অর্থনীতি

বিডিএফ সম্মেলনে সহজ শর্তে ঋণ ও বিনিয়োগ চাইলো বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘কার্যকর অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে টেকসই উন্নয়ন’ স্লোগান সামনে রেখে ঢাকায় বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (বিডিএফ) ২ দিনব্যাপী বৈঠক ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়।
এবার বিডিএফ সম্মেলনে উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে ৪২৫ কোটি ডলারের অর্থসহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
বৈঠকের প্রথম দিনে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও বিনিয়োগ চাওয়া হয়। এছাড়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কার্যকর অংশীদারিত্ব দাবি করে বলা হয়, এতে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।
দারিদ্র্য দূরীকরণ ও দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে নিয়ে যেতে এখন অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বলা হয়েছে, কার্যকর অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে পুরোপুরিভাবে এসডিজি অর্জনে সাফল্য পাবে বাংলাদেশ।
২৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিডিএফ বৈঠকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বাংলাদেশের উন্নয়নে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা যে সমস্ত পদক্ষেপ নিয়েছি আমি আশা করি উন্নয়ন সহযোগীরাও আমাদেরকে খুব বেশি শর্ত না দিয়ে এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন, যেন যে অগ্রযাত্রা আমরা শুরু করেছি সেটা আমরা আরও ভালোভাবে করতে পারি।’
বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নে কোনো ম্যাজিক নেই মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা হচ্ছে একটা রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এই দেশ আমরা স্বাধীন করেছি দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। সাধারণ মানুষ, দরিদ্র মানুষ, তৃণমূল পর্যায়ের অবহেলিত মানুষ- সেই মানুষগুলোর ভাগ্য পরিবর্তন করাই হলো আওয়ামী লীগ সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি বলেই আজকের বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।’
দেশের উন্নয়নে নেয়া ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরেন টানা তিন মেয়াদে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব সামলে আসা শেখ হাসিনা। ২০২১ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কিভাবে উন্নত হবে, কোন কোন ক্ষেত্রকে সরকার গুরুত্ব দেবে এবং কিভাবে দেশের মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের জীবন উন্নত করা যাবে, সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বক্তব্যশেষে প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের ৪টি কর্ম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
বিডিএফের এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইউএনডিপি, এআইআইবি, জাইকাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশের মোট ৭০০ প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। শেরেবাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এবারের বৈঠক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। সম্মেলনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন। উন্নয়ন সহযোগীদের সংগঠন লোকাল কনসালটেটিভ গ্রুপের (এলসিজি) পক্ষে জাতিসংঘ আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া সেপ্পো এবং ইআরডি সচিব মনোয়ার আহমেদ কো-চেয়ারের দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া সম্মেলনে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ২ দিনে মোট ৮টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের আলোচনার বিষয়গুলো ছিল- বেসরকারি খাতকে উন্নয়নে অংশগ্রহণ ও বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অর্থায়ন, স্বনির্ভর বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থা, গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে সবার জন্য সুযোগ তৈরি করা, স্বাস্থ্যসেবা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা প্রদান, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা, টেকসই নগর, ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর সুরক্ষায় সেবা দেয়া এবং সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি।
এবারের বৈঠকটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে। ৩০ জানুয়ারি সম্মেলনের ৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের বৈঠক নিয়ে আশাবাদী ইআরডি।
সংস্থাটি জানায়, উন্নয়নে অর্থায়ন একটি বড় ব্যাপার। দাতা দেশগুলো সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ দিলে দ্রুত বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু দাতারা বেশিরভাগ সময় ঋণ প্রদানে কঠিন শর্ত আরোপ করে থাকে। এতে সমস্যা তৈরি হয়। রূপকল্প-২১, রূপকল্প-৪১, মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন করতে হলে সহজ শর্তের ঋণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সরকার দাতা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্মেলনের প্রথম দিনে জাইকার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জুনিচি ইয়ামাদা, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্টউইগ শেফার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট শিক্সিন চেনসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেতারাসহ ৩০-৪০ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
বিডিএফের মূল প্রবন্ধ হিসেবে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। প্রথম দিনে ৪টি অধিবেশনে পৃথকভাবে অংশগ্রহণ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান, পরিবেশ ও বন মন্ত্রী মো. শাহাবউদ্দিন, কেবিনেট সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম, বেজা’র নির্বাহী পরিচালক পবন চৌধুরী, পানিসম্পদ সচিব কবির বিন আনোয়ারসহ দাতা সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
এদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরাম এবার এমন একটি সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের বিভিন্ন মাপকাঠিতে এগিয়ে চলেছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একইসঙ্গে সরকার অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনে কাজ করছে সরকার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এবার ফোরামে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার রূপরেখা, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে সরকারের পদক্ষেপগুলো বা বিভিন্ন আর্থসামাজিক অগ্রাধিকার খাতে সরকারের মধ্যম মেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে তুলে ধরা হয়।