প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কঁতে’র সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক : ঢাকা-রোম সহযোগিতা বৃদ্ধিতে ঐকমত্য: রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ইতালি ও ইইউ’র সমর্থন কামনা

মো. শহীদ উল্যাহ : ঢাকা ও রোম বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কঁতে’র সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এই ঐকমত্য হয়। বৈঠকে ইতালি রোহিঙ্গাদের সহায়তায় বর্তমান সহযোগিতার অতিরিক্ত আরো ১০ লাখ ইউরো দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ সহায়তা ইউএনএইচসিআর-এর মাধ্যমে দেয়া হবে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন পালাজ্জো চিগিতে ৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বৈঠকে উভয় প্রধানমন্ত্রী দু’দেশের পারস্পরিক স্বার্থে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রায় ১ ঘণ্টার বৈঠকে তাঁরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক দিক নিয়ে আলোচনা করেন এবং দু’দেশের মধ্যকার বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থানে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর আলোচনাকে ‘ফলপ্রসূ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এর মধ্য দিয়ে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনাকালে জিউসেপ কঁতে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ায় শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া আপনার ‘সুপার হিউম্যান’ উদ্যোগ।
শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের নির্দেশনা মেনে চলতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে ইতালিসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। ইতালিকে ‘বাংলাদেশের মহান বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর তাৎক্ষণিকভাবে যে ক’টি ইউরোপীয় দেশ প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ইতালি তার অন্যতম। আমার এ সফরের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার হবে বলে আমি আশা করি।
বৈঠকে জিউসেপ কঁতে বিদ্যুৎ ও প্রতিরক্ষা খাতে দু’দেশের সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ইতালি অনেক পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির প্রস্তাব দিতে পারে।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ব্যাপক আকারে বিনিয়োগের জন্য ইতালির প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে সে দেশের উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগবান্ধব নীতি বিদ্যমান রয়েছে। এ সুযোগ গ্রহণ করে ইতালির বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিশাল আকারে বিনিয়োগ করতে পারেন।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার দেশব্যাপী ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছে। ইতালির উদ্যোক্তারা এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলেও বিনিয়োগ করতে পারেন।
শেখ হাসিনা দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা সহজ করতে ইতালি সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান এবং ইতালি বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য আমদানি করতে পারে। যুক্তরাজ্যের পর ইতালিতেই সর্বোচ্চসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে। তারা উভয় দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে। বাংলাদেশ অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে অঙ্গীকারবদ্ধ।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্পর্কে ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে বলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।
জিউসেপ কঁতে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি ইতালিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রশংসা করে বলেন, ‘তারা কঠোর পরিশ্রমী’।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় হলি আর্টিজান ক্যাফেতে হামলার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ায় বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানান। ২০১৬ সালের ১ জুলাই এ হামলায় ইতালির ৯ জন নাগরিকসহ ২২ ব্যক্তি নিহত হয়।
জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ হামলাকারীদের দমন করা হয় এবং এ ঘটনার পর থেকে সন্ত্রাসবাদ বাংলাদেশে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সন্ত্রাসকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সরকার এ সামাজিক অভিশাপের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক প্রচার অভিযান চালাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষের কর্মসূচিতে যোগদানের জন্য ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান। দুই প্রধানমন্ত্রীর এ বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, রোমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আব্দুস সোবহান সিকদার এবং পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালাজ্জো চিগিতে পৌঁছলে প্রাসাদের রক্ষীরা তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। এ সময় দু’দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কঁতে’র
বৈঠক শেষে দেয়া ৯ দফা যৌথ বিবৃতি
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কঁতে’র মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে ৯ দফা যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়।
যৌথ বিবৃতিতে দেয়া ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্থায়ী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে ইতালিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ইতালিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান।
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, উভয় পক্ষই রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে গত ২৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক আদালতের দেয়া সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন কামনা করেছেন। জিউসেপ কঁতে ইতালির পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশের অনুসৃত অতিথেয়তার নীতি অব্যাহত রাখতে এই জরুরি মানবিক অবস্থা মোকাবিলা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎসাহ প্রদানে জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ইতালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার কথা উল্লেখ করেন।
যৌথ ঘোষণায় আরো বলা হয়, দুই প্রধানমন্ত্রীর ৫ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হয়েছে। উভয় পক্ষই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশের মধ্যে উন্নয়ন, শ্রম ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আরো নিবিড় সহযোগিতার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছে। দুই নেতা ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক নীতির আওতায় ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেন।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বিনিময়ের ইতিবাচক উন্নয়নের যৌথ ঘোষণায় আরো বলা হয়, বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে বিনিময়ের সার্বিক অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে, যা প্রায় ২ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা স্বীকার করে বিবৃতিতে দুই প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে সার্বিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বেড়ে ২ বিলিয়ন ইউরোর ওপরে দাঁড়িয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের কথা স্বীকার করেন, যার লক্ষ্য ২০২৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের করে আনা।
বিবৃতিতে বলা হয়, উভয় পক্ষই টেক্সটাইলসহ বাংলাদেশে ইতালীয় সংস্থাগুলোর উপস্থিতির প্রশংসা করেন। উভয় নেতাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ইতালি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বিশেষ করে তৈরী পোশক খাত, ওষুধ শিল্প, হালকা প্রকৌশল, চামড়া, হাইটেক এবং প্রচলিত ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উভয় খাতে সমৃদ্ধকরণে নিজস্ব আস্থা ব্যক্ত করেন।
ব্লু ইকোনমির ক্ষেত্রটিকেও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একই সঙ্গে ইতালির আউটরিচ কার্যক্রম ভারত মহাসাগর রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, উভয় নেতাই ইতালিতে ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশির অবস্থানের কথা স্মরণ করেন, যাদের বেশিরভাগই ইতালীয় সামাজিক কাঠামোয় সুসংহত। আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অভিবাসনের ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরো সুদৃঢ় করার দিকে নিবদ্ধ ছিল।
দুই প্রধানমন্ত্রী অভিবাসন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত লড়াইয়ের সম্ভাব্য আইনি পথের বিষয়ে কথা বলেন। তাঁরা জাতিসংঘের আওতার মধ্যে ইতালি ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতার ইতিবাচক মাত্রার প্রশংসা করেন, যেখানে উভয় দেশই পরম্পরাগতভাবে একে অপরের প্রার্থীতার সমর্থক।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) পদমর্যাদার থেকে উত্তরণ হওয়ার পরও ইইউ’র পণ্যবাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে ইতালির সমর্থন চেয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রী সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় চুক্তি (সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি, রাজনৈতিক পরামর্শ, কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা) সম্পর্কিত চলমান আলোচনার বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করেন। উভয় পক্ষই আলোচনা জোরদার করতে সম্মত হন।
উভয় নেতাই ২০২২ সালে বাংলাদেশ এবং ইতালির কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তীকে গুরুত্ব প্রদান করেন। তাঁরা সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর নিজ নিজ উদ্যোগে উভয় দেশের রাজধানীতে একত্রে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই ইভেন্টটি উদযাপনেরও আহ্বান জানান।
দুই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে মুজিববর্ষ উদযাপনেরও উল্লেখ করেন (১৭ মার্চ ২০২০ সাল থেকে ২৬ মার্চ ২০২১ সাল)।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষ উদযাপনকালে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিওসেপ কঁতে’কে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। কঁতে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোয় শেখ হাসিনাকে উষ্ণ ধন্যবাদ জানান।

ইতালি আওয়ামী লীগ ও প্রবাসীরা সংবর্ধনা দিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে
৪ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় রাতে রোমের পার্কে দ্য প্রিনসিপি গ্র্যান্ড হোটেল অ্যান্ড স্পাতে আওয়ামী লীগের ইতালি শাখা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেয়। সংবর্ধনায় দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এখন আর কারো কাছে ভিক্ষা চাই না। বরং আমরা নিজেরা সক্ষমতা অর্জন করেছি। এখন আমাদের আর কেউই পেছনে টেনে নিতে পারবে না, আমরা এগিয়ে যাব।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পের শতকরা ৯০ ভাগ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। এখন আর দাতারা আমাদের ভিক্ষা দিতে আসে না। বরং তারা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী অভিহিত করে সহযোগিতা দিতে আসে। কারণ কারো কাছে আমরা ভিক্ষা চাই না।
নিজস্ব অর্থায়নে সরকারের পদ্মাসেতু নির্মাণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো কাজ যে আমরা করতে পারি, তা ইতোমধ্যে আমরা প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছি।
পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংক সরকারকে বদনাম দিতে চেয়েছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে বলেছিলাম, আমরা নিজস্ব অর্থায়নেই এই সেতু নির্মাণ করব। এখন আমরা নিজস্ব অর্থেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি।
বিদেশে যাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়, প্রবাসীদের সেভাবে নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের আচার-আচরণ, ব্যবহার সব কিছুতে যেন দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়।
প্রত্যেক উপজেলা থেকে আরও ১ হাজার করে লোক প্রবাসে পাঠাতে সরকার একটা উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
এমআরপি পাসপোর্টের পর এখন ই-পাসপোর্ট চালুর কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখন ই-পাসপোর্টের যুগ, আমরা ইতোমধ্যে ই-পাসপোর্ট দেয়ার কাজ শুরু করে দিয়েছি। যাতে কেউ আর ধোঁকায় না পড়ে, সে ব্যবস্থাও আমরা করে দিয়েছি।
বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি যে, প্রবাসী কেউ যদি দেশে যায় বিমানবন্দরে মাঝে মধ্যে খুব হয়রানির শিকার হতে হয়। আসলে আমাদের দেশের কিছু মানুষের চরিত্রই খারাপ। যে-ই শুনে বাইরে থেকে আসবে, তখন ভাবে একটু চাপ দিলে বোধহয় ডলার পাওয়া যাবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, ইতালি আওয়ামী লীগ সভাপতি ইদ্রিস ফরাজি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন হোসনে আরা বেগম। উপস্থিত ছিলেন ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবদুস সোবহান শিকদার।

রোমে বাংলাদেশ চ্যান্সেরি ভবন
উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোমে বাংলাদেশ দূতাবাসের নতুন চ্যান্সেরি ভবন উদ্বোধন করেন। ইতালির রাজধানীর ভিয়া ডেল অ্যান্ট্রাটাইড এলাকায় ২৩ দশমিক ৯ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ৫ তলা চ্যান্সেরি ভবনটি অবস্থিত। চ্যান্সেরি ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সময় দেশ ও জাতির অব্যাহত শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, রোমে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত আব্দুস সোবহান সিকদার, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এবং দূতাবাসের সিনিয়র কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী চ্যান্সেরি ভবনে পৌঁছে প্রথমে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে দূতাবাস প্রাঙ্গণে স্থাপন করা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর তিনি চ্যান্সেরি ভবনের অভ্যন্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কঁতের আমন্ত্রণে ৪ দিনের সরকারি সফরে ৪ ফেব্রুয়ারি রোম পৌঁছান। পর দিন ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি জিউসেপ কঁতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। বৈঠকে সাংস্কৃতিক বিনিময়, রাজনৈতিক বিষয় এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্পর্কিত তিনটি চুক্তির বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
৫ ফেব্রুয়ারি রোমের ভিয়া ডেল’ অ্যান্ট্রাটাইড এলাকায় বাংলাদেশ দূতাবাসের চ্যান্সরি ভবন উদ্বোধন করেন। একই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কঁতে’র সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন পালাজো চিগিতে আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেন। পরে ইতালীয় ব্যবসায়িক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিগণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আবাসকালীন হোটেলের সভাকক্ষে সাক্ষাৎ করেন।
প্রধানমন্ত্রী একই হোটেলে ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেন। ৬ ফেব্রুয়ারি পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর প্রধানমন্ত্রী ট্রেনে রোম থেকে ইতালির মিলান শহরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। মিলানে তিনি এক্সেলসিয়ার হোটেল গালিয়ায় অবস্থান করেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে আমিরাত এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে মিলান মালপেন্সা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ৮ ফেব্রুয়ারি দুবাই হয়ে বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা ১০ মিনিটে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।