প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০ উদ্বোধন এবং ২০১৯ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী : বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে সরকার

মেজবাহউদ্দিন সাকিল : স্বাধীনতার পর বাংলা একাডেমির খোলা প্রান্তরে পাকুড় গাছের নিচে (বর্তমান নজরুল মঞ্চ) স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদের ব্যানারে মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা চট বিছিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি বই বিপণন শুরু করেছিলেন, তা আজ বিশাল মহীরুহ। ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতি বছর ভাষার মাস শুরুর প্রথম দিন ১ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন হলেও ডিসিসি নির্বাচনের কারণে এবার উদ্বোধন ১ দিন পিছিয়ে যায়। ফলে ২ ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক বাংলা একাডেমির মাসব্যাপী গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন এবং খ্যাতিমান ১০ কবি ও সাহিত্যিকের হাতে ২০১৯ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার তুলে দেন।
অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যের মান আরো উন্নত করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে চায়। অমর একুশে বইমেলার মধ্য দিয়ে বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতিকে কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই নয়, বিশ্ব দরবারে পৌঁছাতে চায়।
সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। এছাড়া সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এ বছর বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলা ‘বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ’ পালন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, মন্ত্রিবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, বাংলা একাডেমির সদস্য, সাংবাদিক, লেখক, কবি, প্রকাশক এবং সিনিয়র সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বিগত ২০১৯ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ১০ কবি ও সাহিত্যিকের নিকট হস্তান্তর করেন।
পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন কবিতায় মাকিদ হায়দার, উপন্যাসে ওয়াসি আহমদ, প্রবন্ধ ও গবেষণায় স্বরোচিস সরকার, অনুবাদে খায়রুল আলম সবুজ, নাটকে রতন সিদ্দিকী, শিশুকিশোর সাহিত্যে রহীম শাহ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাহিত্যে রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, বিজ্ঞান উপন্যাসে নাদিরা মজুমদার, ভ্রমণ সাহিত্যে ফারুক মইনউদ্দিন এবং লোকসাহিত্যে সাইমন জাকারিয়া।
অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু রচিত তৃতীয় বই ‘আমার দেখা নয়া চীন’-এর মোড়ক উন্মোচন করেন। বইমেলা উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, ‘বইমেলা এখন কেবল বই কেনা-বেচার কেন্দ্র নয়, এটি বাঙালির প্রাণের মেলাও। বইমেলা উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত বাঙালিরা দেশে আসেন। বিদেশি নাগরিকরাও বইয়ের প্রতি বাঙালির নজিরবিহীন ভালোবাসা প্রত্যক্ষ করতে বাংলাদেশ সফরে আসেন। ছাত্রজীবনে আমি বইমেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি। তবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকায় এখন আমার সেই স্বাধীনতা নেই।’
প্রধানমন্ত্রী বইমেলা উপলক্ষে বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানান। বইমেলা থেকে কিছু পছন্দের বইও সংগ্রহ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের দ্রুত উন্নয়নের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা দ্রুত এগিয়ে চলেছি এবং আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছি। আমরা দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই এবং বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে সম্মান অর্জন করতে চাই। এখন কেউই আর বাংলাদেশকে অবহেলার চোখে দেখতে পাবে না। কারণ, সরকার গত ১১ বছর ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করছে। এটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় যে, রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করা বাংলাদেশকে কেউ খাটো করে দেখবে। আমরা একটি বিজয়ী জাতি এবং আমরা মাথা উঁচু করে এবং বিজয়ের চেতনা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলা ভাষাকে উপস্থাপনের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ১৯৫৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেয়ার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনার নির্মাণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন, বাংলার ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্যের দাবির আন্দোলন এবং ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ায় বঙ্গবন্ধুকে কারাভোগ করতে হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আতাউর রহমান খান, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস প্রমুখ পাকিস্তানের একটি প্রতিনিধি দল ১৯৫২ সালে এক শান্তি সম্মেলনে অংশ নিতে চীন সফর করেছিলেন। ‘আমার দেখা নয়া চীন’ শিরোনামের বঙ্গবন্ধুর বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সম্মেলনে জাতির পিতা প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। বইটিতে জাতির পিতা নতুন চীনের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী এমনকি শিশুসহ জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার কথাও বর্ণনা করেছেন। বঙ্গবন্ধু শুধু চীনে পর্যটক হিসেবেই সফর করেননি বরং তিনি বিভিন্ন বিষয় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। বইটিতে আমরা তাঁকে পর্যটক, পর্যবেক্ষক এবং একজন সমালোচক হিসেবে পেয়েছি।
শেখ হাসিনা বলেন, একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু চীনের বিকাশের চালচিত্র ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তিনি পূর্ববাংলার মানুষের দুর্দশার কথাও তুলে ধরেছিলেন। পাকিস্তানি শাসকদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরই জাতির পিতা চীন গিয়েছিলেন। তবে তিনি এ (নির্যাতন) সম্পর্কে কাউকে কিছু বলেননি, বরং তিনি দেশে (পূর্ব পাকিস্তানে) যা কিছু ঘটেছে ও ঘটছে সেসব বলেছিলেন। বলেছিলেন, বিদেশে এসে আমরা দেশের সমালোচনা করতে পারি না।
শেখ হাসিনা বলেন, তবে আজ আমরা দেখতে পাই, আমাদের দেশে অনেকে বিদেশিদের কাছে অভিযোগ করতে গিয়ে অতি উৎসাহী হয়ে যা ঘটেনি তাও বেশি করে বলে। আমরা এই প্রবণতাটি দেখি (কিছু লোকের মধ্যে)।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইটি পড়লে মানুষ নতুন চীন সম্পর্কে অনেক কিছু উপলব্ধি করতে পারবে এবং জানতে পারবে। চীন সফরের পরে বঙ্গবন্ধু চীন সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আজকের চীন ধীরে ধীরে সেই অবস্থানে পৌঁছেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি সম্মেলনের ছবি, মনোগ্রাম এবং তথ্য সংগ্রহ করে বইটি প্রকাশে সহায়তার জন্য কবি তারিক সুজাতকে ধন্যবাদ জানান।
শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারির স্বীকৃতি অর্জনের ক্ষেত্রে সরকার এবং কানাডাপ্রবাসী কিছু বাংলাদেশির প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে বলেন, কানাডাপ্রবাসী প্রয়াত রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামের প্রচেষ্টা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আন্তরিক চেষ্টার ফলে ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১ নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
প্রধানমন্ত্রী অমর একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজনে জড়িত বাংলা একাডেমি এবং দেশি-বিদেশি প্রকাশকসহ সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ভাষা আন্দোলনের পথ অনুসরণ করে ১৯৫৫ সালে ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। একুশে গ্রন্থমেলাটি ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বহনকারী ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা যায়, এ বছর মেলার জন্য নির্ধারিত জমিটি ৮ লাখ বর্গফুটে সম্প্রসারিত করে মোট ৮৭৩টি ইউনিটের মাধ্যমে ৫৬০ সংস্থাকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ১২৬টি প্রতিষ্ঠানকে বাংলা একাডেমি মাঠে ১৭৯টি ইউনিট এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৪৩৪টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৯৪টি ইউনিট বরাদ্দ দিয়েছে। পাশাপাশি ৩৪টি প্যাভিলিয়নও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
বইমেলা সপ্তাহের রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। শুক্র ও শনিবার সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং ২১ ফেব্রুয়ারি মেলা সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে।