প্রতিবেদন

কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
কারিগরি শিক্ষায় তত্ত্বীয় পড়াশুনার চেয়ে বাস্তব প্রয়োগকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, যাতে একজন কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে ভালো কাজের সুযোগ খুঁজে নিতে পারেন। বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় কারিগরি শিক্ষাকে চাকরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। একজন চাইলে খুব সহজেই কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের পূর্বের কাজ থেকে বেরিয়ে নতুন কাজ করতে এবং নিজের ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
প্রতিযোগিতার বাজারে কারিগরি শিক্ষা যোগ্য প্রতিযোগী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে Ñ এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সমমানের শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি এই পদ্ধতি কার্যকর ও যুগোপযোগী। উন্নত দেশগুলোতে আমরা কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রমের যে প্রসারিত চিত্র দেখতে পাই, তার অনেকটাই দেখা যায় না বাংলাদেশে।
বাংলাদেশে কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষার যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলামসমূহ নিম্নরূপ:
এসএসসি (ভোকেশনাল) ২ বছর মেয়াদি, ডিপ্লোমা ইন কমার্স (২ বছর মেয়াদি), এইচএসসি (বিজনেস ম্যানেজম্যান্ট) ২ বছর মেয়াদি, ডিপ্লোমা ইন ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট (৪ বছর মেয়াদি), ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (৪ বছর মেয়াদি), ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচার (৪ বছর মেয়াদি), ডিপ্লোমা ইন ফিশারিজ (৪ বছর মেয়াদি), ডিপ্লোমা ইন হেলথ টেকনোলজি অ্যান্ড সার্ভিসেস (৪ বছর মেয়াদি), ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং (৪ বছর মেয়াদি), ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি, ডিপ্লোমা ইন লাইভস্টক, ডিপ্লোমা ইন টেকনিক্যাল এডুকেশন, ডিপ্লোমা ইন জুট টেকনোলোজি এবং ডিপ্লোমা ইন জুট সার্ভেয়িং।
বর্তমানে দেশে ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট রয়েছে। এর মধ্যে পুরনো ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ২০টি, যেগুলো পুরোপুরি সরকারি। নতুন রাজস্বভুক্ত ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ৫টি, মনোটেকনিক ইনস্টিটিউট ৩টি, প্রকল্পভুক্ত ১৮টি ও মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটউটের সংখ্যা ৩টি। বেসরকারি পলিটেকনিকের সংখ্যা ৩৮৭টি। চলতি বছরের মধ্যে দেশের মোট শিক্ষার্থীর ২০ ভাগ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় উপনীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের নানাবিধ উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার ফলে ইতোমধ্যে এই হার প্রায় ১৭ ভাগে উন্নীত হয়েছে।

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব
দেশের চাহিদা মেটানো ও বিদেশে জনশক্তি রপ্তানিতে ব্যাপক কারিগরি শিক্ষা প্রয়োজন। কেননা আমাদের জনশক্তি বিশাল। এখানে বাইরের বাজার না ধরতে পারলে আমাদের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
জনশক্তি রপ্তানিতে আমরা এখনো অদক্ষ ক্যাটাগরিতেই রয়ে গেছি। আমাদের ঝুঁকির জায়গা গার্মেন্টস শিল্প। ভারত ও ভিয়েতনাম গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানিতে এখনো আমাদের পেছনে রয়েছে; কিন্তু ভারত সরকার তার দেশের উদ্যোক্তাদের এবং এ শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের এক বিশাল প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছে। এতে তারা আমাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার চিন্তা করছে।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ভারত ও ভিয়েতনাম কল্যাণ তহবিল গঠন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে। এ শিল্পে নিয়োজিত উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে।
কোনো কারণে গার্মেন্টস শিল্পে ধস নামলে বিকল্প কী? জনশক্তি রপ্তানিতে আমাদের অবস্থা এখন ভালো নয়। মালয়েশিয়া লোক নেয়ার কথা বলে বারবার পিছপা হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতিকে নিজেদের মতো করে শক্তিশালী করার প্রত্যয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিকল্প নেই। আর দক্ষ জনশক্তি গঠনে নেই কারিগরি শিক্ষার বিকল্প।
দক্ষ প্রশিক্ষক, মানসম্মত কারিগরি শিক্ষার অভাব, শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা, কাঁচামাল সংকট ইত্যাদি কারণে পিছিয়ে পড়ছেন কারিগরি শিক্ষার্থীরা। কারিগরি বোর্ড সূত্র জানায়, কারিগরি শিক্ষায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার তৈরির লক্ষ্যে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হন। ৪ বছরের কোর্স শেষে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের ভালো চাকরির জন্য অর্জন করতে হয় বিএসসি ডিগ্রি। কিন্তু এ ডিগ্রি দেয়ার মতো রয়েছে মাত্র একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এটি গাজীপুরে অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)। প্রতি শিক্ষাবর্ষে মাত্র ৫২০ জন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারকে উচ্চশিক্ষার জন্য এখানে ভর্তি করা হয়। একজন ভর্তিচ্ছু পরপর ৩ বার ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারেন। এক্ষেত্রে ভর্তিচ্ছুদের অনেক বেশি প্রার্থীর সঙ্গে ভর্তিযুদ্ধ করতে হয়।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগে এসব ভর্তিচ্ছু বিএসসি করতে ভর্তির আবেদন করতে পারলেও তাদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। ভর্তির প্রশ্নাবলিও দেয়া হয় কলেজের সিলেবাস থেকেই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যয়ন করা এখন অনেক ব্যয়বহুল।
দেশে সাধারণ শিক্ষাকে যেভাবে গুরুত্বের সাথে দেখা হয়, কারিগরি শিক্ষাকে সেভাবে দেখা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়। কেননা আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষা মূলত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক। মধ্যবিত্তদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় আসার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অনেক অভিভাবক এটিকে অসম্মানের চোখেই দেখেন। এসএসসি পাসের পর তাই অধিকাংশ শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষার দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
সরকারের সঠিক নীতির অভাবে ৪ শতাধিক বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অনুমোদিত আসনের প্রায় ৫০ শতাংশ আসন শূন্য থেকে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সরকার যদি কারিগরি শিক্ষায় ৫০% ভর্তি বাধ্যতামূলক করে তবে আশার আলো দেখা সম্ভব।
দেশে সাধারণ শিক্ষার জন্য শিক্ষাবোর্ড ৮টি হলেও কারিগরি শিক্ষার জন্য শিক্ষাবোর্ড রয়েছে মাত্র ১টি। অথচ কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও যুগোপযোগিতার কথা বিবেচনা করে এই শিক্ষাবোর্ডের সংখ্যা হওয়া উচিত সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের চেয়ে বেশি।
কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর অনেক আসন রয়ে যাচ্ছে শূন্য। অথচ বিশাল জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। আবার প্রতি বছর পাল্লা দিয়ে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার জন্য কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। কিন্তু এর জন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।