আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের শেষ কোথায়?

মেহেদী হাসান তমাল
গত ৩ জানুয়ারি ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরানি জেনারেল কাসেম সুলেইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রকে এর জবাব দিতে গিয়ে ইরাকে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটি গুড়িয়ে দেয়ার দাবি করেছে ইরান। এছাড়া দেশটি ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লে ১৭৬ আরোহীর সবার মৃত্যু হয়। শুরুতে এড়িয়ে গেলেও পরে তেহরান স্বীকার করেছে, ভুল করে চালানো হামলায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। ইউক্রেন দোষীদের শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ চেয়েছে।
ইরানি জেনারেল হত্যার পর দুই সপ্তাহ পার হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের সঙ্গে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একটিমাত্র ঘটনা নানা সংকটের জন্ম দিলেও যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান কারও কাছে সদুত্তর নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগ তুলে সুলেইমানিকে হত্যা করেছে, তা নিয়েও জবাব মিলছে না। এতে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি ও র‌্যান্ড পল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছেন। এ নিয়ে সামরিক দপ্তর পেন্টাগনের সংবাদ সম্মেলনকে তার ৯ বছরের ক্যারিয়ারে দেখা সবচেয়ে বাজে ব্রিফিং বলেছেন মাইক লি।
সুলেইমানি যুক্তরাষ্ট্রের যেসব স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার বিস্তারিত চেয়েছে কংগ্রেস। একইসঙ্গে তাকে হত্যার দিনেই কেন ইয়েমেনে আরেক ইরানি জেনারেলকে হত্যার চেষ্টা করা হলো, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউএসএ টুডের জরিপে উঠে এসেছে, সুলেইমানি হত্যার পর ৫৫ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন, এটি তাদের জীবন অনিরাপদ করে তুলেছে। ৫৭ শতাংশ ইরানের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনায় হামলার বিরুদ্ধে। আর ৫৩ শতাংশ প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা কমানোর প্রস্তাব পাসকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তবে বলা যায়, জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যার ঘটনা পুরোদস্তুর একটি যুদ্ধে রূপ নেয়নি। সে হিসাবে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে বলা যেতে পারে। কিন্তু দুইটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যাওয়ার মতো যেসব সম্ভাব্য কারণ রয়েছে, সেসব কারণের কোনোটিই পরিবর্তিত হয়নি।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই উত্তেজনা প্রশমনকে পুরোপুরি হ্রাস বা কমে যাওয়া বলা যাবে না। ইরানের নেতারা, যারা জেনারেল সোলেইমানি হত্যার ঘটনায় স্তম্ভিত হয়েছিলেন, তারা পাল্টা হামলা করার জন্য যা করার সেটা করেছেন। ইরান চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করে জবাব দিতে। সুতরাং নিজেদের ভূখ- থেকে মিসাইল নিক্ষেপ করে সেই জবাব দিয়েছে ইরান। কিন্তু তাদের এই পদক্ষেপের বাস্তব রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ছিল। তারা দ্রুত কিছু একটা করতে চেয়েছিল, পুরোদস্তুর একটি যুদ্ধ শুরু করতে চায়নি।
অবশ্য সংঘাতের পথ পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের প্রতি নিঃশর্ত আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। যদিও ট্রাম্পের আলোচনার প্রস্তাবকে কৌশল হিসেবেই বিবেচনা করছিলো ইরান।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান যাতে বাড়াবাড়ি না করে, সে লক্ষ্যে একটি পরিষ্কার সীমা বেঁধে দেয়ার জন্যই সম্ভবত ইরানি জেনারেলকে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী পদক্ষেপ নেয়ারও হুমকি দিচ্ছেন। আবার এই ইঙ্গিতও দিচ্ছেন যে, তিনি মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনতে চান।
এদিকে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করে দেয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় তেহরানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। বরং উল্টো ইরানই নিজস্ব ধরনের একটি চাপ প্রয়োগের কৌশল বেছে নিয়েছে। একদিকে তেহরানের ওপর দ্বিগুণ চাপ দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, আবার ওই এলাকা থেকে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনতে চাইছেন ট্রাম্প। কিন্তু এই দুইটি জিনিস একই সঙ্গে পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং সংঘাত যে চলতেই থাকবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের অর্থনীতি কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির অনেক বাসিন্দা এতে অখুশি, কিন্তু সেখানে রয়েছে এক ‘বিপ্লবী শাসনব্যবস্থা’। তারা হঠাৎ করেই ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না। ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড বাহিনী অনেক শক্তিশালী। তাদের জবাব হচ্ছে শক্ত হাতে দেশের ভেতর নিয়ন্ত্রণ রাখা আর যুক্তরাষ্ট্রের চাপের জবাবে পাল্টা চাপ দেয়া। সেটা অব্যাহতই থাকবে। ইরানের কৌশলগত লক্ষ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করা, অন্তত ইরাক থেকে।
মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে ইরানের দৃষ্টিতে দেখলে তেহরানের নীতি অনেক ক্ষেত্রেই সফলতা পেয়েছে। তারা সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারকে রক্ষা করতে পেরেছে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তাছাড়া ইরাকেও তাদের বেশ ভালো প্রভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনার পরপরই ইরাক সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে তার সৈন্যদের ইরাক থেকে ফেরত নেয়ার জন্য চাপ দেয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ট্রাম্পের নীতির বৈপরীত্যের কারণে ওই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা নিজেদের এখন অনেক বেশি একা বলে মনে করছে। মিত্রদের মধ্যে আস্থার এই সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য ট্রাম্প হয়ত শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে আসার নীতি থেকে সরে আসবেন। তেমনটি হলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত জিইয়ে থাকবে বছরের পর বছর।