কলাম

আজ গতকাল নয়, আগামী দিনও আজকের মতো হবে না

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান
বাংলাদেশকে বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল বা ‘মিরাকল’ বলেন অনেকেই। আমি হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এলহানান হেল্পম্যানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, এটা কোনো মিরাকল নয়।
এলহানান হেল্পম্যান ২০০৪ সালে প্রকাশিত তার ‘দ্য মিস্ট্রি অব ইকোনমিক গ্রোথ’ বইয়ে বলেছেন ‘জ্ঞানের অগ্রগতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন হয়। শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রসারের মাধ্যমেই উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং এর বাইরে আর কোনো রহস্য নেই।’
বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে শিক্ষার মান উন্নয়নের চেষ্টা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, কলা, সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায়সহ বহু বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করে থাকে কিন্তু আমাদের স্নাতকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব শেষে যা নিয়ে বের হয় তা হলো উন্নত সংস্কৃতি, যা দিয়ে সে নিজকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ায়। তাদের অনুশীলনকৃত বিশ্লেষণক্ষমতা, যোগাযোগযোগ্যতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের আগ্রহ, তথ্য গ্রহণ, ধারণ ও উপস্থাপন ক্ষমতা তাকে চৌকস মানুষে পরিণত করে। আমাদের অনেক স্নাতক হয়ত সময়মতো যোগ্য চাকরি পায় না। এর দায় পুরোটা শিক্ষার মানকে দেয়া উচিত নয়। কারণ কর্মসংস্থান আর্থসামাজিক অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
এ অঞ্চলের মানসম্মত শিক্ষা অর্জনকারী ও মেধাবীদের বেকার থাকার গল্পও নতুন নয়। ইতিহাসবিদ ড. তপন রায় চৌধুরী তার ‘বাঙালনামা’য় লিখেছেন, ‘বিশ এবং তিরিশের দশকে বেকার সমস্যা কি ভয়াবহ ছিল তা আমাদের স্মৃতি থেকে প্রায় মুছে গেছে। বিএ এবং এমএ তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও অর্থনীতিবিদ ড. ভবতোষ দত্ত প্রায় ৭-৮ বছর বেকার ছিলেন। নীরদ চৌধুরী মশায়ের জীবনের বেশ ক’বছর কেটেছে দৈনিক ১ টাকা রোজগারে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে কেবল কর্মসংস্থানের দিকে ধাবিত করলে জ্ঞান অন্বেষণের কী হবে? দর্শন, সাহিত্য, মৌলিক জ্ঞানভিত্তিক বিভাগসমূহ কি বন্ধ করে দিতে হবে?
যা কিছু মানুষের কাজে লাগে তা-ই পণ্য। শিক্ষা একটি পণ্য, এটা নিয়ে বাণিজ্য হয়, উন্নত দেশেও হয়। আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এই বাণিজ্যের তীর্থভূমি। আমাদের দেশেও এই বাণিজ্য শুরু হয়েছে, তবে মান বজায় না রেখেই এটা চলছে। উন্নত বিশ্বে শিক্ষার মানের প্রতি জোর দেয়া হয়।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের চ্যান্সেলর শিক্ষার মান ও বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে সম্প্রতি যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সে ব্যাপারে আমরা সচেতন। মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে ইতোমধ্যেই আমরা ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছি। সন্ধ্যাকালীন প্রোগ্রামগুলো সংকুচিত এবং চলমান কোর্সগুলো সমাপ্তির পর সেগুলো বন্ধ করে দেয়ার জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।
সমাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা, তবে এটা শিক্ষার সমাপনী অনুষ্ঠান নয়। যদিও আমরা কো-কারিকুলাম ও এক্সট্রা-কারিকুলামের প্রতি যথেষ্ট জোর দিচ্ছি, তবু পাঠ্যবই পঠন এবং নিয়মিত ভালো ফলাফল করার দিকেই বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর ঝোঁক থাকে। রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনে পঠিত ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর পুস্তক সাধারণকে পাঠ্যপুস্তক ও অপাঠ্যপুস্তক, প্রধানত এই দুই ভাগে বিভক্ত করা যাইতে পারে। টেক্সট বুক কমিটি হইতে যে সকল গ্রন্থ নির্ধারিত হয় তাহাকে শেষোক্ত শ্রেণিতে গণ্য করিলে অন্যায় বিচার করা হইবে না।’
আমাদের গড় আয়ু বেড়ে যাচ্ছে। এখন ৭৩ বছর, আগামী ২৫ বছরের মধ্যে তা ৮০ বছর হবে বলে ধারণা করি। আমাদের স্নাতকদের বর্তমান বয়স গড়ে ২৫ বছরের কম, সে হিসাবে অন্তত আরো ৫৫ বছর তারা বেঁচে থাকবে। প্রশ্ন হচ্ছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ বছরে আমরা যা পড়িয়েছি তা দিয়ে আমাদের স্নাতকরা এই দীর্ঘ সময় পাড়ি দিতে পারবে কি? উত্তর হচ্ছে, ‘না’।
পরিবর্তন খুব দ্রুত হচ্ছে। আজ গতকালের মতো না, আগামী দিনও আজকের মতো হবে না। দ্রুত বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। মানুষের জায়গায় কাজ শুরু করে দিয়েছে তাদের হাতেই তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘রোবট’। বদলে যাচ্ছে কর্মসংস্থানের ল্যান্ডস্ক্যাপ। কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে আজকের গ্র্যাজুয়েটদের। শতবর্ষ আগে ফরাসি বিপ্লব প্রসঙ্গে ঈযধৎষবং উরপশবহং তার অ ঞধষব ড়ভ ঞড়ি ঈরঃরবং উপন্যাসে লিখেছেন, ‘ওঃ ধিং ঃযব নবংঃ ড়ভ ঃরসবং, রঃ ধিং ঃযব ড়িৎংঃ ড়ভ ঃরসবং.’
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সর্বশেষ ডিজিটাল ও জেনেটিক প্রযুক্তি মানবসভ্যতার জন্য নিয়ে এসেছে অনেক আশীর্বাদ। শত অর্জনের পাশাপাশি মানবজাতির সামনে সমস্যারও অন্ত নেই। আজকের কৌশল হতে হবে নতুন। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নতুন সহস্রাব্দের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের। নতুন চ্যালেঞ্জগুলোকে সংকট হিসেবে বিবেচনা করলেও ক্ষতি নেই, প্রত্যেক সংকটের পেছনেই একটি সুযোগ লুকিয়ে থাকে, সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের সমস্যাগুলো সমাধানের পথ আমাদেরই বের করতে হবে। বিদেশিরা তাদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আমাদের সাহায্য করবে না।
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার আর্চ বিশপ ডেসমন্ড টুটুর কথা স্মরণ করতে বলছি স্নাতকদের। টুটু বলেছিলেন, ‘ইউরোপীয়রা যখন আমাদের দেশে এসেছিলেন তখন তাদের ছিল বাইবেল আর আমাদের ছিল জমি। তারা আমাদের চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের ধ্যান করতে বললেন। আমরা তা-ই করলাম। চোখ খুলে দেখি আমাদের হাতে বাইবেল, আর জমি চলে গেছে তাদের দখলে।’
গতানুগতিক চিন্তাচেতনা ছেড়ে সৃজনশীল হতে হবে তরুণদের। গতানুগতিকতা থেকে বের হয়ে যাত্রা শুরু করতে হবে অবিশ্বাস দিয়ে। ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তে ১৬৩৭ সালে প্রকাশিত তার উরংপড়ঁৎংব ড়হ গবঃযড়ফ বইয়ে লিখেছেন, ‘আমাদের চারপাশে বিপুলসংখ্যক ভ্রান্ত ধারণা স্বীকৃতি লাভ করে আছে, এই কথা মনে রেখেই সত্যে উপনীত হওয়ার জন্য একেবারে গোড়া থেকেই অনুসন্ধান শুরু করতে হবে।’
যা কিছু শিক্ষকরা শিখিয়েছেন বা পাঠ্যবইয়ে যা লেখা আছে এগুলো কোনোটাই চিরসত্য নয়, আপাত সত্য। আসল সত্য অজানা বলেই এগুলো সত্য। হেরাক্লিটাসের ভাষায় ‘চিরস্থায়ী বলতে কিছু নেই, সবকিছুতেই পরিবর্তন ঘটে।’ মানুষ সেদিনও জানত না আপেল পাকলে ওপরের দিকে না গিয়ে নিচের দিকে পড়ে কেন? এর জন্য মানুষকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৬৬৫ সালে কেমব্রিজের বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আবিষ্কার পর্যন্ত। যদিও পৃথিবী নামক গ্রহটির অন্যতম প্রোপার্টি ছিল তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। অনেকেই বিশ্বাসকে বেশি প্রাধান্য দিলেও, রেনে দেকার্তের মতে, ‘বিশ্বাস নয়, সন্দেহ দিয়ে শুরু করতে হবে’Ñ অর্থাৎ আমাদেরকে সন্দেহ দিয়ে শুরু করেই বিশ্বাসে উপনীত হতে হবে।
বার্মিজ স্বাধীনতার নেতা অং সান বলেছিলেন, ‘তুমি রাজনীতি নিয়ে না ভাবতে পারো, রাজনীতি তোমাকে নিয়ে ভাবে।’ দার্শনিক রুশো বলেছেন, ‘মানুষ একান্তভাবে তার পরিবেশের সৃষ্টি…পরিবেশের সঙ্গে তার চরিত্রেরও পরিবর্তন হয়।’
শিক্ষার মান বজায় রাখতে হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাগ্রতার পাশাপাশি পরিবেশ, বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকাটা জরুরি। এক্ষেত্রে ক্যাম্পাসের পরিবেশ সব সময় সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক রাখতে আমরা সচেষ্ট। আমাদের শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট, কর্মসংস্থানের দিক দিয়ে তারা কী ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে, যোগ্যতায় ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে কি না Ñ এসবই পর্যালোচনা করা দরকার। অবকাঠামো উন্নয়নের নামে দালানকোঠা বানিয়ে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার স্বপ্ন না দেখে বরং দেশময় কিংবা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে লেখাপড়ার উচ্চ মান; শিক্ষকদের গবেষণা ও প্রকাশনার অভিনবত্ব। গবেষণা ও প্রকাশনা দিয়ে অন্যদের বোঝাতে হবে আমাদের সমুন্নতি। আমি মনে করি, উচ্চ মানসম্মত লেখাপড়া, পরীক্ষা ও ফলাফল নিয়মিতকরণ এবং শিক্ষকদের জ্ঞান-অন্বেষী মনোভাব, আপাতত এটুকু হলেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় গৌরবের একটি অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হবে।
লেখক: উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়