প্রতিবেদন

ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সজীব ওয়াজেদ জয় : রপ্তানি আয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাত অচিরেই পোশাক শিল্পকে ছাড়িয়ে যাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
শিগগিরই বাংলাদেশে রপ্তানি বাণিজ্যে তৈরি পোশাক খাতের জায়গা করে নেবে তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টর। পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল ফোন প্রযুক্তিসহ (ফাইভজি) সরকারের এ মেয়াদেই বাস্তবায়ন করা হবে। ডিজিটাল উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রতিটি সেবা ডিজিটালাইজ করা হচ্ছে। ট্যালেন্ট গ্যাপ, ডিজিটাল অর্থনীতি, ডিজিটাল গ্রোথ, স্মার্ট সিটি, এসডিজির অ্যাচিভমেন্ট এই সেক্টরের মাধ্যমেই হবে।
১৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) ৩ দিনের ডিজিটাল মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এ কথা বলেন।
উদ্বোধনী পর্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকার জন্য ১৪ ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেয়া হয়। ৩ দিনে বিভিন্ন বিষয়ে ১৩টি আলোচনা সভা হয়, যেখানে সরকারের মন্ত্রী ও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। এবার মেলার মূল প্রতিপাদ্য ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় প্রযুক্তির মহাসড়ক’ শীর্ষক মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব নূর উর রহমান, হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের (বাংলাদেশ) সিইও ঝাং ঝেংজুন উপস্থিত ছিলেন।
তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, মেলায় ডিজিটাল প্রযুক্তির মহাসড়ক বিনির্মাণে অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা এবং পরিবর্তিত বিশ্বে নতুন সভ্যতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইওটি, রোবটিক্স বিগডেটা, ব্লকচেন ও ফাইভ জি-র বিস্ময়কর প্রভাব প্রদর্শন করা হয়েছে। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, ট্রিপল প্লে (এক ক্যাবলে ফোন লাইন, ইন্টারনেট ও টেলিভিশন সংযোগ), মোবাইল অ্যাপ, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা ও নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তি যুক্ত আছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আপনারা জানেন আমি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করি। সেখানে গর্ব করে আমি বিদেশিদের বলি, এই যে আমার জাতীয় পরিচয়পত্র, যা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পরিচয়পত্রের চেয়েও উন্নত। শত ভাগ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে আমার আরও চিন্তা রয়েছে। প্রযুক্তির মহাসড়কে ফাইভ জি-র বিস্ময়কর প্রযুক্তি দ্রুত বাংলাদেশে চালু করা হবে। ১১ বছর আগে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের অভিযান শুরু করি। বাংলাদেশে প্রযুক্তির উন্নয়নে প্রতিনিয়ত আমি নতুন নতুন বিষয় নিয়ে ভাবি।
এবারের মেলায় জেডটিই, হুয়াওয়ে, নকিয়া ও এরিকসন ফাইভজি প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট টেলিমেডিসিন ও এটিএম সেবা দেখানো হয়েছে। ইন্টারনেট সেবাদাতাসহ (আইএসপি) ৮২ প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে। মোট ২৫ স্টল, ২৯ মিনি প্যাভিলিয়ন ও ২৮ প্যাভিলিয়ন ছিল। িি.িফরমরঃধষনধহমষধফবংযসবষধ.ড়ৎম.নফ ওয়েব লিঙ্কে ঢুকে রেজিস্ট্রেশন করে বিনামূল্যে মেলা দেখার সুযোগ পেয়েছেন দর্শনার্থীরা। মেলায় প্রবেশমুখেও রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা রাখা ছিল। ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলায় যাওয়া-আসার সুবিধার্থে দর্শনার্থীদের জন্য শাটল বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। ঢাকার উত্তরা, মালিবাগ, মতিঝিল, আজিমপুর ও মিরপুর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০টা ও দুপুর ১টায় বাসগুলো মেলার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। মেলা শেষে দর্শনার্থীদের নিয়ে রাত ৮টায় বাসগুলো আবার ফিরতি রুটে নির্দিষ্ট জায়গায় ফিরে যায়।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, বাঙালি জাতির ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বছর ২০২০ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলার এই আয়োজন অত্যন্ত সময়োচিত কর্মসূচি। এ কারণেই এবারের ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় প্রযুক্তির মহাসড়ক’। ডিজিটাল সংযুক্তি হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।
মেলার আয়োজক ছিল ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। এই আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করেছে দেশে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি।
এদিকে দেশের ১৪৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চ গতির ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন সংযোগ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, গত এক দশকে দেশের ১০ কোটির বেশি মানুষের হাতে ইন্টারনেট পৌঁছে দেয়া হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশের ১৬ কোটি মানুষের হাতে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেয়া হবে। ১২ জানুয়ারি সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সম্মেলন কক্ষ থেকে তিনি ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন উদ্বোধন করেন।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মো. নূর-উর-রহমানসহ মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে সবারই দাবি, বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের, সব জায়গায় ওয়াই-ফাই জোন করে দেয়ার। সেই কারণেই আমরা এই প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম। ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রা যখন আরম্ভ করি তখন অনলাইন তো দূরের কথা, ইন্টারনেট কানেকশনেরই অভাব ছিল। মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট অ্যাকসেস পেত, এখন সেটা প্রায় ৬০ শতাংশে চলে এসেছে। গত ১০ বছরে ১০ কোটির বেশি মানুষকে অনলাইনে এনেছি। আমাদের তরুণদের যে দাবি, সব জায়গায় তাদের ওয়াই-ফাই করে দেয়া, সেটা কিন্তু আমাদের আওয়ামী লীগ সরকার করে যাচ্ছে। এই প্রকল্প হলো সেটারই অংশ যে, সরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের টেলিযোগাযোগ বিভাগ ছাত্রছাত্রীদের জন্য ওয়াই-ফাই জোন করে দিচ্ছে। এই কাজ চলমান থাকবে। সারাদেশেই আমরা ইন্টারনেট আনছি, ইউনিয়ন পর্যন্ত আমরা ফাইবার নিয়ে যাচ্ছি। সারাদেশের ৫৮৭ সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলো শিগগিরই উচ্চ গতির বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধার আওতায় আনা হবে। প্রথম ধাপে ১৪৬ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংযোগ স্থাপন করা হলো।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীনস্থ বিটিসিএল ‘ইনস্টলেশন অব অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্ক অ্যাট গভর্নমেন্ট কলেজ, ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট’ শীর্ষক প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় ৫৮৭ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১৪৩, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৫, চট্টগ্রাম বিভাগে ১০৭, বরিশাল বিভাগে ৪৫, খুলনা বিভাগে ৮৩, রাজশাহী বিভাগে ৮৫, রংপুর বিভাগে ৫৬ ও সিলেট বিভাগের ৩৩ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রকল্পটি ৪৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আমিনুর রহমান জানান, প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে চলতি বছরের জুন মাস লেগে যাবে। এতে শিক্ষার্থীরা ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড (উচ্চ গতি) ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন।
এদিকে ১৬ জানুয়ারি থেকে ভোলা-র দৌলতখান উপজেলার দুর্গম চরে আধুনিক শিক্ষাসেবা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মেঘনা নদীর মধ্যবর্তী বিচ্ছিন্ন চর মদনপুরের মকবুল হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ই-এডুকেশন সেবার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। এ সময় তিনি চরের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদের প্রতি আমার দাবি তোমরা ঠিকমতো লেখাপড়া করবে। ভালো রেজাল্ট করবে। তোমরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
এসময় টেলিকনফারেন্সে ভোলা-২ (দৌলতখান ও বোরহানউদ্দিন উপজেলা) আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চরাঞ্চলের মানুষকে আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই চরে ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য পাকা সড়ক তৈরি করা হয়েছে। ভোলার মদনপুর চরের জন্য সরকার একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছে। এখন চরবাসীর নিরাপত্তার জন্য চরের চারদিকে উঁচু বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের দাবি জানাই।
এসময় মদনপুর আলোর পাঠশালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী রুম্মা এবং ছাত্র এমরান হোসেন সরাসরি টেলিকনফারেন্সে কথা বলেন।