অর্থনীতি

সরকারের শীর্ষমহলের হস্তক্ষেপে অবশেষে চাঙা হচ্ছে পুঁজিবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক
সংশ্লিষ্টদের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও যখন পুঁজিবাজার গতিশীল হচ্ছিলো না তখনই জাতীয় স্বার্থে এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেন সরকারপ্রধান। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সংক্রান্ত ৬টি নির্দেশনা প্রদান করেন। তাঁর নির্দেশনার পর থেকে পুঁজিবাজার চাঙা হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর সূচকের ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়, লেনদেন বাড়তে থাকে। শেয়ারের দাম কমে যাওয়া কোম্পানির চেয়ে বেড়ে যাওয়া কোম্পানির সংখ্যা বাড়তে থাকে।
উল্লেখ্য, গত ১৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার বৈঠকে শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে যে নির্দেশনাগুলো দেয়া হয় সেগুলো হলো:
১. শেয়ারবাজারে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা,
২. মার্চেন্ট ব্যাংকার ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা,
৩. আইসিবির বিনিয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ,
৪. বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং দেশীয় বাজারে আস্থা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ,
৫. প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং
৬. মানসম্পন্ন আইপিও বৃদ্ধির লক্ষ্যে বহুজাতিক ও সরকারি মালিকানাধীন লাভজনক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
এসব নির্দেশনা দেয়ার পরের কার্যদিবস ১৯ জানুয়ারি সূচক বাড়ে ২৩২ পয়েন্ট। লেনদেন হয় ৪০৩ কোটি ১২ লক্ষ টাকা। শেয়ারের দাম বাড়ে ৩৪৬টির, কমে ৬টির এবং স্থিতিশীল ছিল ৪টি কোম্পানির শেয়ারের দর। ২০ জানুয়ারি সূচক বাড়ে ৫২ পয়েন্ট। লেনদেন হয় ৪৯৪ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকা। শেয়ারের দাম বাড়ে ১৪৯টির, কমে ১৬১টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৪টি কোম্পানির শেয়ারের দর। ২১ জানুয়ারি সূচক কমে ২৬ পয়েন্ট। লেনদেন হয় ৪০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। শেয়ারের দাম বাড়ে ৭৯টির, কমেছে ২৩৭টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪০টি কোম্পানির শেয়ারের দর। ২২ জানুয়ারি সূচক বাড়ে ৩২ পয়েন্ট। লেনদেন হয় ৪৩৮ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা। শেয়ারের দাম বাড়ে ১৮৩টির, কমে ১২৬টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৭টি কোম্পানির শেয়ারের দর। ২৩ জানুয়ারি সূচক বাড়ে ৭৩ পয়েন্ট। লেনদেন হয়েছে ৩৩৮ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা। শেয়ারের দাম বাড়ে ২৮০টির, কমেছে ৪৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩২টি কোম্পানির শেয়ারের দর। ২৬ জানুয়ারি সূচক বাড়ে ১৪ পয়েন্ট। লেনদেন হয়েছে ৪৭৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। শেয়ারের দাম বাড়ে ১৪২টির, কমেছে ১২১টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৩টি কোম্পানির।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ডিএসইতে ডিএসইএক্স সূচকটি ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি ৪ হাজার ৫৬ পয়েন্ট নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ১৯ জানুয়ারি ১ দিনে বিগত ৭ বছরের মধ্যে সূচকটির সর্বোচ্চ ২৩২ পয়েন্ট উত্থান হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের ১০ মে’তে ১ দিনে সূচকের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উত্থান হয়েছিল ১৫৫ পয়েন্ট।
গত ১ বছর ধরে শেয়ারবাজার মন্দায় ছিল। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্কে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারের উন্নয়নে উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, দেন কয়েকটি নির্দেশনা, যা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা তৈরি করে।
এছাড়া ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে সহজ সুদে ১০ হাজার কোটি টাকা প্রদান বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন গভর্নর। প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর আশ্বাস দেন তিনি।
বিভিন্ন পদক্ষেপের সঙ্গে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালকদের শেয়ার ক্রয়ের ঘোষণা, গ্রামীণফোনের সিইও পদে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ইয়াসির আজমানকে নিয়োগ এবং তারল্য সংকট নিরসনে সরকারি ৪ ব্যাংকের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত শেয়ারবাজারে ইতিবাচক ভূমিকা এনে দেয়। এসব খবরে ১৯ জানুয়ারি থেকে ডিএসইএক্স সূচক উত্থান হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজার নিয়ে যে ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, আশা করা যায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ৪ ব্যাংক ছাড়াও অন্য ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য বলা হয়েছে। এ উদ্যোগের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা কিছুটা ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়। সরকার চায় শেয়ারবাজার ভালো হোক, এমন ধারণা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ফিরে আসবে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) বলছে, প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপেই পুঁজিবাজারে দরের ঊর্ধ্বগতির কারণ। কয়েকদিন ধরে পুঁজিবাজার নিয়ে ইতিবাচক খবর আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজার নিয়ে ভালো কথা বলেছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পুঁজিবাজার নিয়ে আলোচনার খবর এসেছে। মানুষের আস্থা বাড়ে। মানুষ মনে করছে, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বিষয়টি দেখছেন, এবার হয়ত বাজার ঠিক হবে। যেসব কথা বলা হয়েছে তা সত্যি সত্যি করা গেলে বাজার আসলেই ভালো হবে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, পুঁজিবাজারে শেয়ারের দর অনেক কমে গেছে। এই অবস্থায় দুটি সুখবর এসেছে। একটি হচ্ছে পুঁজিবাজার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক, আরেকটি হচ্ছে সরকারি ব্যাংকগুলোও শেয়ার কিনবে। ফলে আস্থা ফিরে এসেছে। আর মানুষের আতঙ্কিত হয়ে বিক্রির সিদ্ধান্ত বন্ধ হয়েছে। এজন্যই সূচক বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ নেয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়ে। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করেন, সরকার শেয়ারবাজার ভালো করতে আন্তরিক। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এছাড়া বড় ধরনের ধসের কারণে ভালো ভালো কোম্পানির শেয়ার দাম অনেক কমে গেছে। এখন এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়বে Ñ এটাই স্বাভাবিক।
তারা বলছেন, এখন যেহেতু শেয়ারবাজার পতন কাটিয়ে উঠছে তাই বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে হবে। হুজুগে বা গুজবে বিনিয়োগ করা উচিত হবে না। কোনোভাবেই শেয়ারের প্যানিক সেল (হুজুগে বিক্রি) করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ব্যবসার উদ্দেশ্যে যেকোনো বিনিয়োগে লাভ-লস দুটোই থাকবে। আবার গুজবে পড়ে অতিরিক্ত লাভের আশায় দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করাও ঠিক হবে না। বিনিয়োগকারীদের ভালো কোম্পানি বাছাই করে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে হবে।