প্রতিবেদন

ক্রসফায়ার- কিছু আইনপ্রণেতার দাবি

এ কে এম শহীদুল হক
১৪ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যগণ ধর্ষণের ওপর অনির্ধারিত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে সিনিয়র সদস্যও ছিলেন। প্রত্যেকেই ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে কঠোর আইন প্রণয়নের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। তাদের অনেকেই ধর্ষককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রসফায়ারে মৃত্যু ঘটার পক্ষে জোরালো বক্তব্য প্রদান করেন। তাদের বক্তব্যে যে ইঙ্গিত আসে তা হলো, ধর্ষকদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। বিচার ছাড়াই ধর্ষকদের ক্রসফায়ারে প্রাণনাশ হওয়া উচিত।
দেশে সম্প্রতি ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুরাও ধর্ষকের বিকৃত থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ধষর্ণের পর হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে দেশবাসীর সঙ্গে আইনপ্রণেতারাও উদ্বিগ্ন। এ কারণেই তাদের এমন কঠিন উচ্চারণ।
কিন্তু জাতীয় সংসদে আইনপ্রণেতাগণ যখন বিচারবহির্ভূতভাবে অপরাধীদের ক্রসফায়ারে হত্যা করার পক্ষে মত দেন, তখন গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণের কাছে কী মেসেজ যায়? অনেক দেশে বিচারে মৃত্যুদ-ের বিধান রহিত করা হয়েছে। আমাদের দেশের মতো অনেক দেশে আবার মৃত্যুদ-ের বিধান আছে। অপরাধী যত কুখ্যাতই হোক, তাকে বিচারে সোপর্দ করতে হবে এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে Ñ এটাই গণতান্ত্রিক সমাজে বিচার প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক প্রথা। আইনপ্রণেতা, মানবাধিকার কর্মী, তথা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিকেরা সংবিধান, আইন ও বিধিবিধানের মধ্যে থেকেই তাদের মতামত ব্যক্ত করবেন Ñ এটাই বাঞ্ছনীয়। জাতীয় সংসদে সংবিধান ও আইনবহির্ভূত বক্তব্য শোভা পায় না। আবেগে সাধারণ নাগরিক যে কথা বলতে পারবে, সংসদে জনপ্রতিনিধিদের কণ্ঠে সে কথা মানানসই হয় না। আবেগ থাকবে কিন্তু আইনের কাঠামোর মধ্যে তা ব্যক্ত হবে। এটাই সমীচীন। এটাই বিধিসম্মত।
ইদানীং দেশে ধর্ষণের ঘটনা অনেকটা মহামারিতে রূপ নিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রতিদিনই ধর্ষণের সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। অত্যন্ত অমানবিক, পাশবিক ও লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। ঢাকার হাজারীবাগে পিতার সহায়তায় ১৩ বছরের এক কিশোরীকে ৩৫ বছরের এক ব্যক্তি কয়েক মাস যাবত ধর্ষণ করছিল। এসব সংবাদ শুনে বিবেকবান যেকোনো ব্যক্তির মধ্যেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। ধর্ষকের ফাঁসি দাবি করাটাই স্বাভাবিক। তবে সেটা আইনের মধ্যেই হওয়া উচিত। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভিকটিম সময়মতো সঠিক বিচার পাচ্ছে না। আইনের ফাঁকফোকরে আসামিও অধিকংশ ক্ষেত্রে পার পেয়ে যাচ্ছে। অবশ্যই এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। ধর্ষণ ও স্পর্শকাতর বা গুরুতর নির্যাতনের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের অতিরিক্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে তিন মাসের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করার কার্যকর বিধান করা অপরিহার্য। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে ধর্ষণ মামলার ত্র“টিহীন তদন্ত শেষ করতে হবে। এসব ব্যবস্থা নিলে এবং সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিক হলে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সফলতার সঙ্গে গণতান্ত্রিক ধারায় দেশ শাসন শুরু করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে যেটা একটি রাষ্ট্রের প্রদেশ ছিল, সেটাকে রাষ্ট্রে রূপদান করেছিলেন। শূন্য থেকে শুরু করে একটি ভঙ্গুর ও বিধ্বস্থ একটি জনপদকে পুনর্গঠন করেছিলেন। সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধু দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন; রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট পুনর্নির্মাণ; ১ কোটি শরণার্থীকে ভারত থেকে এনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা; যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা; নির্যাতিতা নারীদের পুনর্বাসন; কল-কারখানা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালু; প্রশাসনিক কাঠামো, পুলিশ ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলা; সংবিধান প্রণয়ন; ভারতীয় সেনা ফেরতসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক সংস্কার, উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কাজ বঙ্গবন্ধু অল্প সময়ের মধ্যে সম্পাদন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটা তার রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা, দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং দেশ ও জনগণের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা, দরদ ও দৃঢ় অঙ্গীকারের কারণেই সম্ভব হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু যখন দেশ গড়ার এবং জনগণের কল্যাণে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন তখন একশ্রেণির নেতাকর্মী দুর্নীতি ও নানা অপকর্মে জড়িয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তি ও মহল নানা প্রক্রিয়ায় দেশের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করছিল। কিছু কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি বিদেশি প্রভুদের কাছ থেকে আর্থিক লাভবান হয়ে বিদেশি মতবাদ আমাদের দেশে চাপিয়ে দেয়ার নামে নানা রকম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার কাজে তৎপর ছিল। জাসদের গণবাহিনী, পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টিসহ বিদেশিদের মদদ ও ষড়যন্ত্রে গড়ে ওঠা জনবিচ্ছিন্ন কতিপয় রাজনৈতিক সংগঠনের সশস্ত্র উইং তৈরি করা হয়। তারা একটি নতুন রাষ্ট্রের নবগঠিত সরকারের পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত হয়। থানা-ফাঁড়ি লুট করে। পুলিশ, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের হত্যা করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। অসাধু ব্যবসায়ী, মাস্তান ও সন্ত্রাসীরা চোরাচালান, খাদ্যশস্যের অবৈধ মজুদ, চাঁদাবাজিসহ নানাবিধ অপকর্ম চালিয়ে দেশের মধ্যে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। মাস্তান, সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্রধারী ও চোরাকারবারীদের গ্রেপ্তার করেও বেশি দিন জেলহাজতে রাখা যেত না। জামিনে বের হয়ে তারা আবার একই অপকর্মে লিপ্ত হতো।
এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৪ সালে একটি কঠোর আইন প্রণয়ন করেন। সেটা হলো ঝঢ়বপরধষ চড়বিৎ অপঃ, ১৯৭৪. এ আইনে সংঘটিত অপরাধ ংঢ়বপরধষ ঃৎরনঁহধষ এর মাধ্যমে বিচারের বিধান করা হয়। অর্থাৎ যেসব সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্রধারী বা চোরাকারবারি যাদেরকে প্রচলিত আইনে জেলহাজতে বেশি দিন আটকিয়ে রাখা যেত না, কিংবা যাদের ভয়ে কেউ মামলা করত না বা সাক্ষ্য দিত না, তাদের পুলিশ প্রতিবেদনের আলোকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাহী আদেশে নিবর্তনমূলক আটকাদেশে কয়েক মাস জেলে আটকিয়ে (চৎবাবহঃরাব উবঃবহঃরড়হ) রাখতে পারতেন। এতে প্রাথমিকভাবে সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল।
দেশের বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ ঝঢ়বপরধষ চড়বিৎ অপঃ, ১৯৭৪-কে একটি কালো আইন বলে সমালোচনা করতেন। চৎবাবহঃরাব উবঃবহঃরড়হ-কে তারা মানবাধিকার ও সংবিধানবিরোধী আইন বলতেন। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বাম ঘরানার রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ক্ষমতার বাইরে থাকলে ঝঢ়বপরধষ চড়বিৎ অপঃ-কে কালো আইন আখ্যা দিয়ে গলা ফাটিয়ে কথা বলতেন। তারা যখন ক্ষমতায় যেত তখন এ আইন বা আইনের ধারা বাতিল বা সংশোধনের কোনো উদ্যোগ না নিয়ে চুপ থাকত। এটাই বাংলাদেশে একশ্রেণির রাজনীতিবিদের স্ববিরোধী ও শঠতার রাজনীতি। এটা ছিল তাদের মিথ্যা প্রচারণা এবং আইনের অপব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে হীন রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ের অপকৌশল।
বিচার বিভাগ অর্থাৎ উচ্চ আদালতও ঝঢ়বপরধষ চড়বিৎ অপঃ-এর চৎবাবহঃরড়হ উবঃবহঃরড়হ-এর ব্যাপারে বারবার রুলিং দিয়েছেন। উবঃবহঃরড়হ আদেশের বিরুদ্ধে ডৎরঃ চবঃরঃরড়হ হলে পুলিশকে উচ্চ আদালতে হাজির হয়ে জবাবদিহি করতে হতো। তাই পুলিশও এ আইন প্রয়োগ করে ডিটেনশন দিতে অনীহা প্রকাশ করে। পুলিশ উবঃবহঃরড়হ দেয়ার প্রস্তাব প্রায় বন্ধ করেই দেয়।
ঝঢ়বপরধষ চড়বিৎ অপঃ-কে যারা কালো আইন ও সংবিধানবিরোধী বলেন তারা ঠিক বলেন না। বাংলাদেশের সংবিধান বিশ্বে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানের মতোই একটি উন্নতমানের সংবিধান। সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ঝঢ়বপরধষ চড়বিৎ অপঃ-এ নিবর্তনমূলক আটক বা চৎবাবহঃরাব উবঃবহঃরড়হ-এর বিধান রাখা হয়েছে। সংবিধানের ৩৩ (৪) নং অনুচ্ছেদে নিম্নরূপ বর্ণিত আছে-
‘নিবর্তনমূলক আটকের বিধান সংবলিত কোনো আইন কোনো ব্যক্তিকে ৬ মাসের অধিককাল আটক রাখিবার ক্ষমতা প্রদান করিবে না, যদি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক রহিয়াছেন বা ছিলেন কিংবা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্যতা রাখেন, এই রূপ দুই জন এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত
একজন প্রবীণ কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত কোনো উপদেষ্টা পর্ষদ উক্ত ছয় মাস অতিবাহিত হইবার পূর্বে তাহাকে উপস্থিত হইয়া বক্তব্য পেশ করিবার সুযোগদানের পর রিপোর্ট প্রদান না করিয়া থাকেন যে, পর্ষদের মতে উক্ত ব্যক্তিকে তদাতিরিক্ত কাল আটক রাখিবার পর্যাপ্ত কারণ রহিয়াছে।’
লেখক: সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল
বাংলাদেশ পুলিশ