ফিচার

করোনা ভাইরাস ও সতর্কতা

অধ্যাপক ডা. শরীফুল আলম জিলানী
বর্তমানে করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী এক আতঙ্কের নাম। কিন্তু কী এই করোনা ভাইরাস? এই মুহূর্তে করণীয়ই বা কী। এ বিষয়ে স্বদেশ খবর পাঠকদের জন্য দেয়া হলো বিশেষজ্ঞ পরামর্শ।

করোনা ভাইরাস কী
ভাইরাসের অনেক গোত্রের মধ্যে করোনাভিরিডি পরিবারভুক্ত একটি ভাইরাস হলো এই করোনা ভাইরাস। এ ভাইরাস সাধারণত সর্দি-জ্বর ও কাশি সৃষ্টি করে। চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানের একটি বাজার থেকে এ বছরের ৭ জানুয়ারি নতুন এক প্রজাতির করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। যার নাম দেয়া হয়েছে ২০১৯-হঈঙঠ বা ঁিযধহ ঈঙজঙঘঅ ারৎঁং।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, নতুন প্রজাতির এই ভাইরাস, সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বর থেকে শুরু করে শ্বাসনালি ও ফুসফুসে মারাত্মক প্রদাহ তৈরি করে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।

লক্ষণ ও উপসর্গ
এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রথম ১০ থেকে ১৪ দিন রোগী উপসর্গহীন থাকে, যাকে আমরা বলি ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড। তারপর কিছু লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যেতে পারে। যেমন জ্বর, ঠা-া-সর্দি, প্রচ- কাশি ও শ্বাসকষ্ট।

জটিলতা
ক্স নিউমোনিয়া
ক্স একিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম
ক্স বমি
ক্স ডায়রিয়া
ক্স কিডনি ও লিভার ফেইলিউর
ক্স এমনকি মৃত্যু।
জটিলতা ছাড়াই এই রোগ ভালো হয়ে যেতে পারে। তবে জটিলতা থেকে মৃত্যুর আশঙ্কাও বিদ্যমান। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি।

প্রতিরোধে করণীয়
ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো এই ভাইরাস সাধারণত প্রাণী থেকে মানুষ বা মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে। যেহেতু এই ভাইরাসের প্রতিকার নেই তাই প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা।
ক্স বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। বিশেষ করে বাইরে থেকে এলে বা রোগীর সংস্পর্শে এলে।
ক্স অযথা চোখ, মুখ, নাক, হাত দিয়ে না ঘষা।
ক্স বাইরে বের হলে ফেস মাস্ক পরে বের হওয়া।
ক্স আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা।
ক্স হাঁস-মুরগি বা অন্য যেকোনো প্রাণী, বিশেষ করে যদি রোগাক্রান্ত হয়, তাহলে দূরে থাকা।
ক্স প্রাণীর সংস্পর্শে এলে, পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া।

পরিসংখ্যান যা বলে
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৬১ জনের মৃত্যু এবং ১৭ হাজারের বেশি আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। যদিও শুধু চীনের উহানে এই ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তবে সমগ্র চীনে তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। চীনে যাওয়া বা চীন থেকে আসা লোকজনের কারণে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, আমেরিকাসহ বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশে এই ভাইরাস দ্বারা অনেকে সংক্রমিত হয়েছে ও হচ্ছে। বাড়ছে সংক্রমিত দেশ ও মানুষের সংখ্যা। সে হিসাবে বাংলাদেশও ঝুঁকিতে আছে। কারণ, দুই দেশের মাঝে নিয়মিতই যোগাযোগ রয়েছে।

ডব্লিউএইচও’র বক্তব্য
২০০২ সালে বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশে ভাইরাসজনিত রোগ সার্স (ঝঅজঝ) ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় এতে প্রায় ৮১৩ জনের মৃত্যু হয় এবং আক্রান্ত হয় প্রায় সাড়ে ৮ হাজার মানুষ। একইভাবে ২০১২ সালে ২৭টি দেশের প্রায় আড়াই হাজার মানুষ আক্রান্ত হয় নতুন আরেক ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ মার্স (গঊজঝ) দ্বারা, যেখানে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৫০ জন মানুষের মৃত্যু হয়।
ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের (ডঐঙ) প্রধান ট্রেডরস আধানম গ্রেব্রেইস সাম্প্রতিককালে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে বলেছেন, ‘এটা চায়নার জন্য একটি জরুরি অবস্থা। তবে এটাকে মহামারি ঘোষণার সময় এখনো আসেনি।’

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাতে বলা হয়েছে, আক্রান্ত হওয়ার সর্বোচ্চ ১৪ দিনের মধ্যে রোগটি দেখা দিতে পারে। তাই আক্রান্ত দেশ থেকে আসার ১৪ দিনের মধ্যে জ্বর (১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি), গলাব্যথা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দেহে করোনা ভাইরাস (২০১৯-হঈড়ঠ) সংক্রমণের আশঙ্কা থাকতে পারে। তখন যেসব সতর্কতা মানতে হবেÑ
ক্স আক্রান্ত ব্যক্তি হতে কমপক্ষে দুই হাত দূরে থাকতে হবে।
ক্স আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে কিংবা সংক্রমণস্থলে গেলে প্রয়োজনমতো সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।
ক্স ভ্রমণকালীন জীবিত অথবা মৃত গৃহপালিত ও বন্য প্রাণী থেকে দূরে থাকতে হবে।
ক্স হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রেখে কাশি দিতে হবে এবং পরে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।
ক্স যেখানে-সেখানে কফ ফেলা যাবে না।

শেষ কথা
সর্দি-কাশি হলেই যে সেটা করোনা ভাইরাস কেস হবে, এমনটি নয়। কারণ এখন সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত সর্দি-জ্বর, ঠা-া-কাশিপ্রবণ একটি সময়। যেহেতু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত উহান করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এমন কোনো কেস রিপোর্ট হয়নি, তাই এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, এই সমস্যা প্রতিকারযোগ্য নয়, তবে প্রতিরোধযোগ্য।