আন্তর্জাতিক

যে কারণে ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদ ছাড়লেন হ্যারি-মেগান

নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্রিটেনের রাজসিংহাসনের ষষ্ঠ দাবিদার প্রিন্স হ্যারি জানিয়েছেন, তিনি ‘বিশ্বাসের ওপর ভর’ করে রাজপরিবারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এছাড়া ‘সত্যি তার অন্য কোনো উপায় ছিল না’।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রিন্স হ্যারি বলেন, তিনি ও মেগান রানি ও রাজপরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেজন্য কোনো সরকারি অর্থ বরাদ্দ নিতে চাননি।
সাবেক অভিনেত্রী স্ত্রী মেগানকে নিয়ে রাজকীয় উপাধি ও দায়িত্ব ত্যাগ করার ঘোষণা দেয়ার পর এই প্রথম কোনো বক্তৃতা দিলেন প্রিন্স হ্যারি। কিন্তু তিনি জানিয়েছেন, তিনি পরিষ্কার করে বলতে চান যে, তিনি ও মেগান ‘রাজপরিবার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন না’।
এর আগে এক যৌথ বিবৃতিতে প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান জানান, তারা রাজপরিবারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন এবং বলেছেন, তারা আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য কাজ করতে চান।
আফ্রিকার এইচআইভি আক্রান্ত শিশুদের জন্য নিজের দাতব্য প্রতিষ্ঠান সেন্টেবালির এক তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানে লন্ডনে কথা বলেন প্রিন্স হ্যারি।
তিনি বলেন, আমি অনুমান করতে পারি, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আপনারা আমাদের বিষয়ে কী কী শুনেছেন। কিন্তু আমি চাই আপনারা আমার মুখ থেকেই সত্যটা শুনুন। আমি যতটা বলতে পারি, একজন রাজকুমার বা ডিউক হিসেবে না, কেবল হ্যারি হিসেবে।
দাদী ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে নিজের ‘কমান্ডার ইন চিফ’ সম্বোধন করে প্রিন্স হ্যারি বলেন, তার প্রতি ‘সব সময় পরম শ্রদ্ধা’ থাকবে। আমাদের ইচ্ছে ছিল সরকারি অর্থ না নিয়ে রানির প্রতি, কমনওয়েলথের প্রতি এবং আমার সামরিক সংস্থার প্রতি দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা সম্ভব ছিল না।
এর আগে রানি, রাজপরিবারের ঊর্ধ্বতন সদস্যগণ এবং এই জুটির মধ্যে এক আলোচনায় হ্যারি ও মেগান একমত হয়েছেন, এখন থেকে তারা আর আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতিনিধিত্ব করবেন না। আসছে বসন্ত থেকে তাদের নামের সাথে রাজউপাধি আর ব্যবহৃত হবে না এবং আনুষ্ঠানিক সামরিক দায়িত্বসহ তাদের রাজকীয় সব দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হবে।
যদিও বাকিংহাম প্যালেস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রাজপরিবার হ্যারি ও মেগানের জন্য নিজস্ব পৃষ্ঠপোষকতা এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা চালিয়ে যাবে।
এই যুগলের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা বক্তৃতায় প্রিন্স হ্যারি বলেছেন, যখন বিয়ে হয় তখন ‘আমরা খুবই উদ্দীপ্ত ছিলাম, আশাবাদী ছিলাম এবং আমরা রাজপরিবারের সেবা করতে চেয়েছিলাম। সে কারণেই এটা ভেবে আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে যে এটা আজ এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্ত্রী ও আমার নিজের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেয়াটা খুব সহজ বা হালকা ব্যাপার ছিল না।’
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এ যুগলের ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। পুত্র আর্চিকে নিয়ে ভ্যানকুভার দ্বীপে ৬ সপ্তাহের ছুটি কাটানোর পর হ্যারি ও মেগান জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকায় তাদের সময় ভাগাভাগি করে থাকতে চান। মেগান মার্কেল বর্তমানে ছেলেকে নিয়ে কানাডার ওয়েস্ট কোস্টে রয়েছেন। এর আগে জানুয়ারির শুরুতে কয়েক দিনের জন্য যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন তিনি।
গত ৮ ডিসেম্বর হ্যারি ও মেগান ঘোষণা করেন যে, তারা রাজপরিবারের সামনের কাতারের দায়িত্ব থেকে অবসর নিতে চান। তারা এই ঘোষণা দিয়েছিলেন রানি বা রাজপরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই। এ জন্যই এ ঘটনা এত তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করে।
এর আগে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য টাইমস’ বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়াম ছোট ভাই প্রিন্স হ্যারির ওপর কর্তৃত্বপরায়ণ বলে উল্লেখ করে। ওই খবরে দাবি করা হয়, বড় ভাইয়ের এমন আচরণের কারণে হ্যারি স্ত্রীসহ রাজপরিবার ত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে এই সংবাদকে ‘আপত্তিকর এবং ক্ষতিকারক’ বলে উল্লেখ করেন প্রিন্স উইলিয়াম ও হ্যারি।
এদিকে হ্যারি ও মেগান নতুন একটি অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন। তারা তাদের রাজকীয় দায়িত্ব, উপাধি এবং সরকারি তহবিল ত্যাগ করছেন এবং ধারণা করা হচ্ছে, তারা তাদের বেশিরভাগ সময় কাটাবেন কানাডাতে।
১৯৮৪ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর পেডিংটনের সেন্ট মেরিস হসপিটালে জন্ম নেন হ্যারি। সে বছরের ডিসেম্বরে উইন্ডসরের সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলে আর্চবিশপ অব ক্যানটারবারি তাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে তার নামকরণ করেন হেনরি চার্লস অ্যালবার্ট ডেভিড। কিন্তু জন্মের পর থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে বলা হয় যে, তিনি হ্যারি নামে পরিচিত হবেন।
১৯৯৭ সালে মায়ের মৃত্যু হলে হ্যারির শৈশব জীবনও সংক্ষিপ্ত হয়ে আসে। ২০১৭ সালে ডেইলি টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রিন্স হ্যারি বলেছিলেন, ‘আমি বলতে পারি যে, ১২ বছর বয়সে আমার মাকে হারানো এবং এ কারণে গত ২০ বছর ধরে আমার সব আবেগকে দমিয়ে রাখার বিষয়টি শুধু আমার ব্যক্তিগত জীবন নয় বরং আমার কাজের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
এখন বলা যায়, কাজের ওপর মারাত্মক প্রভাব এড়ানোর জন্যই হ্যারি তার স্ত্রী মেগানকে নিয়ে ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করছেন। এ থেকে বুঝা যায়, বড় ভাই উইলিয়ামের ওপর অভিমান নয়, বরং নিজের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার জন্যই ব্রিটেনের রাজার দাবিদার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন প্রিন্স হ্যারি।