রাজনীতি

কোন পথে খালেদা জিয়ার মুক্তি?

নিজস্ব প্রতিবেদক
খালেদা জিয়ার মুক্তির তিনটি পথ খোলা ছিল। একটি হলো আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে, অর্থাৎ আদালতের জামিনের মাধ্যমে মুক্তি। দ্বিতীয় পথ ছিল আন্দোলন করে, একটা গণজাগরণের মাধ্যমে মুক্তি। আর তৃতীয় পথ হলো প্যারোলের মাধ্যমে মুক্তি।
খালেদার মুক্তির এই তিনটি পথের মধ্যে একটি পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। আইনি লড়াইয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই। কারণ, দেশের সর্বোচ্চ আদালত বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন নাকচ করে দিয়েছে। এখন তাঁর মুক্তির দুটি পথ খোলা রয়েছে।
খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গত প্রায় ২ বছর ধরে বিএনপি কার্যকর কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। বিএনপি এখন একটা ছিন্নভিন্ন ও পথভ্রান্ত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। আন্দোলন করার মতো শক্তি, সাহস ও শক্তিশালী নেতৃত্ব Ñ কোনোটিই তাদের নেই। কাজেই আন্দোলনের মাধ্যমে চটজলদি খালেদার মুক্তি হবে Ñ এমন ধারণারও কোনো কারণ নেই।
এর পর খালেদা জিয়ার মুক্তির একটাই পথ খোলা থাকে। সেটি হলো, সরকারের সঙ্গে সমঝোতা এবং রাজনৈতিক দর কষাকষির মাধ্যমে প্যারোল পাওয়া।
প্যারোল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির কেউ কেউ সমঝোতার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বিএনপির একাংশের বাধার কারণেই মূলত প্যারোলের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি এখনও সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির এখন একমাত্র একটি পথই খোলা আছে; আর তা হলো সরকারের সাথে সমঝোতা বা সোজা কথায় সরকারের উদার মনোভাব তথা শীর্ষ পর্যায়ের আনুকূল্য লাভ করার মাধ্যমে। প্রশ্ন হলো, সরকার ও খালেদা জিয়া এ বিষয়ে একমত কি না। সোজা কথায় বিএনপি চেয়ারপারসন এ সুবিধা সরকারের কাছে চান কি না; আবার সরকারের শীর্ষ মহল এ সুবিধা খালেদা জিয়াকে দিতে রাজি কি না।
এমতাবস্থায়, কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাজা স্থগিতের আবেদন করলে সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। ১৪ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সাধারণত সাজা সাসপেন্ড (স্থগিত) করা হয় অনেক দিন সাজা খাটার পরে। অনেক দিন সাজা খাটার পরে সরকার বিশেষ বিবেচনায় এটা (সাজা স্থগিত) করে, করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, জেলখানায় যারা থাকেন এবং বহুদিন কারাভোগ করেন, ৪০১ (১) ধারা (ফৌজদারি কার্যবিধি) অনুযায়ী তাদের নানাবিধ বিবেচনায় অনেক সময় সাজা স্থগিত করা হয়। কিন্তু তারা (বিএনপি ও খালেদা জিয়া) যদি প্রমাণ করতে পারেন, তবে সে ব্যাপারে সরকার দেখবে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কথার সূত্র ধরে বলা যায়, এক্ষেত্রেও সরকার খালেদা জিয়ার কোর্টেই বল ঠেলে দিয়েছে। অর্থাৎ বিএনপি চেয়ারম্যান যদি সাজা স্থগিতের আবেদন করেন তাহলে সরকার তা বিবেচনা করবে। প্রশ্ন হলো খালেদা জিয়া কি এমন আবেদন করবেন; যেখানে তিনি প্যারোলে মুক্তি চাওয়ার বিষয়েই অনাগ্রহী।
তবে বিএনপি নেতারা মনে করছেন, খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিয়ে সরকার এক ধরনের সংকটে আছে। এই সংকট ক্রমান্বয়ে ঘনীভূত হবে। কারণ সরকার যতই দেরি করবে বিএনপির আন্দোলনের ক্ষেত্র ততই বিস্তৃত হবে।
সাদামাটা কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিঠি চালাচালি, আইনি লড়াই Ñ এভাবেই খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুতে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে আসছে বিএনপি। গত ১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন বিএনপির ৭ জন সংসদ সদস্য। এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে ‘নো কম্প্রোমাইজ’ বলে দিয়েছেন। এ নিয়ে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দুটোই দেখা গেছে।
জানা গেছে, বিএনপির ৭ এমপির সাক্ষাতের পর গত ২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের দলীয় একটি ফোরামে খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে এক নেতা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি এটাকে নো কম্প্রোমাইজ বলে একদম উড়িয়ে দেন।
এদিকে খালেদা জিয়া নিজে প্যারোলে মুক্তি না নেয়ার সিদ্ধান্তে অটল আছেন। এ অবস্থায় বিএনপি আন্দোলনের মাধ্যমেই খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। এ জন্য দলটি ডিসিসি নির্বাচনের পরপরই আন্দোলন সফল করার মতো সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তুলে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা স্বদেশ খবরকে বলেছেন, দলীয় ৭ এমপি হাসপাতালে খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে সমঝোতার যে আলোচনা উঠেছিল, তা ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে জানিয়েই দলীয় এমপিরা বেগম জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও তার মুক্তির বিষয়টি নতুনভাবে দলীয় এমপিদের মাধ্যমে ফোকাস করতেই এই সাক্ষাতের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বিএনপি চাচ্ছে, নতুন করে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের আগে দলীয় যেসব পথ খোলা আছে, সেগুলোকে কাজে লাগাতে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন মহলে বিএনপির যারা বন্ধু কিংবা শুভাকাক্সক্ষী রয়েছে, তাদের কাছে খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যুটি তুলে ধরা হচ্ছে। একই সাথে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই কিছু কর্মসূচিও নেয়া হবে, যাতে করে সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। বিএনপি এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে। নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন এবং সরকার পতন আন্দোলনের ডাক দেবে বলে দলটির একাধিক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের এক নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, খালেদা জিয়াকে আওয়ামী লীগ এমনি এমনিতেই মুক্তি দিয়ে দেবে, তা কোনো অবস্থাতেই ভাবছে না বিএনপি। প্যারোল না নিয়ে জামিন পেয়ে খালেদা জিয়া মুক্ত হলে তার আপসহীনতার কাছে ক্ষমতাসীনেরা হেরে যাবে। এ জন্য আন্দোলন ছাড়া দলীয় প্রধানের মুক্তির আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। তাই আন্দোলনের মাঠ প্রস্তুতের জন্য সংশ্লিষ্ট নেতাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিএনপির মেয়র প্রার্থীদেরও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন নির্বাচনি প্রচারকালে খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তির বিষয়টিও তুলে ধরছেন। আর প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে কোনো নেতা যাতে কোনো ধরনের কথা প্রকাশ্যে না বলেন, সেই নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। কারণ, দলীয় এমপিদের বিএনপি চেয়ারপারসন পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজনে হাসপতালে মৃত্যুবরণ করবেন তবুও তিনি প্যারোলে মুক্ত হবেন না। যদিও কারাবন্দি খালেদা জিয়ার দিন কাটছে অসুস্থতায়।
গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে তিনি বিএসএমএমইউতে ভর্তি আছেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাজা হয় তার। বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা চলছে। বন্দিদশায় নতুন-পুরনো নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন খালেদা জিয়া। ইতোমধ্যে তার স্বজন এবং দলের শীর্ষ কয়েক নেতা তার সাথে একাধিকবার দেখা করেছেন। চিকিৎসাসেবা ও সুস্থতা নিয়ে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও চিকিৎসকেরা পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করেছেন। বিএনপি বলছে, তিনি গুরুতর অসুস্থ। চিকিৎসকদের দাবি, তার অবস্থার উন্নতি ঘটছে। সরকারপক্ষ বলছে, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বিএনপি ‘রাজনীতি’ করছে। তবে পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থতার চিত্রই তুলে ধরেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে বিরোধী দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা খুবই সাধারণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রেই আদালত এ ধরনের মামলা খারিজ করে দেয়। বিএনপি নেতাদের বক্তব্য, তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে হওয়া এসব মামলা ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’, যার উদ্দেশ্য তাকে হয়রানি করা এবং তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে ধ্বংস করা। তবে আওয়ামী লীগ নেতারা এই বক্তব্য বরাবরই অস্বীকার করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আইনি শাস্তি এড়াতে রাজনৈতিক দরকষাকষি একেবারেই নতুন কিছু নয়। অতীতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সাবেক সামরিক একনায়ক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ৯ বছরের শাসনের অবসান হওয়ামাত্রই তার বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা করা হয়েছে। তবে সাবেক এই স্বৈরশাসক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে ব্যবহার করে ঠিকই সাজা এড়াতে পেরেছেন।
খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কয়েক মাস আগে। তাকে গ্রেপ্তারের ফলে দলে নেতৃত্বশূন্যতা দেখা দেয়। তার ছেলে তারেক রহমান, যাকে দলের ভবিষ্যৎ নেতা ভাবা হচ্ছে, তাকেও যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন। এই দুই প্রধান নেতাকে ছাড়া নির্বাচনে গিয়ে পার্লামেন্টের ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৭টি আসনে জয়লাভে সক্ষম হয় বিএনপি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি যদিও অনেক সঙ্কটে, তারপরও দল হিসেবে সামনের দিনগুলোতে টিকে থাকতে পারবে। কারণ, গত ১২ বছর বা ১ যুগ ধরে দলটি ক্ষমতার বাইরে থাকলেও সরকার শত চেষ্টা করেও বিএনপিকে ভাগ করতে পারেনি। এটা সম্ভব হয়েছে জেলে থাকার পরও খালেদা জিয়ার দৃঢ়চেতা নেতৃত্বের কারণে। তারা আরো বলছেন, বিএনপি হয়ত কঠিন সময় পার করছে। তবে এখনও দলটি নিজ সমর্থক গোষ্ঠীকে জাগিয়ে তোলার সুযোগ পেতে পারে। কেননা এখন পর্যন্ত অন্য কোনো দলই প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির অবস্থান কেড়ে নিতে পারেনি।