প্রতিবেদন

যে কারণে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

নিজস্ব প্রতিবেদক
পলাতক থাকায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক) ৪ কোটি টাকা ঋণজালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। ৫ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ কে এম ইমরুল কায়েশ এ পরোয়ানা জারি করে আগামী ১২ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।
দুদকের প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বলেছেন, আসামিরা পলাতক থাকায় আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছে।
উল্লেখ্য, নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্যে ২ বছর আগে সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহা বিদেশে পাড়ি জমানোর পর দুদক অভিযোগ পায়, তিনি ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ব্যবসায়ী পরিচয়ে ২ ব্যক্তির নেয়া ঋণের ৪ কোটি টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়েছেন। অভিযোগ পেয়ে ওই বছরই তদন্তে নামে দুদক। দীর্ঘ তদন্তের পর গত বছরের ১০ জুলাই সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।
তবে মামলার এজহারভুক্ত মূল আসামি সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা গত ২ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অবস্থান করছেন। আসামিদের মধ্যে কেবল বাবুল চিশতী অন্য মামলায় কারাগারে আছেন। এই মামলায় এখনও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি বলে আদালত তার বিরুদ্ধেও পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছে। রীতি অনুযায়ী তা এখন হাজতি পরোয়ানা হিসেবে গণ্য হবে।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ‘২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আসামি শাহজাহান ও নিরঞ্জন সাহা ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দু’টি অ্যাকাউন্ট খোলেন। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য পরদিন তারা ওই ব্যাংক থেকে ২ কোটি করে মোট ৪ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন। তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ঋণের আবেদনে উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ৫১ নম্বর বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়, যার মালিক ছিলেন তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। ঋণের জামানত হিসেবে আসামি রণজিৎ চন্দ্রের স্ত্রী সান্ত্রী রায়ের নামে সাভারের ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করা হয় ঋণের আবেদনে। ওই দম্পতি এস কে সিনহার পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদক বলছে, ব্যাংকটির তৎকালীন এমডি এ কে এম শামীম কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই, ব্যাংকের নিয়মনীতি না মেনে, মতার অপব্যবহার করে ঋণ দুটি অনুমোদন করেন।
দুদক কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ গত ৯ ডিসেম্বর ১১ জনকে আসামি করে ঋণ জালিয়াতির এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে এস কে সিনহার ব্যাংক হিসাবের ৪ কোটি টাকা জব্দ করা হয়। ১০ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক বেনজীর আহমেদ আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
চার্জশিটে বলা হয়, ফারমার্স ব্যাংকে শাহজাহান ও নিরঞ্জন সাহার নামে মঞ্জুরকৃত ঋণের ৪ কোটি টাকা সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সুপ্রিম কোর্ট সোনালী ব্যাংক শাখার হিসাবে জমা হয় (সঞ্চয়ী হিসাব নং: ৪৪৩৫৪৩৪০০৪৪৭৫)। জমা হওয়ার পর ওই টাকা বিভিন্নভাবে স্থানান্তর করে উত্তোলন করা হয়। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অসৎ উদ্দেশ্যে মতার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে নিজেরা লাভবান ও অন্যদের লাভবান করতে এ ধরনের অপরাধ করেন। অবৈধভাবে ভুয়া ঋণ সৃষ্টির মাধ্যমে তারা ৪ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে নগদে উত্তোলন ও বিভিন্ন পে-অর্ডারের মাধ্যমে নিজ আত্মীয়ের নামীয় হিসাবে হস্তান্তরের মাধ্যমে আত্মসাত করেন। পরে ওই অর্থ নিজেদের ভোগদখলে রেখে তার অবৈধ প্রকৃতি, উৎস অবস্থান গোপন বা এর ছদ্মাবরণে পাচার করেছেন মর্মে তদন্তে প্রমাণিত হয়, যা দ-বিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা ও ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪ (২) (৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এস কে সিনহা ছাড়াও পরোয়ানা জারি হওয়া অপর আসামিরা হলেন ফারমার্স ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক ও অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক চিশতী (বাবুল চিশতী), ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীম, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক ক্রেডিট প্রধান গাজী সালাহউদ্দিন, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন রায়, শাফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান, একই এলাকার নিরঞ্জন সাহা, সান্ত্রী রায় ওরফে সিমি ও তার স্বামী রণজিৎ সাহা।
আসামিদের মধ্যে বাবুল চিশতী ছাড়া অপর ১০ জনই এজাহারের আসামি ছিলেন। তবে ব্যাংকটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মো. জিয়াউদ্দিন আহমেদ এজাহারনামীয় আসামি ছিলেন। তিনি মামলা তদন্তাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় তাকে মামলার দায় হতে অব্যাহতি দেয় আদালত।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও কিছু পর্যবেণের কারণে মতাসীনদের তোপের মুখে ২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে ছুটিতে যান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। পরে বিদেশ থেকেই তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। বিচারপতি সিনহা ছুটি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থপাচার, আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনসহ সুনির্দিষ্ট ১১ অভিযোগ পাওয়ার কথা সুপ্রিম কোর্টের প থেকে জানানো হয়েছিল।
এস কে সিনহা বর্তমানে কানাডায় আছেন। তবে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে আসা বিচারপতি সিনহা গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসেই একটি বই প্রকাশ করেন। তাতে তিনি দাবি করেন, তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে।