প্রতিবেদন

২২ জানুয়ারি থেকে ই-পাসপোর্ট যুগে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে ই-পাসপোর্ট (ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট) যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহিদুজ্জামান স্বদেশ খবর প্রতিবেদককে বলেন, এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট বিভাগ ইতোমধ্যে সকল প্রস্তুতি ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছে।
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট বিভাগের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘আমরা আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে ই-পাসপোর্ট বিতরণ উদ্বোধন করতে কাজ করছি। আগামী ২২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন।’
মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা পাসপোর্ট অফিস থেকে ই-পাসপোর্ট বিতরণ করা হবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সর্বত্রই ই-পাসপোর্ট প্রদান করা হবে। বিখ্যাত জার্মান কোম্পানি ভেরিডোস জিএমবিএইচ দেশে ই-পাসপোর্ট ও ই-গেট নিয়ে কাজ করছে। ই-পাসপোর্টের সূচনা দিয়ে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া তৈরি করার প্রক্রিয়া চলছে।
ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান খান এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। ই-পাসপোর্ট ব্যবহারের জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বয়ংক্রিয় গেটও এরই মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব বন্দরে এই গেট চালু করা হবে। এ সময়ে ই-পাসপোর্টের পাশাপাশি মেশিন রিডেবল পাসপোর্টও চালু থাকবে।
সাধারণ পাসপোর্ট থেকে ই-পাসপোর্টের পার্থক্য হলো এতে মোবাইল ফোনের সিমের মতো ছোট ও পাতলা আকারের ইলেকট্রনিক মাইক্রোপ্রসেসর চিপ যুক্ত থাকবে। এই চিপ পাসপোর্টের একটি বিশেষ পাতার ভেতরে থাকবে। এই পাতা সাধারণ পাতার চেয়ে মোটা হবে। চিপে সংরতি বায়োমেট্রিক তথ্য বিশ্লেষণ করে পাসপোর্ট বহনকারীর পরিচয় শনাক্ত করা যাবে। এতে একজনের নাম-পরিচয় দিয়ে অন্য নামে পাসপোর্ট কেউ করতে পারবে না। এই পাসপোর্ট নকল হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে না। সাধারণ পাসপোর্টের তুলনায় ই-পাসপোর্টে নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যও থাকছে বেশি। এতে ৩৮ ধরনের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকবে, যার অনেকগুলো থাকবে লুকানো অবস্থায়। ই-পাসপোর্ট করার সময় মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের ডেটাবেইসে পাওয়া তথ্যগুলো ই-পাসপোর্টে স্থানান্তর করা হবে।
সাধারণ পাসপোর্টের মতো ই-পাসপোর্টের আবেদনও অনলাইনে পাওয়া যাবে। চাইলে পিডিএফ ফরম ডাইনলোড করে হাতেও পূরণ করা যাবে। ফরম পূরণের সময় ছবি ও সত্যায়ন করা লাগবে না। তবে বয়স্কদের েেত্র জাতীয় পরিচয়পত্র ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের েেত্র জন্মনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবেদনপত্র গ্রহণের সময় আবেদনকারীর ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশের ছবি নেয়া হবে। সেই সব তথ্য চিপে যুক্ত হবে। ইমিগ্রেশন পুলিশ বিশেষ যন্ত্রের সামনে পাসপোর্টের পাতাটি ধরলেই পাসপোর্টবহনকারীর সব তথ্য বেরিয়ে আসবে।
সূত্র জানায়, ই-পাসপোর্ট হবে ২ ধরনের। একটি ৪৮ পাতার, অন্যটি ৬৪ পাতার। সাধারণ, জরুরি ও অতি জরুরির জন্য ফি হবে ৩ ধরনের। এবার ২ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট দেয়ার নিয়ম চালু হচ্ছে। এ জন্য ফিও বেশি গুনতে হবে।
৪৮ পৃষ্ঠার ৫ বছর মেয়াদি সাধারণ (১৫ দিন), জরুরি (৭ দিন) ও অতি জরুরি (২ দিন) পাসপোর্টের মূল্য ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৩,৫০০ টাকা, ৫,৫০০ টাকা এবং ৭,৫০০ টাকা। ৪৮ পৃষ্ঠার ১০ বছর মেয়াদি সাধারণ (১৫ দিন), জরুরি (৭ দিন) ও অতি জরুরি (২ দিন) পাসপোর্টের মূল্য ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৫,০০০ টাকা, ৭,০০০ টাকা এবং ৯,০০০ টাকা।
৬৪ পৃষ্ঠার ৫ বছর মেয়াদি সাধারণ (১৫ দিন), জরুরি (৭ দিন) ও অতি জরুরি (২ দিন) পাসপোর্টের মূল্য ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৫,৫০০ টাকা, ৭,৫০০ টাকা এবং ১০,৫০০ টাকা। ৬৪ পৃষ্ঠার ১০ বছর মেয়াদি সাধারণ (১৫ দিন), জরুরি (৭ দিন) ও অতি জরুরি (২ দিন) পাসপোর্টের মূল্য ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৭,০০০ টাকা, ৯,০০০ টাকা এবং ১২,০০০ টাকা।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকে দেশে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট বিতরণ শুরু হয়। ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ই-পাসপোর্ট প্রদানের ঘোষণা দেন। এ জন্য জার্মানির প্রতিষ্ঠান ভেরিডসের সঙ্গে চুক্তি করে বহির্গমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। চুক্তি অনুসারে ৩ কোটি ই-পাসপোর্ট সরবরাহ করবে প্রতিষ্ঠানটি, যার মধ্যে ২০ লাখ জার্মানি থেকে তৈরি হয়ে আসবে, আর বাকি ২ কোটি ৮০ লাখ পাসপোর্ট বই মুদ্রণের জন্য কাঁচামাল সরবরাহ করবে। এই বই ছাপার যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজও ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইসিএও) মতে, বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ বর্তমানে ই-পাসপোর্ট ব্যবহার করছে। পাসপোর্ট বুকলেটে একটি ইলেকট্রনিক চিপ ব্যবহারের মাধ্যমে চিরাচরিত নন-ইলেকট্রনিক পাসপোর্টের চেয়ে ইলেকট্র্রনিক পাসপোর্ট অধিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এতে পাসপোর্টের দুটি পেজে দৃশ্যমান বায়োগ্রাফিক্যাল তথ্যভা-ার ও একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা ফিচার থাকে। ডিজিটাল ফিচার হচ্ছে কোনো দেশের সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল স্বার। এই ডিজিটাল স্বারগুলো প্রতিটি দেশে একক এবং স্ব স্ব সার্টিফিকেটের মাধ্যমে যাচাই করা যাবে।
জানা গেছে, ‘বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট চালু এবং অটোমেটিক বর্ডার কন্ট্রোল ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্পটি সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে। ১০ বছরে মোট ৩০ মিলিয়ন পাসপোর্ট সরবরাহ করা হবে। এই ই-পাসপোর্ট ইস্যু করার মাধ্যমে ইমিগ্রেশন আনুষ্ঠানিকতার সমস্ত প্রক্রিয়াই অনলাইনে সম্পন্ন হবে। ই-পাসপোর্টের মেয়াদ হবে ৫ থেকে ১০ বছর।