আন্তর্জাতিক

বহুল আলোচিত ব্রেক্সিট চুক্তি পাস: ইইউ থেকে বের হলো ব্রিটেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিপুল ভোটে পাস হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার বহুল আলোচিত ব্রেক্সিট চুক্তি। এর মাধ্যমে ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পথে সব বাধা দূর হলো। ২৯ জানুয়ারি ব্রাসেলসে বিতর্কের পর ৭৫১ ভোটের মধ্যে ব্রেক্সিট প্রত্যাহার চুক্তির পক্ষে ৬২১টি আর বিপক্ষে ৪৯টি ভোট পড়ে। ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ছাড়ল ব্রিটেন।
চুক্তিটি পাস হওয়ার পর ব্রিটেনের কয়েকজন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য (এমইপি) উল্লাস প্রকাশ করলেও অন্য দেশের এমইপিরা ছিলেন নীরব, শোকাহত। বেশ কয়েকজন এমইপি বলেছেন, তারা আশাবাদী যে যুক্তরাজ্য আবারও জোটে ফিরবে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট ডেভিড স্যাসুলি বলেন, ‘ব্রেক্সিটের ফলে সংসদ সদস্যরা গভীরভাবে মর্মাহত। ব্রিটেন হয়ত ইইউ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তারপরও তারা ইউরোপের অংশ হয়ে থাকবে।’
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লিয়েন বলেছেন, ‘আমরা সবসময় তোমাদের (ব্রিটেন) ভালোবেসে যাব।’
ব্রিটেনের এই বিদায়ক্ষণে বেশকিছু এমইপি গানও গেয়েছেন। অন্যরা পরেছিলেন ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী ‘সর্বদা ঐক্যবদ্ধ’ স্কার্ফ।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের জুনে গণভোটের মাধ্যমে ব্রিটেনের ইইউ ছাড়ার প্রস্তাব পাস হয়। যদিও এই ব্রেক্সিট নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে পরপর ক্ষমতা ছাড়তে হয় দেশটির ২ জন প্রধানমন্ত্রীকেও।
ঘোষণা অনুযায়ী ৩১ জানুয়ারি রাত ১১টায় ৪৭ বছর পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলো ব্রিটেন। তবে আগামী ১১ মাস পরিবর্তনকালীন সময় বা ট্রানজিশনাল পিরিয়ড হিসেবে বিবেচিত হবে। আর এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাজ্য ইইউ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং ইইউকে অর্থ প্রদান করবে।

একনজরে ব্রেক্সিটের কারণে ব্রিটেনে যেসব পরিবর্তন আসবে
১. ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যপদ হারাবেন যুক্তরাজ্যের এমপিরা: নাইজেল ফারাজ এবং অ্যান উইড্ডেকমবের মতো পরিচিত মুখগুলোসহ যুক্তরাজ্যের ৭৩ জন সদস্য ছিলেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে। ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার ফলে তারা সদস্যপদ হারাবেন। কারণ, যুক্তরাজ্য একই সাথে ইইউর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও এজেন্সিগুলোও ছেড়ে যাচ্ছে। তবে যেহেতু যুক্তরাজ্য অন্তর্বর্তী সময়ে ইইউর আইনকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে সেহেতু ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ জাস্টিস আইনি সমস্যাগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত দেয়া অব্যাহত রাখবে।
২. ইইউ সামিটে আর নয়: ভবিষ্যতে যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিল সামিটে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন অংশ নিতে চান তাহলে তার জন্য দরকার হবে বিশেষ আমন্ত্রণ। ব্রিটিশ মন্ত্রীরাও এখন থেকে আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মিত বৈঠকগুলোতে অংশ নিতে পারবেন না।
৩. বাণিজ্য বিষয়ে অনেক কিছু শোনা যাবে: যুক্তরাজ্য তাদের পণ্য ও সেবা বিক্রি বা এসব কেনার জন্য নতুন নিয়ম ঠিক করতে বিশ্বের যেকোনো দেশের সাথে আলোচনা শুরু করতে পারবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য থাকার সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর সাথে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য আলোচনা করতে পারতো না যুক্তরাজ্য। ফলে ব্রেক্সিট সমর্থকরা এখন বলছেন, নিজের বাণিজ্যনীতি ঠিক করার স্বাধীনতা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
৪. যুক্তরাজ্যের পাসপোর্টের রঙ পরিবর্তন হবে: নীল রঙের পাসপোর্ট আবার ফিরে আসবে ৩০ বছর পর। ২০১৭ সালে এ পরিবর্তনের কথা ঘোষণা দিয়ে তখন অভিবাসনমন্ত্রী ব্রান্ডন লুইস দেশটির ঐতিহ্যবাহী নীল ও সোনালি ডিজাইনের পাসপোর্ট আবার ফিরিয়ে আনার কথা বলেছিলেন। এ পাসপোর্ট প্রথম ব্যবহার শুরু হয়েছিল ১৯২১ সালে। তবে বর্তমান যে পাসপোর্ট আছে সেটিও বৈধ থাকবে।
৫. ব্রেক্সিট কয়েন: প্রায় ৩০ লাখ বিশেষ কয়েন আসবে যেখানে ৩১ জানুয়ারি এবং ‘পিস, প্রসপারিটি অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ উইথ অল নেশনস’ লেখা থাকবে। তবে এ কয়েনকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে তারা এ কয়েন বর্জন করবে। তবে সরকার একই ধরনের আরেকটি কয়েন আনার পরিকল্পনা করছে যেখানে উল্লেখ থাকবে ৩১ অক্টোবর, যে তারিখে প্রকৃতপক্ষে ব্রেক্সিট কার্যকরের কথা ছিল।
৬. বন্ধ হবে যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট ডিপার্টমেন্ট: ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে যুক্তরাজ্যের যে বিভাগ আলোচনা চালিয়েছিল সেই বিভাগটি বন্ধ হয়ে যাবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী টেরেজা মে’র সময়ে ২০১৬ সালে ওই বিভাগটি চালু করা হয়েছিল। সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাজ্যের নেগোসিয়েশন টিম হবে ডাউনিং স্ট্রিট অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর অফিসভিত্তিক।
৭. জার্মানি কাউকে যুক্তরাজ্যে প্রত্যর্পণ করবে না: সন্দেহভাজন অপরাধী যদি কেউ যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে গিয়ে জার্মানিতে আশ্রয় নেয় তাহলে তাকে ফেরত পাবে না যুক্তরাজ্য। কারণ জার্মান সংবিধান অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের নাগরিককে প্রত্যর্পণের সুযোগ নেই।
যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বলছে, ইউরোপিয়ান অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে অন্তর্বর্তী সময় পর্যন্ত।

ব্রেক্সিট কার্যকরের পরও যেসব বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আসবে না
১. ভ্রমণ: অন্তর্বর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা ভ্রমণের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের লাইনেই দাঁড়াতে পারবেন।
২. ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পেট পাসপোর্ট: এগুলোর বৈধতা অব্যাহত থাকবে।
৩. ইউরোপিয়ান স্বাস্থ্য বীমা কার্ড: অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনায় চিকিৎসার ক্ষেত্রে এ কার্ড দিয়েই যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকবেন।
৪. ইউরোপীয় ইউনিয়নে বসবাস ও কাজ: অন্তর্বর্তী সময়ে চলাচলের স্বাধীনতা অব্যাহত থাকবে। তাই যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা ইইউভুক্ত দেশে বসবাস ও কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। ইইউভুক্ত অন্য দেশের নাগরিকরাও একই সুবিধা পাবে যুক্তরাজ্যে।
৫. পেনশন: ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অন্য দেশে বসবাসরত যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা রাষ্ট্রের পেনশন সুবিধা পাবেন।
৬. বাজেটে অবদান: ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজেটে অন্তর্বর্তী সময়েও অবদান রেখে যাবে যুক্তরাজ্য।
৭. বাণিজ্য: যুক্তরাজ্যের সাথে ইইউর বাণিজ্য অব্যাহত থাকবে নতুন কোনো চার্জ আরোপ ছাড়াই।