প্রতিবেদন

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শেষ হলো বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
গত ১২ জানুয়ারি প্রথম পর্ব সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এবার নজিরবিহীন কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাত আয়োজিত ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। ১৬ জানুয়ারি বাদ ফজর মুফতি শাহজাদ হোসেনের আমবয়ানের মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাতের দ্বিতীয় পর্বের ৩ দিনের কার্যক্রমের সূচনা ঘটে। আর ১৯ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের দুই পর্বে ৬ দিনের বিশ্ব ইজতেমা। দ্বিতীয় পর্ব আয়োজনে ছিলেন ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীরা এবং এ পর্বে আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন ভারতের মাওলানা জামশেদ।
এর আগে আমলি শূরার তত্ত্বাবধানে মাওলানা জোবায়ের অনুসারীদের উদ্যোগে প্রথম পর্বের বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় পর্বে অংশ নিতে প্রথম পর্বের পরপরই দেশ-বিদেশের মুসল্লিরা টঙ্গী আসতে থাকেন। তুরাগ পারের বিশাল চত্বরে নির্মিত চটের শামিয়ানার তলায় এসে অবস্থান নেন পুণ্যার্থীরা। আন্তর্জাতিক নিবাসে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান নেন। দিন-রাত বিভিন্ন আমল ও জিকির-আজকারে সময় অতিবাহিত করেন সমবেত ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।
প্রতিদিন বাদ ফজর থেকে বাদ মাগরিব পর্যন্ত মূল মঞ্চ থেকে আমবয়ান পেশ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন খিত্তা ও লোকাল গেস্ট কামরায় পেশাভিত্তিক ও ছোট ছোট জামাতে খাস বয়ান অনুষ্ঠিত হয়। আমবয়ান পেশ করেন অনেকেই। এদের মধ্যে মাওলানা ইকবাল হাফিজ, ওয়াসেফুল ইসলাম ও মাওলানা মোহাম্মদ শামীম উল্লেখযোগ্য। উর্দু ভাষার মূল বয়ান তাৎক্ষণিক বাংলা, ইংরেজি, আরবি, তামিল, মালয়, চীনা, ফার্সি ও হিন্দি ভাষায় অনুবাদ করে শোনানো হয়।
বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের জন্য ইজতেমার বয়ান মঞ্চের নিচে তিন দিকে চাটাই বিছিয়ে বসার স্থান নির্ধারণ করা হয়। ইজতেমার রেওয়াজ অনুসারে এবারও কাঠ, লোহার পাইপ ও চট দিয়ে অনাড়ম্বরভাবে মূল বয়ান মঞ্চ তৈরি করা হয়, যেখানে কোনো ডায়াস, ব্যানার ও অতিথিদের আসন রাখা হয়নি এবং বয়ানের আগে বক্তার নাম ও কোনো পরিচয় ঘোষণা করা হয়নি। বাদ এশা ছাড়া অন্য ৪ নামাজের পর ৬ উছুলের আলোকে কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যাসংবলিত বয়ান করা হয়।
১৭ জানুয়ারি ইজতেমা ময়দানে প্রতিবারের মতো উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জুমার বিশাল জামাতে ইমামতি করেন তাবলিগ জামাতের শূরা সদস্য, জ্যেষ্ঠ মুরুব্বি মাওলানা মোশাররফ হোসেন।
এর আগে বিশ্ব ইজতেমার আমবয়ানে তাবলিগ জামাতের মুরুব্বি ওলামায়ে কেরামরা বলেন, আল্লাহ ও রাসুলের (সা.) প্রদর্শিত পথেই বান্দার জীবনে দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তি আসে। আর এ শান্তি আনতে হলে জান, মাল ও সময় ব্যয় করে দাওয়াতে তাবলিগে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে হবে, দ্বীনের মেহনতের মাধ্যমেই বান্দা তার দিলকে (অন্তর) জিন্দা করতে পারে। যে যত বেশি মেহনত করবে, সে তত বেশি কামিয়াবি হাসিল করবে।
ইজতেমা উপলক্ষে পুরো টঙ্গীতে প্রথম পর্বে যে ৫ স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, তা দ্বিতীয় পর্বেও বলবৎ থাকে। নিñিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এবারের ইজতেমায় পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার প্রায় ১২ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। ৪ শতাধিক সিসি ক্যামেরা, অর্ধশতাধিক ওয়াচ টাওয়ার, ৫টি কন্ট্রোল রুম, পর্যাপ্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত, নৌ ও আকাশপথে টহল ছাড়াও সাদা পোশাকের গোয়েন্দা নজরদারি চলে দুই পর্বেই। দেশ-বিদেশ থেকে আগত পুণ্যার্থীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ অন্যান্য সেবাদানে সরকারি ও বিভিন্ন সামাজিক-সেবামূলক সংগঠনের সেবা কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মতো।
দ্বিতীয় পর্বে অর্ধশতাধিক দেশের প্রায় ২ হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলিম বিশ্ব ইজতেমায় আসেন। অপরদিকে ৬৪ জেলা থেকে আসা পুণ্যার্থীরা ইজতেমা প্যান্ডেলের ৮৭টি জেলাভিত্তিক খিত্তায় নিজ নিজ খুঁটিতে অবস্থান নেন। বয়ান শুনে, নামাজ পড়ে, কুরআন-হাদিস পাঠ করে ইজতেমায় উপস্থিত সবাই আল্লাহ-র নৈকট্য লাভের আশায় নিজেকে সমর্পণ করেন। কেউবা অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে গভীর রাতে ডুকরে ডুকরে কেঁদে নিজের গোনাহ মাফ চেয়ে চোখের পানি ফেলেন। এতটুকু সময়ও ইবাদত ছাড়া কাটেনি কারোরই। শিশু-কিশোর থেকে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত উপস্থিত সবার মুখেই ছিল মহান আল্লাহ-র নাম। নানা জরুরত সারতে যারা রাস্তায় চলাচল করছেন, তাদের মুখেও ছিল আল্লাহ-আল্লাহ জিকির। লাখো মানুষের পদচারণায় মুখরিত তুরাগপাড়ের সবুজ চত্বর। এত মানুষের আনাগোনা অথচ ছিল না কোনো কোলাহল, ধাক্কাধাক্কি, বিশৃঙ্খলা। অন্যরকম এক পবিত্র আবেশ বিরাজ করেছিল বিশ্ব ইজতেমার ময়দানে।
তাবলিগ জামাতের শীর্ষ পর্যায়ের বিভেদের কারণে ইজতেমা আয়োজনে যে দুই ধারার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সাধারণ মুসল্লিদের জোরলো সমর্থন ছিল না। এমন অনেকে ছিলেন, যারা দুই পর্বেই এসেছেন। বেশিরভাগই ইজতেমা বলতে বোঝেন শুধু আল্লাহর পথে বের হওয়া, আর কারো কথায় না। কারো কারো কাছে যেন কোনো পন্থি হওয়াটাও বিব্রতকর। তারা চান ধর্মীয় এই মহাসমাবেশ থাকুক সব বিভেদের ঊর্ধ্বে। ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ এত কিছু বোঝেন না, তারা চান ইজতেমা হোক একসূত্রে গাঁথা। আগের মতো বিভেদহীন, দ্বিধাহীন, শঙ্কাহীন। তাছাড়া সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রত্যাশা হলো টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে জায়গার সংকুলান হলে এবং আয়োজনজনিত সমস্যা না হলে অতীতের মতো একই সময়ে যেন বিশ্ব ইজতেমা পালন করা হয় কেবল এক আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায়।