রাজনীতি

জাপাতে আবারও জিএম কাদের-রওশন দ্বন্দ্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
এরশাদের জাতীয় পার্টিতে (জাপা) আবার গৃহবিবাদ দেখা দিয়েছে, প্রকট হয়ে উঠেছে জি এম কাদের-রওশন দ্বন্দ্ব।
গত ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দলের নবম জাতীয় কাউন্সিলের পর স্বাভাবিকভাবেই চলছিল দলের কার্যক্রম। ওই সম্মেলনে জি এম কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন, রওশন এরশাদকে বানানো হয় প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কাউন্সিল-পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেয়ায় ধরে নেয়া হচ্ছিল, রওশন বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু গত ১৫ জানুয়ারি হঠাৎ করেই অশান্ত হয়ে ওঠেন জি এম কাদের ও রওশন এরশাদ। কমিটির বেশকিছু শীর্ষ পদে নিয়োগ দেয়া নিয়ে প্রকাশ্যে আসে দেবর-ভাবীর পুরনো দ্বন্দ্ব।
এক দিনেই পৃথক দুই বিজ্ঞপ্তিতে দুই দফায় নিজেদের পছন্দমতো নেতা এবং স্ত্রী, বোন, ভাগ্নি ও ছেলেকে নিয়োগ দেন এরশাদের ছোট ভাই ও দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং এরশাদের স্ত্রী, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। এর মধ্যে জি এম কাদের তার স্ত্রী শেরিফা কাদের এবং বোন ও ভাগ্নিকে উপদেষ্টা করেছেন।
জাপার প্রেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সেক্রেটারি সুনীল শুভরায় স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী জাপা চেয়ারম্যান যে ২১ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন করেছেন, তাতে পরিবারের ৩ সদস্যের নাম রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমজনই জি এম কাদেরের স্ত্রী শেরিফা কাদের। এছাড়া তালিকাভুক্ত উপদেষ্টাদের মধ্যে নীলফামারীর মেরিনা রহমান তার বোন এবং একই জেলার ড. মেহেজুবুন্নেসা রহমান ভাগ্নি।
একই দিন আরেক বিজ্ঞপ্তিতে হঠাৎ করেই দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ নবম কাউন্সিলে নতুন কমিটি থেকে বাদ পড়া ছেলে সাদ এরশাদসহ ১৬ জন নেতাকে পদোন্নতি দিয়েছেন। এ নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ দলের নেতারা। দলের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য এ বিষয়ে প্রকাশ্যেই বলেন, চেয়ারম্যান প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে পারতেন। পাশাপাশি রওশন এরশাদেরও উচিত হয়নি গঠনতন্ত্র অমান্য করে এভাবে নিয়োগ দেয়া। তাদের এই দ্বন্দ্বের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। আমরা অনুরোধ করব, তারা দুজন বসে আলোচনা করে যোগ্যতা অনুযায়ী নেতাদের যেন পদ দেন। নতুবা অন্যদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেবে। দল চালানো কঠিন হবে। এভাবে একটা দল চলতে পারে না। এসব অব্যবস্থাপনার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে দলের গুরুত্ব, গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা কমে যাবে।
জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের দেয়া নিয়োগকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছে দুপক্ষই। জি এম কাদেরের কার্যালয় এক বিবৃতিতে রওশন এরশাদের দেয়া পদোন্নতিকে বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়ে তা প্রচার না করতে গণমাধ্যমকে অনুরোধ জানিয়েছে। বিবৃতিতে জি এম কাদের বলেন, এভাবে কোনো নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের নেই। পার্টির নবম জাতীয় কাউন্সিলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক জাতীয় পার্টির বিভিন্ন পদে নিয়োগ প্রদানের ক্ষমতা একমাত্র পার্টির চেয়ারম্যানের। জাতীয় পার্টির কোনো পদে কাউকে নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা চেয়ারম্যান ব্যতীত অন্য কারও নেই।
এর আগে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রওশন এরশাদ বলেন, সম্মেলনে অর্পিত দায়িত্ব ও প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সংগঠনের কার্যক্রম গতিশীল করার স্বার্থে এই পদায়ন করা হলো। এই মনোনয়ন ও সাংগঠনিক নির্দেশ অনতিবিলম্বে কার্যকর হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। এমনকি এ-সংক্রান্ত একটি চিঠির কপি জাতীয় পার্টির মহাসচিবের কাছেও পৌঁছে দেয়া হয়।
অবশ্য জি এম কাদেরের স্ত্রী, বোন ও ভাগ্নিকে দলের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি রওশন এরশাদ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য এ বিষয়ে বলেন, ভাবা হয়েছিল কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত রওশন এরশাদ মেনে নিয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করলো নেতৃত্ব নিয়ে রওশন ও কাদেরের বিরোধ মেটেনি; বিশেষ করে দলকে অস্থির রাখতে ওঁৎ পেতে থাকা তৃতীয় পক্ষ এখনো তৎপর।
দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, কাউন্সিলের মাধ্যমে রওশনপন্থি নেতারা জি এম কাদেরকে মেনে নেন এবং তার নেতৃত্বে আস্থা আনেন। ধারণা করা হচ্ছে, প্রেসিডিয়াম তালিকা থেকে বাদ পড়া নেতারা এবার রওশনের দ্বারস্থ হয়েছেন। তারাই রওশনকে এসব বুদ্ধি দিচ্ছেন। তবে এতদিন রওশনের সঙ্গে ছিলেন এমন নেতারা সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন।
জানা গেছে, রওশন এরশাদ তার ছেলে রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ ও দলের পুরনো নেতা এম এ ছাত্তারকে কো-চেয়ারম্যান করেন। এছাড়া ১০ জন প্রেসিডিয়াম, দুজন ভাইস চেয়ারম্যান ও দুজনকে যুগ্ম মহাসচিব করা হয়েছে। প্রেসিডিয়াম হলেন দেলোয়ার হোসেন খান, খালেদ আখতার, ইকবাল হোসেন (রাজু), নূরে হাসনা লিলি চৌধুরী, রওশন আরা মান্নান, ফকরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, কাজী মামুন, মাহজাবিন মুর্শেদ, নুরুল ইসলাম (নুরু), নুরুল ইসলাম (ওমর) ও আরিফুর রহমান খান। আমানত হোসেন ও মো. ইয়াহিয়াকে ভাইস চেয়ারম্যান এবং জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া ও মো. রেজাউল করিমকে যুগ্ম মহাসচিব নিযুক্ত করা হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি মারফত জি এম কাদের যে ৯ জনকে উপদেষ্টা নিয়োগ দেন, তাদের একজন তার স্ত্রী, একজন বোন ও অন্যজন ভাগ্নি। বাকি ৬ উপদেষ্টা হলেন চট্টগ্রামের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ময়মনসিংহের মো. হাবিবুল্লাহ বেলালী, ঢাকার ড. মো. নুরুল আজহার শামীম, রংপুরের মো. হাসিবুল ইসলাম জয়, চাঁদপুরের মনিরুল ইসলাম মিলন এবং সিলেটের আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী।