প্রতিবেদন

বহুল আলোচিত ডিআইজি মিজান ও বাছিরের বিরুদ্ধে চার্জশিট

নিজস্ব প্রতিবেদক
পুলিশের সাময়িক বরখাস্তকৃত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের কাছ থেকে বাজারের ব্যাগে করে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক (সাময়িক বরখাস্ত) খন্দকার এনামুল বাছির। এর মধ্যে গত বছরের ১৫ জানুয়ারি নেন ২৫ লাখ টাকা ও ২৫ ফেব্রুয়ারি নেন ১৫ লাখ টাকা, যা অর্থপাচার আইন ও দুদক আইনে অপরাধ।
ডিআইজি মিজান ও বাছিরের বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলার অভিযোগপত্রে এসব কথা বলা হয়েছে।
মামলাটির তদন্ত করেন দুদক পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা। ১২ জানুয়ারি দুদকের সভায় এ অভিযোগপত্র অনুমোদন দেয়া হয়, যা ১৯ জানুয়ারি আদালতে দাখিল করা হয়।
উল্লেখ্য, বহুল আলোচিত মিজান ও বাছির দুজনই দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মিজানুর রহমান গত বছরের ১৫ জানুয়ারি বাজারের একটি ব্যাগে করে কিছু বইসহ ২৫ লাখ টাকা বাছিরকে দেয়ার জন্য এনেছেন মর্মে রমনা পার্কে পরস্পর আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে তারা রমনা পার্ক থেকে বেরিয়ে শাহজাহানপুরে বাছিরের কাছে টাকাসহ ব্যাগটি হস্তান্তর করেন। বাছির ব্যাগটি নিয়ে বাসার দিকে চলে যান। একইভাবে মিজান ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি শপিং ব্যাগে ১৫ লাখ টাকা এনেছেন মর্মে রমনা পার্কে একত্রিত হয়ে আলোচনা করেন। তারা একত্রে পার্ক থেকে বেরিয়ে শান্তিনগর এলাকায় বাছিরের কাছে ১৫ লাখ টাকাসহ ব্যাগটি হস্তান্তর করেন। বাছির ব্যাগটি নিয়ে চলে যান।
মিজানের দেহরক্ষী হৃদয় হাসান ও আর্দালি সাদ্দাম জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তারা মিজানকে টাকার ব্যাগ বাছিরের কাছে হস্তান্তর করতে দেখেছেন এবং পরস্পরের কথাবার্তা শুনেছেন।
বিভিন্ন তারিখে তাদের কথোপকথন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাছির তার ছেলেকে কাকরাইলস্থ উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে আনা-নেয়ার জন্য মিজানের কাছে একটি গাড়ি দাবি করেন। বিষয়টি বাছির স্বীকার করে বিভাগীয় তদন্ত কমিটির কাছে বক্তব্য দেন। মিজান অবৈধ পন্থায় অর্জিত ৪০ লাখ টাকা অসৎ উদ্দেশ্যে বাছিরকে ঘুষ হিসেবে দিয়েছেন। বাছির সেটা গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে অবৈধ পন্থায় পাওয়া ৪০ লাখ টাকার অবস্থান গোপন করেছেন, যা দ-বিধির সংশ্লিষ্ট ধারা ও অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনেও অপরাধ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘মিজান ও বাছির উভয়ে বেআইনিভাবে দুটি পৃথক সিম ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে টেলিকমিউনিকেশনসহ এসএমএস গ্রহণ ও প্রেরণ করেছেন মর্মে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে বাছিরের সঙ্গে ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত কথোপকথন সংরক্ষণ করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তদন্তকালে বিশেষজ্ঞ মতামত, প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্য, অডিও রেকর্ডে উভয়ের কথোপকথন ও পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করে প্রমাণিত হয় যে, অভিযোগের দায় থেকে বাঁচার জন্য মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে উৎকোচ বা ঘুষ দিয়ে বাছিরকে প্রভাবিত করেছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর ডিআইজি মিজানের অবৈধ সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয় দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে। অনুসন্ধান চলা অবস্থায় গত ৯ জুন ডিআইজি মিজান ওই অনুসন্ধান থেকে বাঁচতে এনামুল বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে। এর পরপরই দুদকের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি করা হয়। অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর গত ১৩ জুন পরিচালক ফানাফিল্যাহর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে দুদক। গত ১৭ জুলাই ডিআইজি মিজান ও খন্দকার এনামুল বাছিরকে আসামি করে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। গত ২২ জুলাই বাছিরকে গ্রেপ্তার করে দুদক। তার আগে ১ জুলাই হাইকোর্টে আগাম জামিন আবেদন করেন মিজান। হাইকোর্ট আবেদন নাকচ করে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ২৫ জুলাই ডিআইজি মিজানকে সাময়িক বরখাস্তের প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রায় একই সময়ে বাছিরকেও সাময়িক বরখাস্ত করে দুদক।
এর আগে গত ৫ জানুয়ারি ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেয়া ও নেয়ার মামলায় পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমান ও দুদকের পরিচালক (সাময়িক বরখাস্ত) খন্দকার এনামুল বাছিরের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত। একইসঙ্গে ডিআইজি মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অপর একটি মামলায়ও তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ কে এম ইমরুল কায়েস এ আদেশ দেন।
গত বছরের ২২ জুলাই রাতে রাজধানীর মিরপুরের দারুস সালাম এলাকা থেকে এনামুল বাছিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।
অন্যদিকে আত্মগোপনে থাকা ডিআইজি মিজান ঘুষ প্রদানের মামলায় গত বছরের ১ জুলাই হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করলে তা নাকচ করে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় আদালত। এর পরের দিন তাকে নিম্ন আদালতে হাজির করা হলে তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়। সেই থেকে তারা উভয়ে কারাগারে আছে।