রাজনীতি

সিটি নির্বাচন: পোস্টারের নগরী ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ডের নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। ঢাকার রাজপথ থেকে অলিগলি ছেয়ে গেছে প্রার্থীদের সাদা-কালো পোস্টারে। দেয়ালে পোস্টার সাঁটানোয় নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় দড়িতে বেঁধে রাস্তার উপরে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে সারি সারি পোস্টার। মেয়র প্রার্থীদের তুলনায় কাউন্সিলর প্রার্থীদের পোস্টারই বেশি। বেশিরভাগ জায়গায় আবার মেয়র প্রার্থীর পোস্টারের সঙ্গে সেঁটে দেয়া হচ্ছে কাউন্সিলর প্রার্থীর পোস্টার। আওয়ামী লীগ-বিএনপির মেয়র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এমনটি বেশি দেখা যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাউন্সিলর প্রার্থীরা বোঝাতে চাচ্ছেন তিনি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ‘ঘোষিত’ প্রার্থী, যদিও ভোটাররা এখনো বুঝে উঠতে পারছেন কে আসলে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ঘোষিত কাউন্সিলর প্রার্থী।
উল্লেখ্য, বিভিন্ন মহলের দাবিকে আমলে নিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন বিশেষ জরুরি সভা করে আলোচনার মাধ্যমে ইসির পূর্বঘোষিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ সরস্বতী পূজার কারণে ৩০ জানুয়ারির পরিবর্তে ১ ফেব্রুয়ারি পুনঃনির্ধারিত করে। আবার ওই দিন এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা ১৮ জানুয়ারি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
তবে বেশিরভাগ কাউন্সিলর প্রার্থীই নিজেকে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির প্রার্থী বলে ভোটারদের কাছে পরিচয় দিচ্ছেন। কোনো প্রার্থীই নিজেকে বিদ্রোহী প্রার্থী বলে পরিচিত করতে চাচ্ছেন না। যেমন ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তত ৪ জন প্রার্থী নিজেদের আওয়ামী লীগের মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থী বলে ভোটারদের কাছে বলে বেড়াচ্ছেন। একই ওয়ার্ডের অন্তত ৩ জন নিজেদের বিএনপি মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থী বলে ভোটারদের কাছে পরিচয় দিচ্ছেন।
এসব নিয়ে দিন যত যাচ্ছে নির্বাচনি প্রচারে যোগ হচ্ছে নতুন মাত্রা। প্রার্থীদের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরাও ক্রমেই সরব হচ্ছেন। কাকভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীদের পক্ষে মিছিল স্লোগানে মুখরিত নগরী। মেয়র ছাড়া কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের জন্যও চলে ভোটপ্রার্থনা। নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই পথচলা থামবে না। প্রচারে নেমে সব প্রার্থীই ভোট, দোয়া ও সমর্থন চাইছেন। যাকে পাচ্ছেন বুকে টেনে নিচ্ছেন, যদি মনটা গলানো যায়। তবে ভোটাররা মুচকি হেসে বুকে টেনে নেয়ার প্রতিদান দিচ্ছেন।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৩ প্রার্থী। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম নৌকা প্রতীক ও বিএনপির প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ধানের শীষ প্রতীক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস নৌকা প্রতীক ও বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদিনই ছুটছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মেয়র প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারণায় থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যেই। এটা অবশ্য আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষও মনে করে।
পাড়ামহল্লায় মূলত ধানের শীষ আর নৌকার পোস্টার Ñ যেদিকে দুচোখ যায় কেবল পোস্টার আর পোস্টার। পাশাপাশি দল বেঁধে সমর্থকদের লিফলেট বিতরণ চোখে পড়ে। চায়ের দোকান, পথসভা, ঘরোয়া সভায় এখন শুধুই ভোটের আলাপ। প্রার্থীর ক্যাম্প এখন সরগরম। কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে চলছে মাইকিংয়ের মাধ্যমে ভোট প্রার্থনা। ‘অমুক ভাইয়ের সালাম নিন, অমুক মার্কায় ভোট দিন। অমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র’ ইত্যাদি স্লোগান ও মাইকিংয়ে সরগরম সারা ঢাকা।
তবে কোথাও কোথাও আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কিছু কাউন্সিলর প্রার্থীর পক্ষে বড় বড় ব্যানারে চলছে ভোটের প্রচার। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভোট চাওয়া নিষিদ্ধ হলেও জুমার নামাজে কাউন্সিলর ও মেয়র প্রার্থীদের পক্ষে ভোটপ্রার্থনা করতে দেখা গেছে। দুপুরের পর মাইকিংয়ের বিধান থাকলেও বেশিরভাগ প্রার্থী এই বিধান মেনে চলছেন না। সকাল ১০টার পরই মাইকিং শুরু হয়ে যাচ্ছে।
ভোটাররা একসঙ্গে ৩টি ভোট দিতে পারবেন। ১টি মেয়র পদে অন্য ২টি কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীর। কাউন্সিলরদের দলীয় প্রতীক না থাকায় পরিচয় নিশ্চিত করতে একসঙ্গে ৩টি পদে প্রার্থীদের জন্য ভোট প্রার্থনা চলছে।
গত ১৭ জানুয়ারি জুমার নামাজ শেষে মুসল্লিদের কাছে ভোট ও দোয়া চেয়েছেন প্রার্থীরা। সকাল থেকে তারা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটেছেন। যাকে যেখানে পাচ্ছেন তাকেই জড়িয়ে ধরে বলছেন, ১ ফেব্রুয়ারি তারিখ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ‘অমুক’ মার্কায় একটা ভোট দেবেন। আর মাইকের চিৎকার তো আছেইÑ ‘১ ফেব্রুয়ারি শুভ দিন, অমুক মার্কায় ভোট দিন।’
ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস প্রচারণার তুঙ্গে আছেন। তিনি দলবল নিয়ে একেক দিন একেক এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন আর ভোটারদের উদ্দেশে বলছেন, দক্ষিণে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। আমিই একমাত্র প্রার্থী যে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা নিয়ে চিন্তা করে সুনির্দিষ্ট উন্নয়নের রূপরেখা দিয়েছি। ৫ ভাগে উন্নয়নের রূপরেখা ভাগ করেছি। ঢাকাকে ভালোবাসি। ঢাকার ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে চাই। ঐতিহাসিক ঢাকার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা পুনরুজ্জীবিত করে উন্নত ঢাকা গড়ে তুলব।
তিনি আরো বলছেন, উন্নয়নের রূপরেখা ঢাকাবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেছেন। ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলরদের নির্বাচিত করে জনগণ তাদের সেবক হিসেবে দায়িত্ব দেবে, এটা আমরা আশা করছি। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণের বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নির্বাচিত হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়া হবে। বিএনপি সমর্থিত সকল কাউন্সিলরকে ভোট দেবেন। তারা আমাদের সঙ্গে সংগ্রামে যুক্ত। সকল ধরনের প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ১ ফেব্রুয়ারি ভোটকেন্দ্রে আসবেন। রাজপথে দেখা হবে। আপনাদের জন্য আমি জীবন দিতেও
প্রস্তুত।
নির্বাচিত হলে প্রথমেই এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশরাক হোসেন বলেন, ঢাকা ওয়াসাকে সঙ্গে নিয়ে এলাকা আধুনিক ড্রেনেজ সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসা হবে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ওয়াসার সঙ্গে বসে আমরা সঞ্চালন লাইন প্রতিস্থাপন করব। ডেঙ্গুর বিষয়ে পুরো ঢাকার ওপর আমাদের একটা কার্যক্রম রয়েছে। যথা সময়ে, যথা পরিমাণে, যথাযোগ্য মানের ওষুধ প্রয়োগ করে এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
ঢাকা উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সাথে নিয়ে দিনরাত অবিরাম প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রচারকালে তিনি বলেন, মেয়র নির্বাচিত হলে যা কিছু আছে তা দিয়েই জনগণের সেবা করব। মেয়র ও কাউন্সিলরদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। নিজের ও কাউন্সিলরদের সম্পদের হিসাব প্রতি বছর প্রকাশ করাসহ প্রতি মাসে এলাকাবাসীর সঙ্গে কাউন্সিলরদের নিয়ে সিটি হল মিটিং করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন আতিকুল ইসলাম। চলমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে আতিকুল ইসলাম ভোটারদের কাছে আবারও নৌকায় ভোট চান। কারণ নৌকার কোনো ব্যাক গিয়ার নেই। ফ্রন্ট গিয়ার শুধু। ভোটের প্রচারকালে মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলামের সাথে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও মহানগর কমিটির নেতারা উপস্থিত থেকে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করেন।
অপর পক্ষে আতিকুল ইসলামের বিপরীতে ঢাকা উত্তরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা করেন এলাকার ভোটারদের কাছে। বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে তাবিথ আউয়াল দিনরাত ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নির্বাচনি প্রচারকালে উপস্থিত সাংবাদিকদের তাবিথ আউয়াল বলেন, প্রতিদিন ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই নির্বাচনি প্রচার শুরু করছি। প্রতিনিয়ত পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। যেখানেই যাই জনগণের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ভোটারদের কাছ থেকে যে রকম সাড়া পাচ্ছি, এতে বিশ্বাস করি যদি আগামী ১ ফেব্রুয়ারি এরকমভাবে শৃঙ্খলা থাকে তাহলে আমাদের নিশ্চিত বিজয় হবে।
তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, এখন পর্যন্ত ঢাকা সিটিতে ভোটের পরিবেশ-পরিস্থিতি বেশ আশাব্যঞ্জক। কিছু বিচ্ছিন্ন ছোটখাট ঘটনা ছাড়া ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিরাজ করছে। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের আবহাওয়া বিরাজ করছে। এ ভোটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যেই মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এবং উভয় দলের প্রার্থী ও সমর্থকরাই এ নির্বাচনকে প্রার্থী ও দলের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। তাই সবাই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির আপামর ভোটারের মন জয় করে ভোট পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভোটের শান্তিপূর্ণ বর্তমান অবস্থা বজায় থাকলে আশা করা যায় এবার অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ঢাকায়।