প্রতিবেদন

অভিযুক্ত মিয়ানমার: রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার নির্দেশ আইসিজে’র

নিজস্ব প্রতিবেদক : রোহিঙ্গা গণহত্যায় অভিযুক্ত করা হয়েছে মিয়ানমারকে। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) ২৩ জানুয়ারি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গণহত্যা থেকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারকে ৪টি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেয়ার আদেশ দিয়েছে আইসিজে। প্রথম ব্যবস্থা হিসেবে জেনোসাইড সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বর্ণিত রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত হওয়া বিভিন্ন অপরাধ ঠেকাতে মিয়ানমারকে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। জেনোসাইড সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে অপরাধ হিসেবে বিশেষ করে ক. কোনো গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা, খ. কোনো গোষ্ঠীর সদস্যদের গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা, গ. কোনো গোষ্ঠীকে পুরোপুরি বা তার অংশবিশেষকে শারীরিকভাবে ধ্বংস করতে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী দুর্ভোগ চাপিয়ে দেয়া এবং ঘ. কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম ঠেকাতে চাপিয়ে দেয়া ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। আইসিজেতে গাম্বিয়া দাবি করেছিল, ওই সব অপরাধই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত হচ্ছে।
আইসিজে দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে বলেছে, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে মিয়ানমার নিশ্চিত করবে যে, তার সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি কোনো অনিয়মিত সশস্ত্র ইউনিট কোনো ধরনের গণহত্যা করবে না বা গণহত্যার সঙ্গে সম্পৃৃক্ত হবে না।
তৃতীয় ব্যবস্থা হিসেবে আইসিজে মিয়ানমারকে জেনোসাইড সনদের আওতায় বর্ণিত অপরাধগুলোর তথ্য-প্রমাণ বিনষ্ট না করতে এবং সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
চতুর্থ ব্যবস্থা হিসেবে আইসিজে বলেছে, অন্তর্বর্তী আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে মিয়ানমারকে আগামী ৪ মাসের মধ্যে জানাতে হবে। এরপর আইসিজেতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জেনোসাইডের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রতি ৬ মাস পর পর আদালতে অন্তর্বর্তী আদেশ পালন বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
আইসিজের প্রেসিডেন্ট আবদুল কায়ি আহমেদ ইউসুফ এই রায় ঘোষণার সময় বলেন, এই আদেশ মেনে চলতে আইনগতভাবে মিয়ানমার বাধ্য। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলেরও কোনো সুযোগ নেই।
আদালতে গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবুবকর এম তামবাদুইয়ের নেতৃত্বে তার আইনজীবী দল এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের দপ্তরের মন্ত্রী চ টিন্ট সুয়ের নেতৃত্বে আইনজীবী দল উপস্থিত ছিলেন।
গত নভেম্বর মাসে গাম্বিয়া আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জেনোসাইড প্রতিরোধ বিষয়ক সনদ লঙ্ঘন ও রোহিঙ্গা জেনোসাইডের দায়ে আইসিজেতে মামলা করে। সেই মামলায় জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেয়ারও আবেদন করেছিল গাম্বিয়া। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেয়ার আবেদনের ব্যাপারে গত ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর আইসিজেতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
সেই শুনানিতে মিয়ানমারের পক্ষে নেতৃত্ব দেন স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। ওই শুনানিতে মিয়ানমার গাম্বিয়ার মামলার বিরুদ্ধে যেসব যুক্তি তুলে ধরেছিল সেগুলো রায়ের দিন এক এক করে খারিজ করে দিয়েছে আইসিজে। হেগের পিস প্যালেসে আইসিজের প্রেসিডেন্ট যখন মামলার রায় পড়ছিলেন, তখন মিয়ানমারের মন্ত্রী ও আইনজীবী দলকে বিমর্ষ ও গম্ভীর দেখাচ্ছিল।
জেনোসাইড থেকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারকে আইসিজের আদেশকে মাইলফলক হিসেবে দেখছেন রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকরা। আইসিজের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ।
মামলায় গাম্বিয়ার পক্ষে নেতৃত্ব দেয়া সে দেশের আইনমন্ত্রী আবুবকর এম তামবাদুই বলেছেন, রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ অবসানে এই ছোট্ট পদক্ষেপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন তাদের সুরক্ষায় সারা বিশ্বকে এগিয়ে আসতে হবে।
মামলার রায় শুনতে আইসিজেতে উপস্থিত ছিলেন রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রাজিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, প্রভিশনাল মেজার্স (অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা) হচ্ছে প্রাথমিক পদক্ষেপ। এটি মামলাকে ধরে রাখবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব। জেনোসাইডের যে আলামতগুলো রয়েছে, সেগুলো যেন মিয়ানমার বিনষ্ট না করে।
রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, আইসিজেতে মিয়ানমারকে বিচারের মুখোমুখি করানোর নেপথ্যে বাংলাদেশের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ ওআইসিতে প্রস্তাব পাস করিয়ে গাম্বিয়াকে দিয়ে মামলা করিয়েছে। তাই মিয়ানমারের এই জবাবদিহি উদ্যোগে বাংলাদেশের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেছেন, আইসিজে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে এবং মিয়ানমারের দাবিও নাকচ করেছে। আদালত মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ওপর জেনোসাইড ও নৃশংসতা বন্ধ করতে বলেছে। আশা করা যায়, এমন রায় বিশ্বে জেনোসাইড ও জাতিগত নির্মূলের পুনরাবৃত্তি ঠেকাবে।
আইসিজের রায়ের পরপরই মানবাধিকার সংগঠনগুলো মিয়ানমারকে রায় পুরোপুরি মেনে চলার তাগিদ দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ফোরটিফাই রাইটস এক বিবৃতিতে সু চির সরকারকে বলেছে, ‘রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিন। আইসিজের আদেশ মেনে চলুন।’
মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন থেকে এক বিবৃতিতে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টের মহাসচিব স্যাম জারিফি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে এ আদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। জেনোসাইড সনদের আওতায় রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় এ আদেশ মিয়ানমারের জন্য মেনে চলা অপরিহার্য। আইসিজের এ আদেশ পুরোপুরি মেনে চলতে মিয়ানমারকে আহ্বান জানানো এবং সহযোগিতা করা বিশ্বের সব রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য আবশ্যিক।