ফিচার

করোনা ভাইরাস: দরকার সচেতনতা

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ : প্রায় ২০০ প্রজাতির ভাইরাসের এক বিশাল পরিবার করোনা ভাইরাস, যা একক কোনো ভাইরাস নয়। সাধারণত বন্য প্রাণীর দেহে এরা বসবাস করে। এ পর্যন্ত পশু-পাখি থেকে বিভিন্ন সময়ে মাত্র ৬ ধরনের করোনা ভাইরাস মানবদেহে ছড়িয়েছে। এর আগে অজান্তে কেউ হয়ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং ভাইরাল ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সাধারণ সর্দি-কাশি, জ্বর হয়ে কয়েক দিনের মধ্যে হয়ত ভালো হয়ে গেছে। করোনা ভাইরাসের সেই প্রজাতিগুলো খুব একটা মারাত্মক না হওয়ায় হয়ত বা তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীনে পাওয়া মানবদেহে সংক্রমণকারী এক ধরনের করোনা ভাইরাস আতঙ্ক ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী।

নতুন প্রজাতি
চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানের একটি সামুদ্রিক মাছের বাজার থেকে গত ৭ জানুয়ারি নতুন এক প্রজাতির করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে, যার নাম দেয়া হয়েছে ২০১৯-হঈঙঠ বা ঁিযধহ ঈঙজঙঘঅ ারৎঁং। যদিও ওটি সামুদ্রিক মাছের বাজার, তবে সেখানে অবৈধভাবে বিভিন্ন বন্য পশু-পাখি যেমন বাদুড়, সাপ, কুকুর, শিয়াল প্রভৃতি বিক্রি করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, বাদুড় বা ক্রেইট (এক ধরনের সাপের প্রজাতি) থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। তবে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র থেকে সে প্রমাণ মেলেনি।
জানা গেছে, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর প্রথম রোগী শনাক্ত হয় এবং ১ জানুয়ারি ওই মাছ ও বন্য প্রাণীর বাজার সরকারিভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। অর্থাৎ প্রায় ১ মাস ধরে বাজারে আসা কয়েক লাখ মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। তবে যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের সবাই যে মারা গেছে তেমন নয়। এখন পর্যন্ত ২০১৯-হঈঙঠ করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্তের সংখ্যার সাথে সংক্রমণজনিত মৃতের অনুপাত দু-তিন ভাগের বেশি নয়।

যেভাবে ছড়ায়
সম্প্রতি চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, নভেল করোনা ভাইরাসের মূল বাহক সম্ভবত বাদুড়। কিন্তু সরাসরি বাদুড় থেকে সংক্রমণ না-ও ছড়িয়ে থাকতে পারে। বাদুড় থেকে মানুষের দেহ পর্যন্ত পৌঁছতে আরো কিছু প্রাণীর সাহায্য নেয় ওই ভাইরাস। এরপর ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংস্পর্শের মাধ্যমে এক মানুষ থেকে অপর মানুষে ছড়াতে পারে। বিশেষ করে হাঁচি, কাশি, লালা বা থুতু থেকে সরাসরি ভাইরাসটি সংক্রমিত হতে পারে। অন্যদিকে ভাইরাসযুক্ত হাত দিয়ে দরজা, খাট বা মোবাইল ফোন ধরলেও পরোক্ষভাবে আরেকজনের মধ্যে সেটি ছড়াতে পারে।

লক্ষণ
করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার পর থেকে প্রথম দুই সপ্তাহ রোগীর মধ্যে তেমন কোনো লক্ষণ সাধারণত প্রকাশ পায় না। এটাই চ্যালেঞ্জ। তবে জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট Ñ এই ৩টি হলো করোনা ভাইরাসের মূল লক্ষণ। হঠাৎ করে আসা জ্বরের সঙ্গে চোখের পেছনে এবং পুরো মাথা ও শরীরে ব্যথা হতে পারে। নাক দিয়ে পানি ঝরা এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মাত্রায় শুকনো কাশি (পরবর্তী সময় কফ) থাকতে পারে।
এই রোগ হলে অ্যাজমা না থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। তবে যাদের অ্যাজমা বা হার্টের সমস্যা রয়েছে, তাদের ওপরের লক্ষণগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া পেশিব্যথা, তীব্র মাথাব্যথা, হতাশাগ্রস্ততা, গলাব্যথা ইত্যাদি সমস্যাও থাকতে পারে। আবার কোনো লক্ষণ ছাড়াও কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন।

ঝুঁকি বেশি যাদের
করোনা ভাইরাস দ্বারা যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে। তবে শিশু, বৃদ্ধ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের রোগী, ক্যান্সার, কিডনি, হার্ট, লিভার ফেইলিওর রোগী অর্থাৎ যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম তাদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা এবং মৃত্যুঝুঁকি বেশি।

চিকিৎসা
করোনা ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। সাধারণ লক্ষণগুলো দেখে সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দেয়া হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমই এই রোগ মোকাবিলা করে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা ঝুঁকিতে থাকে বেশি।
জটিলতা
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস ইত্যাদির সমস্যা হতে পারে। নিউমোনিয়া হয়ে ফুসফুসে পানি জমে যেতে পারে বা ফুলে যেতে পারে। তাছাড়া জ্বর ও কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট থাকায় অনেক রোগী সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
তখন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হয়।

আতঙ্ক নয়
মোটামুটি সব ধরনের ভাইরাসজনিত সংক্রমণের (ইনফ্লুয়েঞ্জা, করোনা) লক্ষণ বা উপসর্গ একই রকম। তাই সর্দি-কাশি বা ঠা-া লাগলেই যে সেটা উহান ২০১৯-হঈঙঠ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ Ñ এমনটি না-ও হতে পারে। তাই অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতন হতে হবে এবং কারো এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে।

আক্রান্তরাও সুস্থ হয়েছেন
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলেই যে মৃত্যু অবধারিত, তা কিন্তু নয়। আক্রান্ত অনেকেই এরই মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়েছেন।
চীন কর্তৃপক্ষ বলেছে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছে তাদের বেশিরভাগই হয় বয়স্ক ব্যক্তি, না হয় বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিল।
প্রতিরোধে করণীয়
এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের কার্যকর কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রতিরোধের চেষ্টা করাই সবচেয়ে ভালো উপায়।
করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কিছু পরামর্শ দিয়েছে। এ জন্য কিছু করণীয় হলোÑ
প্রথম কাজ হলো ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকটিতে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা। সবারই উচিত, দিনে কয়েকবার সাবান-পানি দিয়ে হাত-মুখ ধোয়া। বিশেষ করে বাইরে থেকে এলে বা রোগীর সংস্পর্শে এলে সাবান না থাকলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
নাক ও মুখ ভালোভাবে ঢেকে রাখুন। সাবান ও পানি ব্যবহার করে হাত পরিষ্কার করুন। হাত না ধুয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করবেন না।
কাশি ও হাঁচি দেয়ার সময় মুখ ও নাকে টিস্যু দিয়ে আচ্ছাদিত করে তাৎক্ষণিকভাবে সেই টিস্যু ফেলে দিন এবং হাত ধুয়ে ফেলুন।
ফেস মাস্ক কিছুটা সুরক্ষা দেয় বলে বাইরে বের হলে ফেস মাস্ক পরে বের হোন। সংক্রমিত ব্যক্তি এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি উভয়েরই এই ফেস মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। ভালো হয় ঘ-৯৫ মাস্ক হলে। সেটা না হলেও অন্ততপক্ষে সার্জিক্যাল মাস্ক পরুন।
অসুস্থ ব্যক্তিদের থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখুন। তাদের ব্যবহৃত বাসন ব্যবহার করবেন না এবং তাদের স্পর্শ করবেন না।
হাঁস-মুরগি বা অন্য যেকোনো প্রাণী, বিশেষ করে যদি রোগাক্রান্ত হয়, তাহলে সেগুলো থেকে দূরে থাকুন।
জীবন্ত প্রাণী ও প্রাণীর দেহসংশ্লিষ্ট সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। প্রাণীর সংস্পর্শে এলেও পরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন। বিশেষ করে যারা কাঁচা মাংস বিক্রির মতো কাজে জড়িত।
কাঁচা বা স্বল্প রান্না করা পশুর মাংস, দুধ, ডিম খাবেন না।
যারা অসুস্থ, বিশেষ করে জ্বর ও কাশিতে আক্রান্ত, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন।
তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র থেকেও দূরে থাকুন।
প্রচুর পানি পান করুন, প্রতিদিন হাত-মুখ ধোন, গোসল করুন।
কারো যদি জ্বর ও কাশি থাকে এবং শ্বাস নিতে সমস্যা হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
রিস্ক জোন (অর্থাৎ চীন) বা অন্য কোনো দেশে সম্প্রতি ভ্রমণ করে থাকলে তা চিকিৎসককে জানান।
এই ভাইরাস যেখানে ছড়াচ্ছে, বিশেষ করে চীনে, সেখানে যাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
ঘর সব সময় পরিষ্কার রাখুন এবং বাইরে থেকে আনা জিনিসগুলোও পরিষ্কার করে ঘরে ঢোকান।
লেখক: বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক