প্রতিবেদন

দ্রুত এগোচ্ছে নির্মাণকাজ: দৃশ্যমান হচ্ছে পদ্মাসেতুর ৩ হাজার ৩০০ মিটার

নিজস্ব প্রতিবেদক
পদ্মাসেতুর ২২তম স্প্যান বসতে যাচ্ছে মাওয়া প্রান্তে। ৫ ও ৬ নম্বর খুঁটিতে এই ‘১ই’ নম্বর স্প্যান বসানোর কথা রয়েছে আগামী ২৪ থেকে ২৬ জানুয়ারির মধ্যে। এরই মধ্য দিয়ে সেতুর ৩ হাজার ৩০০ মিটার দৃশ্যমান হচ্ছে। এর আগে ২০ জানুয়ারি এই স্প্যান বসানোর কথা ছিল।
এদিকে ১৫ জানুয়ারি পদ্মাসেতুর আরও ২টি স্প্যান চীন থেকে মাওয়ায় এসে পৌঁছেছে। এই নিয়ে মাওয়ায় আসা স্প্যানের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৬। আরও ৩টি স্প্যান মাওয়ার উদ্দেশে সমুদ্রপথে রয়েছে। চীনে রয়েছে মাত্র ২টি স্প্যান। এই ২টি স্প্যানও তৈরি শেষ। এখন চলছে পেইন্টিংয়ের কাজ। শিগগিরই এই ২ স্প্যানও মাওয়া রওনা হবে।
এরপর ২৩তম স্প্যান ‘৬এ’ বসছে জাজিরা প্রান্তের ৩১ ও ৩২ নম্বর খুঁটিতে। ৩০ জানুয়ারি এটি বসানোর কর্মসূচি থাকলেও কয়েক দিন বিলম্বও হতে পারে। স্প্যানটি বসলে দৃশ্যমান হবে সেতুর ৩ হাজার ৪৫০ মিটার।
পদ্মা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, গত ১৪ জানুয়ারি মূল সেতুর ২১তম স্প্যান জাজিরা প্রান্তের ৩২ এবং ৩৩ নম্বর পিয়ারের (খুঁটি) ওপর স্থাপন হওয়ায় সেতুর ৩ হাজার ১৫০ মিটার ট্রাস স্থাপিত হলো। এতে মূল সেতুর ৬ হাজার ১৫০ মিটারের অর্ধেকের বেশি ট্রাস বসানো শেষ হলো। সেতুর মোট ৪২ পিয়ারের মধ্যে ৩৬ পিয়ারের কাজ শেষ হয়েছে এবং অবশিষ্ট ৬টি পিয়ারের কাজ চলমান রয়েছে। এই ৬ পিয়ারের কাজ আগামী এপ্রিলের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা যায়। আগামী জুলাইয়ের মধ্যে সব (৪১টি) স্প্যান বসানোর টার্গেট রয়েছে।
উল্লেখ্য, মূল সেতু ৬.১৫ কিলোমিটার হলেও দুই প্রান্তে সংযোগ (ভায়াডাক্ট) সেতু রয়েছে আরও প্রায় ৩ কিলোমিটার। এই সংযোগ সেতুর মাওয়া প্রান্তে রয়েছে ৪৪ খুঁটি এবং জাজিরা প্রান্তে ৪৬ খুঁটি। দু’পাড়ের ৯০ খুঁটিই সম্পন্ন হয়ে গেছে। ১০৯টি সুপার টি উঠে গেছে। দু’পাড় মিলে আরও ৩০০ সুপার টি বাকি রয়েছে। এখন হরদম চলছে এগুলোও বসানোর কাজ।
স্থায়ীভাবে সেতুতে ২১টি স্প্যান বসেছে। তবে অস্থায়ীভাবে আরও ১টি অর্থাৎ সেতুতে এখন ২২টি স্প্যান দৃশ্যমান। ‘৫এফ’ নম্বরের স্প্যানটি এখন অস্থায়ীভাবে সেতুর ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটিতে রাখা আছে। এটি সরিয়ে নেয়া হবে ৩০ ও ৩১ নম্বর খুঁটিতে। রেলওয়ে এবং রোডওয়ে স্লাব বসানোর সুবিধার্থে এটি যথাস্থানে বসানো হয়নি। তবে শিগগিরই এটিও ৩০ ও ৩১ নম্বর খুঁটিতে বসানো হবে।
মাঘের হাড়কাঁপানো শীত ও কুয়াশাচ্ছন্ন পদ্মায় দিনরাত চলছে পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে এ সেতুর কাঠামো। বসানো স্প্যানের নিচের তলায় রেলওয়ে স্লাব এবং ওপরের তলায় রোডওয়ে স্লাব বসানোর কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ২ হাজার ৯১৭ রোডওয়ে স্লাবের মধ্যে এ পর্যন্ত ২ হাজার ১০০টির বেশি তৈরি করা হয়েছে। আর ২ হাজার ৯৫৯ রেলওয়ে স্লাবের মধ্যে সব তৈরি হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২ রোডওয়ে স্লাব এবং ৫১৯ রেলওয়ে স্লাব বসানো হয়েছে।
গত ১৪ জানুয়ারি সেতুর অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা সম্পন্ন হয়েছে। সভায় সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে সেতুর কাজের নানা বিষয় এবং মান সঠিক রেখে কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করার তাগিদ দেয়া হয়েছে।
মূল সেতুর মোট ৪২ পিয়ারের (খুঁটি) মধ্যে ৩৬ পিয়ারের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে মাত্র ৬টি পিয়ার। ৮, ১০, ১১, ২৬, ২৭ এবং ২৯ নম্বর পিয়ার এখন পদ্মার তলদেশ থেকে ওপরের দিকে উঠছে বা উঠে গেছে। ৮, ১০, ১১ এবং ২৯ এই ৪টি পিয়ারের কাজ ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শেষ হবে। অবশিষ্ট ২৬ এবং ২৭ নম্বর পিয়ারের কাজ এপ্রিলের মধ্যে শেষ হবে। এদিকে শুষ্ক মৌসুমের কারণে নদীশাসনের কাজও গতি পেয়েছে।
দ্বিতল সেতুটি কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। এই সেতুর দু’প্রান্তে আরও প্রায় ৩ কিলোমিটার সংযোগ সেতু রয়েছে। তাই সেতুটি দীর্ঘ প্রায় ৯ কিলোমিটার। সেই সংযোগ সেতুর কাজের অগ্রগতিও সন্তোষজনক।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় ও সাহসী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে শুরুর দিকে এ নিয়ে মানুষের মাঝে ব্যাপক দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও ধীরে ধীরে সন্দেহের সেই কালো মেঘ কেটে যায়। পদ্মাসেতু এখন বাস্তবতা। পদ্মাসেতুর ৮৫ শতাংশের মূল কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
পদ্মাসেতু প্রকল্পে চুক্তিবদ্ধ কোম্পানি হচ্ছে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড। পদ্মাসেতুর দুই পাড়ে সেতু সংলগ্ন সংযুক্ত সড়ক নির্মাণ, নদীশাসন ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজে সেতু কর্তৃপক্ষকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পদ্মাসেতু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে গতিতে কাজ এগিয়ে চলছে, তা অব্যাহত থাকলে এবং প্রমত্তা পদ্মার গতিবিধি সহনীয় মাত্রায় থাকলে ২০২০ সালের শেষ দিকে মুজিববর্ষের মধ্যেই স্বপ্নের পদ্মাসেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া সম্ভব হবে।