অর্থনীতি

আমানতের সুদহার কমানোতে সঞ্চয়বিমুখ হবে মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
সুদের বিনিময়ে ব্যাংক ঋণ দেয় এবং আমানত গ্রহণ করে। নতুন কোনো সুদহার নির্ধারণ হলে ঋণ ও আমানতের সুদ একই তারিখে কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। ঋণের ৯ শতাংশ সুদহার কার্যকর হবে ১ এপ্রিল থেকে। আর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সব ধরনের ব্যক্তি আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ কার্যকর করা
হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীরা ২৮ জানুয়ারি বৈঠক করে এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঋণের ৯ শতাংশ সুদ কার্যকরের ২ মাস আগেই ব্যক্তি আমানতের ৬ শতাংশ নতুন সুদহার কার্যকর হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো সার্কুলার জারি করা হয়নি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ঋণের ৯-৬ সুদ কার্যকরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সার্কুলার জারি করা হবে।
এর আগে গত ২০ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে বলা হয়, বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত রাখা যাবে। এই আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ পাবে সরকারি সংস্থাগুলো। আর সরকারি ব্যাংকে আমানত রাখলে সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ শতাংশ সুদ নিতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যক্তি আমানতে ৬ শতাংশ সুদ বেঁধে দেয়া হলে আমানতকারীরা নিরুৎসাহিত হবে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে আমানত রাখা কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া যারা টাকা রাখবে তাদের পক্ষে প্রকৃত মুনাফা ঘরে তোলা কঠিন হবে বলেও মনে করছেন তারা। একই সঙ্গে তারল্য সংকট আরো প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে দুর্বল ভিত্তির ব্যাংকগুলোর। কারণ তখন নতুন-পুরনো সব আমানতকারীই শক্তিশালী ভিত্তির ব্যাংকেই টাকা রাখতে বেশি আগ্রহী হবে। পাশাপাশি মানুষ সঞ্চয়বিমুখ হয়ে পড়বে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংকে আমানত রাখা কমলেও সঞ্চয়পত্র ও শেয়ারবাজারে ব্যক্তি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এছাড়া অতিমুনাফার টোপ দিয়ে দাদন ব্যবসা জমজমাট হবে। অনেক ভূঁইফোড় কাবুলিওয়ালার আবির্ভাব ঘটবে। বাসাবাড়িতে টাকা জমা রাখার প্রবণতা বেড়ে যাবে। ফলে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জানা গেছে, আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ নির্ধারণ হওয়ায় বেশিরভাগ আমানতকারীই ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, সব আমানতের ক্ষেত্রে সুদের সর্বোচ্চ হার যদি ৬ শতাংশ হয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো আরো কম দেয়ার চেষ্টা করবে। যদি ৬ শতাংশও দেয়, তাহলেও ব্যাংকে টাকা রেখে প্রকৃতপক্ষে কোনো মুনাফা ঘরে তুলতে পারবে না আমানতকারীরা। কারণ, এখন মূল্যস্ফীতির হারই প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি। এর ওপর উৎসে কর ও আবগারি শুল্কের বিষয় রয়েছে। সব মিলে ব্যাংকে টাকা রেখে প্রকৃত মুনাফা ঘরে তোলা কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ জানুয়ারি মাসের হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওই মাসে দেশের ৬০টির মধ্যে ২৫টি তফসিলি ব্যাংক ব্যক্তি আমানতকারীদের থেকে তহবিল সংগ্রহে গড়ে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ দিয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬টি, বিশেষায়িত ২টি, বিদেশি ৪টি ও বেসরকারি ১৩টি ব্যাংক। বাকি ৩৩টি ব্যাংক আমানতকারীদের গড়ে সাড়ে ৯ শতাংশ সুদ দিয়েছে।
আগের মাস ডিসেম্বরে ৬০টি ব্যাংকের মধ্যে ২০টি ব্যাংক আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ দিয়েছিল। এর মানে ১ মাসের ব্যবধানে ৫টি ব্যাংক তাদের আমানতের সুদ কমিয়ে এনেছে।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি জানিয়েছে, সব ব্যাংক আমানতে একই সুদ অফার করলে তেমন একটা সমস্যা হবে না। কারণ সবাই সুদের হার কমালে মানুষ আমানত রাখতে কোথায় যাবে? বিকল্প হিসেবে সঞ্চয়পত্র থাকলেও সেখানে লিমিট দেয়া আছে, ইচ্ছামতো কেনা যাবে না। কেউ যদি মনে করে শেয়ারবাজারে যাবে, তাহলে যাবে। এখানে করার কিছু নেই। কারণ একজন সঞ্চয়কারী তার টাকা কোথায় খাটাবে, এটা তারই সিদ্ধান্ত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার জারির আগে ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই ব্যাংকগুলো ব্যক্তি আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ নির্ধারণ করার কারণ ব্যাংকগুলো কম সুদে আমানত সংগ্রহ করার পরেই তো কম সুদে ঋণ বিতরণ করবে।
তাছাড়া ব্যাংক মালিকরা ৯-৬ সুদহার বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন ২০১৮ সালের জুনে। ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটা এখনো কার্যকর করেননি ব্যাংক মালিকরা। ২০১৯ সালের শেষ সময়ে এসে কমিটি গঠন করে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবং সেটা নতুন বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকরেরও ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু সার্কুলার জারির পূর্বমুহূর্তে এসে ওই সিদ্ধান্ত ঝুলে যায়। ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ক্রেডিট কার্ড বাদে সব ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। এছাড়া একই তারিখ থেকে সব ধরনের আমানতের সর্বোচ্চ সুদের হার ৬ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কিন্তু অর্থমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের এক অংশ পালন করে ব্যাংকগুলো অর্থাৎ ঋণের ৯ শতাংশ সুদ ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। অর্থমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের আরেক অংশ পালন না করে ব্যাংকগুলো আমানতের ৬ শতাংশ সুদ ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই কার্যকর করে ফেলেছে। এক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারেরও অপেক্ষা করেনি।