প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

রাজউক নিয়ে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন : গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের তীব্র প্রতিবাদ : পরিকল্পিত নগরায়ণে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ

বিশেষ প্রতিবেদক : আধুনিক আবাসন গড়া ও ঢাকা শহরের উন্নয়নে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভূমিকা রাখা প্রতিষ্ঠান রাজউক। শুরুতে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) নাম থাকলেও পরবর্তীতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমেও নানা বৈচিত্র্য যোগ হয়। রাজনৈতিক পালাবদল এবং অতীতে ক্ষমতাসীনদের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে এটি ঘুরে দাঁড়ায়; রূপ নেয় একটি কার্যকর উন্নয়নূলক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে। বৃদ্ধি পায় কার্যপরিধি, যার ধারাবাহিকতায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের একটি বিশাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে দৃশ্যমান হয় রাজউক। নগরবাসীর কাছে বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান রাজউক।
সম্প্রতি বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই)-এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রশ্ন তুলেছে রাজউকের কর্মকা- নিয়ে। রাজউককে নিয়ে সংস্থাটির অভিযোগ নিয়ে এখন উঠেছে পাল্টা প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিআইবির দাবি বস্তুনিষ্ঠ তো নয়ই, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। স্বয়ং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী রেজাউল করিম এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, টিআইবির অভিযোগ অনুমানভিত্তিক, যার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

শুরু থেকে রাজউক
১৯৪৭ সালে ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানীতে পরিণত হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ আসতে শুরু করে ঢাকায়। গড়ে উঠতে থাকে সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভবনসহ শিল্প-কারখানা। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ বাড়তে থাকে; সমান তালে বৃদ্ধি পায় ঢাকামুখিতা। ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়ে জনসংখ্যা ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে থেকে বেড়ে হয় ১২ লাখ।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে ঢাকা হয়ে ওঠে দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর অন্যতম। বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা দেড় কোটিরও বেশি।
উন্নয়নের অপরিহার্য একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজউকের এখনকার অবস্থান এক দিনে হয়নি। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এই দুই শহরের আশপাশের কিছু এলাকায় উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণের উদ্দেশ্যে ১৯৫৩ সালের টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। মূলত ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহের দ্রুত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ডিআইটির প্রশাসনিক ও আইনগত কাঠামো সংশোধন জরুরি হয়ে পড়ে। সেই লক্ষ্যে টাউন ইমপ্রুভমেন্ট (সংশোধনী) আইন ১৯৮৭ প্রণীত হয়, যার মাধ্যমে ডিআইটিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হিসেবে রূপান্তর করা হয়। এই আইনের অধীনে পুনর্বিন্যাসকৃত সংস্থাটির কার্যক্রমের ভৌত এলাকা ১৯৯১ সালে প্রায় ৭ মিলিয়ন জনসংখ্যা অধ্যুষিত (ডিআইটির আওতাভুক্ত) ৩২০ বর্গমাইলের এলাকা থেকে ৫৯০ বর্গমাইলে উন্নীত করা হয়।
আইন অনুযায়ী, একজন চেয়ারম্যান এবং অনূর্ধ্ব ৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডের মাধ্যমে রাজউক পরিচালিত হয়। রাজউকের চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এবং সদস্যরা যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার। চেয়ারম্যান হচ্ছেন রাজউক-এর প্রধান নির্বাহী। উন্নয়ন ও প্রকৌশল, সম্পত্তি ও ভূমি, অর্থ, বাজেট ও হিসাব, পরিকল্পনা ও স্থাপত্যের মতো স্বতন্ত্র ৫টি বিভাগ গঠন করে রাজউকের বোর্ডের সব সদস্যকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্বভার দিয়ে সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা করা হয়েছে।
রাজউকের সর্বশেষ চেয়ারম্যান মো. সাঈদ নূর আলম, যিনি গত ১৩ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

পরিকল্পিত নগরী: উন্নয়ন অগ্রযাত্রায়
অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান রাজউক
পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা রাজউকের অন্যতম লক্ষ্য। ঢাকা মহানগরীর জন্য টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে প্রধান ভূমিকা পালন করে এ প্রতিষ্ঠান। বিদ্যমান বিধিবিধানের আলোকে ঢাকাকে আধুনিক ও পরিকল্পিত মহানগরী হিসেবে গড়ে তোলার নানামুখী কর্মযজ্ঞে নিয়োজিত রয়েছেন রাজউক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরিকল্পনা প্রণয়ন, ব্যক্তিবিশেষ ও প্রকল্পের জন্য ভূমিব্যবস্থার ছাড়পত্র প্রদান এবং ইমারতের নকশা অনুমোদন করে থাকে রাজউক। ঢাকার উন্নয়নে উপ-শহর ও নতুন শহর প্রকল্প, পরিকল্পিত উপায়ে আবাসিক প্লট ও ফ্ল্যাট প্রকল্প, সাইট অ্যান্ড সার্ভিস প্রকল্প, বাণিজ্যিক ও শিল্পনগরী তৈরি, রাস্তা, ফ্লাইওভার, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ, বিদ্যমান সড়ক প্রশস্ত করা ও উন্নয়ন, বাজার, শপিং সেন্টার, কার পার্কিং, ধর্মীয় স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, উন্মুক্ত স্থান, জলাধার, পার্ক, খেলার মাঠ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন প্রকল্প, সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প ইত্যাদি জনহিতকর কাজ করে থাকে রাজউক।
১৯৫৯ সালে ঢাকার উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রণীত মহাপরিকল্পনা সংশোধন করে এবং বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয় রাজউক। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বনানী-বারিধারা উন্নয়ন প্রকল্প (১৯৯০); রাজউক কর্মচারীদের জন্য আবাসিক প্রকল্প (১৯৯০); কারওয়ান বাজার, মহাখালী এবং পোস্তগোলার উন্নয়ন; ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও রেলপথের নিচু জমির উন্নয়ন; উত্তরা আদর্শ আবাসিক এলাকা, সোনারগাঁ হোটেল এলাকার উন্নয়ন; জহুরা মার্কেট-এর পার্শ্ববর্তী বস্তি অপসারণ ও ভূমি উন্নয়ন; মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার উন্নয়ন এবং বহু সংযোগ সড়ক নির্মাণ। এসব প্রকল্পের পাশাপাশি রাজউক-এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিকল্পনাধীন আরও বহু প্রকল্প রয়েছে।
১৯৯৫ সালে নতুন আঙ্গিকে মহানগরীর ৫৯০ বর্গমাইল (১৫২৮ বর্গকিমি) এলাকা নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি) এবং ১৯৯৫-২০১৫ শীর্ষক দ্বিতীয় মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। ডিএমডিপি প্রকল্প তিন স্তরে বিভক্ত ছিল Ñ স্ট্রাকচার প্ল্যান, আরবান এরিয়া প্ল্যান এবং ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)। আরবান এরিয়া প্ল্যানে রাজউকের আওতাধীন বিদ্যমান শহরাঞ্চলের উন্নয়নের নীতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ডিএমডিপি প্রদত্ত কাঠামো ব্যবহার করে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে, যা ২০১০ সালের ২২ জুন সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে। এই পরিকল্পনায় স্ট্রাকচার প্ল্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা মহনগরীর বিভিন্ন জোনের জন্য বিশদ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন ধারা, প্রস্তাবিত সড়কসমূহের অবস্থান ও লে-আউট অবকাঠামো, নাগরিক সুবিধা এবং ভূমি ব্যবহার জোনসমূহের তথ্যসংবলিত এই পরিকল্পনার সময়সীমা ছিল ২০১৫ সাল পর্যন্ত। বর্তমানে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সময়ের দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে।
উন্নয়ন পরিকল্পনার আলোকে রাজধানী ঢাকার জনসাধারণের জন্য রাজউক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থায়ন করে থাকে। রাজউকের প্রকল্পগুলোর মধ্যে গুলশান মডেল টাউন, বনানী মডেল টাউন, বারিধারা আবাসিক ও কূটনৈতিক এলাকা; নিকুঞ্জ (১ ও ২), উত্তরা (১ম, ২য় ও ৩য় পর্ব), পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প, ঝিলমিল আবাসিক এলাকা, উত্তরায় ২২ হাজার ৫১২টি ফ্ল্যাট নির্মাণ, বেগুনবাড়ি খালসহ হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প, গুলশান-বনানী-মহাখালী লেক ও গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প, গুলশান-১ এ নির্মিত বহুতল কার পার্কিং কাম অফিস ভবন, সকল মানচিত্র, নথি ও কাগজপত্রের ডিজিটাল ভার্সনে রূপান্তর, কুড়িল-বিশ্বরোড সংযোগস্থলে উড়াল সড়ক নির্মাণ, সম্প্রসারিত বিজয় সরণি প্রকল্প ইত্যাদি।

সবার জন্য আবাসন: নতুন শহর গড়ছে রাজউক
রাজধানীর ক্রমবর্ধমান আবাসন চাহিদা পূরণে নতুন নতুন শহর গড়ছে রাজউক। ঢাকার তুরাগ তীর ও কেরানীগঞ্জে দুটি পরিবেশবান্ধব শহর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিবেশগত সমীক্ষা করতে রাজউক ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। তুরাগ নদের বন্যা প্রবাহ অঞ্চল সংরক্ষণ এবং কমপ্যাক্ট টাউনশিপ উন্নয়ন প্রকল্প এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জে প্রস্তাবিত ওয়াটারফ্রন্ট স্মার্ট সিটি শীর্ষক প্রকল্পের জন্য এই সমঝোতা স্মারক সম্প্রতি স্বাক্ষর হয়।
রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করেই এই শহর গড়ে তোলা হবে। কারণ স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকৃতিকে রক্ষা করাটা পরিকল্পিত নগরায়ণের পূর্বশর্ত। মূলত উন্নয়নের ১০০ বছরের ডেল্টা প্ল্যান সামনে রেখে এই প্রকল্প নেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রধান ফোকাস হলো প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা বাস্তবায়ন।
তুরাগ টাউনশিপ প্রকল্পে প্রায় ৭০ শতাংশ ভূমি জলাশয় ও ইকোসিস্টেমের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। মাত্র ৩০ শতাংশ ভূমি টাউনশিপের জন্য ব্যবহার করা হবে। প্রকল্পে যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হবে তাদের কেউ প্লট বা ফ্ল্যাট থেকে বঞ্চিত হবেন না। ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন দিয়েছেন।

পূর্বাচল নতুন শহর : চাপ কমবে ঢাকার ওপর
পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলায় রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর নিয়ে এখন মানুষের অনেক আগ্রহ। নতুন এ শহরে ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ বসবাস করতে পারবে।
রাজধানীর পাশেই আধুনিক সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করে শহরটি হওয়ায় ঢাকা মহানগরীতে জনসংখ্যার চাপ কমবে বলে মনে করেন নগরবিদরা। ইতোমধ্যে এই আবাসিক এলাকায় বেশকিছু ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। দেয়া হচ্ছে বিদ্যুৎ সংযোগ। গ্যাস সংযোগের কার্যক্রমও চলছে। এখন বিভিন্ন সেক্টরে ভবন স্থাপনের জন্য নকশার অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। আধুনিক এই নগরীতে থাকছে সবুজ ছায়াঘেরা পরিবেশবান্ধব নির্মল জীবনের সুযোগসুবিধা।
কুড়িল বিশ্ব রোড থেকে ৩০০ ফিট সড়ক পেরিয়ে বালু নদীর ব্রিজের পর শুরু এই নতুন শহরের। ৬ হাজার একরের এই শহর ৩০টি সেক্টরে ভাগ করা। আছে ৩, ৫, সাড়ে ৭ ও ১০ কাঠার প্লট। ২৫ হাজার ১১৫টি আবাসিক এবং সাড়ে ৩ হাজার বাণিজ্যিক ও অন্যান্য প্লট রয়েছে এখানে। মালিকানা হস্তান্তর করা হয়েছে ২০ হাজার প্লটের।
পূর্বাচল নতুন শহরে কোনো যানজট থাকবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে অর্থাৎ কুড়িল থেকে বালু নদী পর্যন্ত ১০০ ফুট চওড়া খাল খনন ও উন্নয়নকাজ এগিয়ে চলেছে।
কর্মকর্তারা জানান, সার্ভিস রোডের বর্তমান অবস্থানের কারণে আগের চেয়ে বেশি মানুষ সুবিধা পাবেন। ৩০০ ফুট রোডের উত্তর-দক্ষিণে রাজউকের ড্যাপের ৩টি প্রস্তাবিত সড়কও রয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প এলাকার খুব কাছেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ট্রাফিক জ্যামের কোনো সুযোগ থাকবে না।
রাজউক সূত্র জানিয়েছে, ১৩.৬৪৩ কিলোমিটার খাল খনন, ২৪.৬ কিলোমিটার সার্ভিস রোড, ৩৭.৬ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, ৮টি এটড্রেড ইন্টারসেকশন ও একটি ড্রেড সেপারেটর ইন্টারসেকশন, খালের ওপর ৪টি আর্চ ব্রিজ, ৪টি এক্সপ্রেসওয়ে ফুটওভার ব্রিজ, ১২.৩ কিলোমিটার ৮ লেনের এক্সপ্রেসওয়ে, একটি পাম্প হাউজ, ২ হাজার ২৭০টি স্ট্রিট লাইট, ৭ হাজার ৮০০ লিনিয়ার মিটার স্ট্রম স্যুয়ারেজ লাইন, বোয়ালিয়া ও এডি-৮ খালের উভয় পাশে ওয়াকওয়েসহ খাল খনন ও বাঁধ নির্মাণ, ২৬ কিলোমিটার কনক্রিট পাইল দ্বারা স্যুয়োর প্রটেকশন এবং ১৩ কিলোমিটার ঘাস ও গাছ লাগানোর মাধ্যমে প্রকল্প এলাকা দৃষ্টিনন্দন করা হবে।

চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগুচ্ছে রাজউক
নিশ্চিত করা হচ্ছে জবাবদিহিতা
রাজধানী প্রতিনিয়তই সম্প্রসারিত হওয়ায় রাজউকের সামর্থ্য আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন নগর বিশেষজ্ঞরা। কারণ শুধু উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ নয়, মনিটর করাও এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। ভবন নির্মাণকারীরা যে নকশার অনুমোদন পান, সেই অনুযায়ী নির্মাণকাজ করছেন কি না সেটা এখন নিয়মিত মনিটর করে রাজউক। ব্যত্যয় ঘটলে দ্রুত নির্মাণকারীকে নোটিশ দেয়াসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ভেঙে দেয়া হচ্ছে অননুমোদিত অংশ।
রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অতীতে নানা ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, অনেক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে অনুমোদন ছাড়াই। অনেকগুলোর অনুমোদন নেয়া হয়েছে, কিন্তু নির্মাণের সময় অনুমোদিত নকশা মানা হয়নি। রাজউক এসব ভবন চিহ্নিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে ভবনের নিচতলায় গাড়ি রাখার ব্যবস্থার কথা নকশায় আছে, কিন্তু তা না করে জায়গা অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। চারতলা বা ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে আট-নয়তলা বানানোর অনেক নজির রয়েছে। বারান্দার বর্ধিতাংশ নির্মাণ করা হয়েছে, যা নকশায় নেই। রাজউক এগুলো চিহ্নিত করে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী সবাইকে আইনের আওতায় আনছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে মালিক-কর্তৃপক্ষ আদালতে গিয়ে স্থিতাবস্থা নিয়ে নির্মাণকাজ চালিয়ে যায়। রাজউককেও আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় শামিল হতে হয়, এভাবে চলে যায় দীর্ঘ সময়। রাজউকের জন্য এটি বড় একটি চ্যালেঞ্জ। সেইসঙ্গে লোকবল আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মনে করেন রাজউকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
তবে পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। বর্তমান গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের দৃঢ় পদক্ষেপে রাজউক আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। বাড়ানো হচ্ছে লোকবলসহ নানা দক্ষতা। ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ। এরই মধ্যে অনেক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাজউকের মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে, যাতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বসবাসযোগ্য সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব মহানগরী গড়ে তোলার ভিশন রাজউকের। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঠেকাতে দীর্ঘ দিন ধরে গড়ে ওঠা অবৈধ রিয়েল এস্টেট কোম্পানির তৎপরতায় লাগাম টানছে রাজউক। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এক্ষেত্রে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারী, যাদের কারণে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে তাদের বদলি, বরখাস্ত এমনকি গুরুতর অপরাধ হলে চাকরিচ্যুত কিংবা বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে।

টিআইবির অভিযোগ ও বাস্তবতা
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর কড়া জবাব
বহুমুখী সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে রাজউক যখন সরকারের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে ব্যাপক অবদান রাখছে, তখনই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি অভিযোগ তুলেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। টিআইবির দাবি, রাজউক জনবান্ধব না হয়ে জনবিরোধী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
টিআইবির এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, অনুমানভিত্তিক অভিযোগ এনে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান রাজউককে হেয় করা হয়েছে।
অপরদিকে গত ১৩ জানুয়ারি রাজউক চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করা অতিরিক্ত সচিব মো. সাঈদ নূর আলম বলেছেন, পরিকল্পিত নগরায়ণে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করছে রাজউক। সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো রাজউকেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বলবৎ আছে। তাই রাজউকে এখন আগের মতো দুর্নীতি করার সুযোগ নেই।
টিআইবি গত ২৯ জানুয়ারি ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, রাজউক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হলেও গরিবের আবাসন নিশ্চিত করতে পারেনি, বরং তারা এখন মুনাফাখোর ব্যবসায়ীর ভূমিকা পালন করছে। রাজউকে ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র, নকশা অনুমোদন ও বাস্তবায়ন সম্পর্কিত সেবা পেতে বিভিন্ন পর্যায়ে একজন ব্যক্তিকে ২ হাজার থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা এবং আবাসন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ২ হাজার থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া প্রকল্প সম্পর্কিত সেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করে রাজউকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রাজউকের কর্মকর্তা, দালাল ও সেবাগ্রহীতাদের একাংশের যোগসাজশের মাধ্যমে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে। রাজউকে ৯ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, চেয়ারম্যানের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। পছন্দনীয় স্থান বা পদে ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৩০ হাজার থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূতভাবে লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
টিআইবির এসব অভিযোগকে ‘ঢালাও’ বলে মন্তব্য করেছেন রাজউকের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্টভাবেই সেই তথ্য দেয়া উচিত। গড়পরতা অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণœ হয়।
রাজউকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ করে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, ‘সরকারি সকল প্রতিষ্ঠান জনহয়রানির প্রতিষ্ঠান নয়, জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা করছি। দৃশ্যমান অনেক পরিবর্তন হয়েছে, যা ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমেও এসেছে। মন্ত্রণালয়াধীন দপ্তরসমূহে যেখানেই অনিয়ম পাচ্ছি সেখানেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করছি যেন কোনোভাবে ন্যূনতম দুর্নীতিও না থাকে।’
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী আরো বলেন, ‘গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন রাজউকের বিরুদ্ধে টিআইবি কর্তৃক আনীত অভিযোগের তথ্য কোনোভাবে সত্য নয়। এর কোনো ভিত্তি নেই এবং এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জনবান্ধব একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কারো দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে হেয় প্রতিপন্ন করে আলাদা বাহবা নেয়ার চেষ্টা করেছে টিআইবি। আমি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে বিশেষ কোনো প্রকল্পের অনুমোদনই হয়নি। সুতরাং এ সংক্রান্ত ঘুষ দেয়ার তথ্য সঠিক নয়।’
নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনীতির প্রভাবসংক্রান্ত টিআইবির অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি মন্ত্রী হওয়ার পর রাজউকে কোনো নিয়োগ হয়নি। শুধু আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। টিআইবি বলেছে, ফ্ল্যাটের চাবি প্রদানের ক্ষেত্রে টাকা দিতে হয়। উত্তরায় ফ্ল্যাট বরাদ্দ অনলাইন পদ্ধতিতে করে সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে লটারির মাধ্যমে চাবি দেয়া হয়েছে।’
ভূমির ছাড়পত্র, আমমোক্তারনামার ক্ষেত্রে টাকা প্রদানের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘রাজউকে আইন করে দিয়েছি, নির্ধারিত সময়ের ভেতরে সেবা প্রদান করতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা অটোমেশন চালু করেছি। এক্ষেত্রে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ আসার যৌক্তিকতা নেই।’
শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘রাজউকে কঠোর অবস্থান নেয়া হয়েছে। একটা সময় রাজউক দালাল পরিবেষ্টিত ছিল। বেশকিছু দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। কোনো দালালের দৃশ্যমান উপস্থিতি এখন রাজউকে নেই। তারপরও সুনির্দিষ্ট কারো বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা টিআইবি বললে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতাম। আমি আশা করি, টিআইবি এ জাতীয় অভিযোগ আনার আগে আমাদের জানাবে কার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী অভিযোগ পেয়েছে।’
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছেন। আমরা সেটাকে কঠোরভাবে ধারণ করেছি। যেসব দুর্নীতির অভিযোগ ছিল তার অধিকাংশ আমরা বিনাশ করেছি। টিআইবিসহ অন্যদের বলব, শুধু অনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন নয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও সমাধানের সুনির্দিষ্ট তথ্য দিন। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর আমি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ৯২ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি।’
এর আগে পরিকল্পিত আবাসন গড়তে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম স্বদেশ খবরকে বলেছিলেন, ‘শুধু ইট-সুরকির দালান দিয়ে নগর গড়ে তোলা সরকারের লক্ষ্য নয়, বরং সব নাগরিকের জন্য পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব আবাসন নিশ্চিত করাই সরকারের অঙ্গীকার। এ আলোকে পরিকল্পিত নগর, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন Ñ এ ভিশনকে সামনে রেখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রাজউক কাজ করে যাচ্ছে। পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তুলতে সরকার তথা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়াধীন রাজউক নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেযোগ্য হলো সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে সরকারি অব্যবহৃত জমিতে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ, পুরাতন বা পরিত্যক্ত ভবন অপসারণ করে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ, জমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্প গ্রহণ, পরিবেশবান্ধব টেকসই আবাসন নিশ্চিতে আবাসিক ভবনগুলোয় স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সোলার প্যানেল, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয় সংযুক্ত করা, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় (মাস্টার প্ল্যান) বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় আবাসনের জন্য ভূমির প্রস্তাবনা, অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিচ্ছিন্ন আবাসনের পরিবর্তে গুচ্ছ গুচ্ছ আবাসন নীতিমালা প্রণয়ন, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ব্লকভিত্তিক নির্ধারিত উচ্চতায় পরিকল্পিত ভবন নির্মাণ প্রকল্প।’
সরকারের চলমান প্রকল্প সম্পর্কে শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘এই সময়ে সরকারের চলমান প্রকল্পগুলো হলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন পূর্বাচল নতুন শহর, উত্তরা তৃতীয় পর্বে উত্তরার ১৮নং সেক্টরে ২১৪ একর জমিতে ১৫ হাজার ৩৬ ফ্ল্যাট নির্মাণ, ঝিলমিল রেসিডেন্সিয়াল পার্কে ৮৫টি বহুতল ভবনে ১৩ হাজার ৭২০টি ফ্ল্যাট নির্মাণ, গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন, কুড়িল-পূর্বাচল লিঙ্ক রোডের উভয় পার্শ্বে (কুড়িল হতে বালু নদ পর্যন্ত) ১০০ ফুট চওড়া খাল খনন ও উন্নয়ন, হাতিরঝিল প্রকল্পের দূষিত পানি পরিশোধন, উত্তরা লেক উন্নয়ন, ঢাকার গুলশান, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া ও ধানমন্ডি এলাকার ৯টি পরিত্যক্ত বাড়িতে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ প্রকল্প।

ভিত্তি নেই টিআইবির দাবির
রাজউকের বিরুদ্ধে এবারই যে প্রথম টিআইবি দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে, এমন নয়। এর আগেও টিআইবি এমন অভিযোগ করেছে। তবে সংস্থাটির বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের সময়ে এই প্রথম টিআইবি অভিযোগ উত্থাপন করলো। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী এর প্রতিবাদও করেছেন। টিআইবির প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র ১৫ দিন আগে রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মো. সাঈদ নূর আলমও টিআইবির প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করেছেন।
জানা যায়, যে কয়জন মন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ বাস্তবায়নে অগ্রপথিক হিসেবে আছেন, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম তাদের অন্যতম। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়াধীন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক); জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ বাস্তবায়নে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর রাজউক ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে দুর্নীতি অনেক কমে এসেছে।
ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) নিয়েও বিস্তৃত পর্যায়ে কাজ করছেন শ ম রেজাউল করিম। মন্ত্রী এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, ড্যাপকে হালনাগাদকরণের লক্ষ্যে রাজউকে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (২০১৬-৩৫) চূড়ান্তকরণের কাজ চলমান। নতুন ড্যাপে ঢাকা মহানগরীর উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জন্য জনঘনত্ব জোনিং, জোনভিত্তিক/ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, স্কুল জোনিং, মেট্রোরেল স্টেশনগুলো, পরিকল্পিত শিল্প এলাকা নির্ধারণ, জলাশয়, কৃষি ভূমি ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের জন্য উন্নয়ন স্বত্ব প্রতিস্থাপন প্রভৃতি কৌশলসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উন্মুক্ত এলাকা সংরক্ষণের জন্য নতুন ড্যাপে ১০টি আঞ্চলিক পার্কের প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে। এছাড়া যানজট নিরসনের জন্য রিংরোডের প্রস্তাবনা, অযান্ত্রিক যানবহন চলাচলের জন্য নেটওয়ার্কের প্রস্তাবনা, এমআরটি লাইনের জন্য ডিপোর অবস্থান প্রস্তাবনা, মাল্টি-মোডাল স্টেশন প্রস্তাবনা প্রভৃতি নতুন ড্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ড্যাপ (২০১৬-৩৫) প্রণয়নে জনসাধারণের সরাসরি অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন এলাকায় অংশগ্রহণমূলক মতবিনিময় সভা বা সেশনের আয়োজন করা হয়েছে। তাছাড়া ড্যাপের খসড়া পরিকল্পনা প্রস্তাবকৃত হলে ২ মাসব্যাপী গণশুনানির আয়োজন করা হবে এবং প্রাপ্ত মতামতসমূহ সন্নিবেশিত করে নতুন ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
পূর্বের ড্যাপে নির্দেশিত ভূমি ব্যবহারের বিষয়ে জনসাধারণ হতে প্রাপ্ত প্রায় ৩ হাজার আবেদন যাচাই-বাছাই করে যৌক্তিক আবেদনগুলো থেকে নতুন ড্যাপ সংশোধন করা হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যমান স্থাপনা, জমির প্রকৃতি, জলাধার ও রাস্তাঘাটের অবস্থান প্রভৃতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন ড্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে।
শ ম রেজাউল করিম স্বদেশ খবরকে আরো বলেন, ইতোমধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়াধীন সব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সেবা সহজীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভবন নির্মাণ অনুমোদনের সময় ১৬৫ দিনের স্থলে ৫৩ দিনে নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজউকের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে পূর্বে ১৬টি সংস্থার কাছে যেতে হতো। অপ্রয়োজনীয় প্রতীয়মান হওয়ায় ১২টি সংস্থা রহিত করে দেয়া হয়েছে।
ভূমির ছাড়পত্র ও নামপত্তনের সময়সীমা ৭ দিন করা হয়েছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে এটা একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এর পাশাপাশি রাজউকের সব সেবা সম্পূর্ণ অটোমেশন পদ্ধতিতে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সেবা সহজীকরণ ও সেবাগুলো অনলাইনে প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
রাজউকের নতুন চেয়ারম্যান মো. সাঈদ নূর আলম স্বদেশ খবরকে বলেন, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। টিআইবি অভিযোগ করেছে, রাজউকে নিয়োগবাণিজ্য হয়। অথচ বর্তমান মন্ত্রী বা আমার সময়ে রাজউকে কোনো নতুন নিয়োগই হয়নি। সুতরাং বুঝাই যায়, অভিযোগটি মনগড়া ও বিদ্বেষপ্রসূত।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে রাজউক চেয়ারম্যান সাঈদ নূর আলম বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং তারাবো ও সাভার পৌরসভা ছাড়াও কালিগঞ্জ, সোনারগাঁও ও কাঞ্চন পৌরসভার অল্প কিছু এলাকা মিলে ১৫২৮ বর্গকিলোমিটারের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার পরিকল্পিত নগরায়ণের লক্ষ্যে রাজউকের জনবল রয়েছে কেবলমাত্র ১১৫৮ জন। এ সীমিত জনবল দিয়ে ঘনবসতিপূর্ণ বিশাল এলাকাকে ৮টি জোনে ভাগ করে কাজ করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। তাই শত সীমাবদ্ধতার মাঝেই প্রতিনিয়ত আমাদের কাজ করতে হয়।
সাঈদ নূর আলম স্বদেশ খবরকে আরো বলেন, আমি রাজউকের দায়িত্ব নেয়ার ১৫ দিনের মধ্যে টিআইবি এমন একটি প্রতিবেদন দিল। আমি দায়িত্ব নেয়ার আগের অবস্থা নিয়ে টিআইবি প্রতিবেদনটি দিলেও রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বিষয়টি নিয়ে আমি বিব্রত। স্বদেশ খবর-এর মাধ্যমে আমি মহানগরবাসীকে কথা দিচ্ছি, রাজউকের আগামী দিনের কার্যক্রম হবে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। রাজউকের সেবা নিতে এসে যেকোনো নাগরিক যদি হয়রানির শিকার হন, তাহলে সরাসরি আমার কাছে আসার জন্য তাদের অনুরোধ করছি। রাজউকে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ বাস্তবায়নে আমি সর্বান্তকরণে সচেষ্ট থাকবো। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমার সর্বোচ্চ অবস্থানের জন্যই সরকারপ্রধান আমাকে রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন বলে মনে করি। সরকারপ্রধানের সেই আস্থা ও বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষার্থে সর্বদা সচেষ্ট থেকে রাজউককে একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সাধ্যমতো চেষ্টা অব্যাহত রাখতে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

শেষ কথা
নগরবিদরা বলছেন, বাসযোগ্য রাজধানী গড়তে হলে রাজউককে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করাও জরুরি। অতিরঞ্জিত অভিযোগ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে, যা মোটেও কাম্য নয়। টিআইবির মতো দায়িত্বশীল সংস্থার উচিত হবে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সহকারে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করা। কারণ রাজউক আজকের প্রতিষ্ঠান নয়; ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এটি গড়ে উঠেছে। দুর্নীতি-অনিয়মও একদিনের বিষয় নয়। মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি অনিয়মে জড়িয়েই পড়ে তার জন্য পুরো প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা চলে না। তাছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক রাজউকের বর্তমান নেতৃত্ব অভ্যন্তরীণভাবেই বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। সুতরাং সীমিত জনবল দিয়ে বিশাল এলাকাব্যাপী রাজউকের সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে টিআইবিসহ সকলের এগিয়ে আসা উচিত।