প্রতিবেদন

সাড়ম্বরে সরস্বতী পূজা উদযাপিত

নিজস্ব প্রতিবেদক
এক হাতে বেদ, অন্য হাতে বীণা Ñ এই ‘বীণাপানি’ দেবীর সম্মুখে হাজির করে সরস্বতী পূজার সূচনা হয় ২৯ জানুয়ারি। শেষ হয় ৩০ জানুয়ারি। সরস্বতী পূজার দিন ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ডিসিসি নির্বাচন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দাবির প্রেক্ষিতে নির্বাচন ২ দিন পিছিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হয়। ফলে নির্বিঘেœ উদযাপিত হয় সরস্বতী পূজা।
বিদ্যাদেবীর কৃপা লাভের আশায় বাণী-অর্চনার মধ্য দিয়ে মাঘের শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে উদযাপিত হয় বিদ্যা ও ললিতকলার দেবী সরস্বতী পূজা। সনাতনধর্মীরা ঐশ্বর্যদায়িনী, বুদ্ধিদায়িনী, জ্ঞান-দায়িনী, সিদ্ধিদায়িনী, মোক্ষ-দায়িনী এবং শক্তির আধার বিশ্বাসে সরস্বতী দেবীর আরাধনা করে থাকেন। ঢাক-ঢোল-কাঁসর, শঙ্খধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পূজাম-প ও গৃহআঙ্গিনা।
সরস্বতী পূজা উপলক্ষে নানা থিম এবং বৈচিত্র্যময় অসংখ্য অস্থায়ী পূজাম-প তৈরি করা হয়। বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা, ব্যবসাবাণিজ্য, লোকজ সংস্কৃতি ইত্যাদি নানা থিম নিয়ে তৈরি ম-পে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় সরস্বতী পূজা। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় এ উৎসবকে ঘিরে দেশজুড়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। এদিন সারাদেশের মন্দির ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভক্তরা বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠার্থী দেবী সরস্বতীর পাদপদ্মে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন। ম-পে ম-পে পূজার আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও হাতেখড়ি, প্রসাদ বিতরণ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সন্ধ্যারতি, আলোকসজ্জা ও মেলা বসেছে। প্রতিটি পূজাম-পের বাণী অর্চনায় সমবেত হন নানা সাজে সজ্জিত নারী, পুরুষ, আবাল, বৃদ্ধ ও বনিতা। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধারণ করে হিন্দুদের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষও উৎসবে যোগ দেন।
সরস্বতী পূজার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল মাঠ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের আয়োজনে এ বছর জগন্নাথ হলে ৭০টির বেশি পূজাম-পে সরস্বতীর আরাধনা হয়। সেখানে ছিল শিক্ষার্থী, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল, ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল, কুয়েত মৈত্রী হল, শামসুন্নাহার হল ও কবি সুফিয়া কামাল হলেও আলাদা পূজাম-পে বিদ্যাদেবীর অর্চনা হয়েছে।
বরাবরের মতো এবারও জগন্নাথ হলের পুকুরের মাঝে বিশাল আকারের সরস্বতী প্রতিমা গড়ে চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দেবীকে দুধ, মধু, দই, ঘি, কর্পূর ও চন্দন দিয়ে স্নান করানো হয়। সেখানে কাঠ, বাঁশ, বোর্ড, দড়ি, কাগজ, বেত, শোলা ইত্যাদি উপকরণে নির্মিত ৩২ ফুট দীর্ঘ বিশাল প্রতিমা দৃষ্টি কেড়েছে দর্শনার্থীদের।
‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে সাজানো হয়েছিল গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ম-পটি। এই ম-পে বাংলাদেশের মানচিত্র ও গত বছর দেশে আলোড়ন তোলা ঘটনাগুলোর পেপারকাটিংও ছিল আকর্ষণের মূলে।
জগন্নাথ হল মাঠে সকাল ৯টার দিকে শুরু হয় বাণী অর্চনা। পুরোহিত ‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমল লোচনে/বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাংদেহী নমোহস্তুতে’ মন্ত্রপাঠ করে দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন। এরপর ভক্তরা দেবীকে পুষ্পাঞ্জলি দেন। এ সময় ভক্তদের মাঝে অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়। মন্ত্র পাঠ করিয়ে পুরোহিত শিশুদের হাতে কাশফুলের কলম ও রূপক দোয়াত তুলে দেন। ওই কলম দিয়ে মাটির সরায় (পাত্র) লেখার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু করে শিশু। একেই বলা হয় ‘হাতেখড়ি’।
ঢাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনেও সরস্বতী পূজা সাড়ম্বরে পালিত হয়। দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেয়ার পর ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। ঢাকা মেডিকেলের নার্সিং কলেজের উদ্যোগে ঘটা করে আয়োজন করা হয় সরস্বতী পূজা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরান ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাণী অর্চনা, পুষ্পাঞ্জলি ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয় সরস্বতী পূজা।
এছাড়া জয়কালী মন্দির রোডের রামসীতা মন্দির, ইসকন মন্দির, জজকোর্ট প্রাঙ্গণে ঢাকা আইনজীবী সমিতির ম-প, সচিবালয় পূজা উদযাপন ও কল্যাণ পরিষদের ম-প, সেগুনবাগিচার মহাহিসাব নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস পূজা উদযাপন পরিষদের ম-প, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা), ব্যাংকার্স পূজা পরিষদ, ঠাটারীবাজার শিবমন্দির, বিহারীলাল জিউ মন্দির, রাধাগোবিন্দ জিউ ঠাকুর মন্দির, রাধামাধব বিগ্রহ মন্দির, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, তিতুমীর কলেজ, বাংলা কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ইম্পেরিয়াল কলেজ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন ও স্কুল-কলেজে সরস্বতী পূজা আয়োজিত হয়।

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রোল মডেলÑপ্রধান বিচারপতি
৩০ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে সরস্বতী পূজা উদযাপন করা হয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অথিতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।
অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, হাইকোর্টের বিচারপতিগণ, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন ও সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ প্রমুখ আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেছেন, প্রতি বছর আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে এমন সুন্দর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সব বিচারপতিকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা হয় এবং তারা সবাই উপস্থিত হন। এতে প্রমাণ হয় বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি রোল মডেল।