগবাদী সত্তাকে জাগিয়ে তুলছে এবং তাদের নৈতিক সত্তাকে অবদমন করছে। এ কারণেও মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অবয় ঘটছে। এছাড়া নৈতিকতা শিার অভাবও এসব অপকর্ম বৃদ্ধির একটি কারণ। তাছাড়া যৌনবিষয়ক শিা নিয়ে আমাদের দেশে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। অথচ এগুলো আধুনিক সমাজের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণার পাশাপাশি সচেতনতামূলক শিক্ষা, নীতিনৈতিকতা ও উন্নত মানসিকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাধ্যতামূলক পাঠ্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, ধর্ষণ প্রতিরোধে যেমন আইনের দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করতে হবে তেমনি মানসিকতা পরিবর্তন এবং ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে যথাযথ শিক্ষা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি ধর্ষকদের পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। তাহলেই সমাজে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য কর্মকা- কমে আসতে পারে।