রাজনীতি

খালেদা জিয়ার বন্দি জীবনের ২ বছর : নিষ্ক্রিয় বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বন্দি জীবন শুরু হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি বন্দি জীবনের ২ বছর পূর্ণ করলেন তিনি। দীর্ঘ এই ২ বছরে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও আইনি ব্যর্থতার পাশাপাশি কার্যকর বিরোধীদল হিসেবে সরকারের সুনির্দিষ্ট ব্যর্থতাকে পুঁজি করে তাঁর মুক্তির বিষয়ে বড় ধরনের কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। সর্বশেষ সিটি নির্বাচনে কম ভোটারের উপস্থিতি নিয়ে আওয়ামী লীগ উদ্বিগ্ন হলেও বিএনপি দায়সারা একটি হরতাল ডাকা ছাড়া আর কোনো কর্মসূচিই দিতে পারেনি। তারা এক প্রকার ধরেই নিয়েছে, সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচিকে কিছুতেই সফল বলা যাবে না। তাদের আরও শক্তিশালী ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন ছিল। তারা তা করতে পারেনি। দেশবাসীকে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার প্রতি সহানভূতিশীল করতে পারেনি বিএনপি।
এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে নানা সমালোচনা। বর্তমানে খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ২৫ জানুয়ারি এই হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তাঁর বোন সেলিমা রহমান জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতেও কবে নাগাদ খালেদা জিয়া মুক্তি পেতে পারেন সে বিষয়ে বিএনপি নেতারা স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সাজা দেন। ওইদিনই তাকে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়া হয়। পরে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের কারাদ-াদেশ বাতিল চেয়ে করা আপিলে সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে উচ্চ আদালত। ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে আনা হয়। এখন পর্যন্ত তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দলের নেত্রীকে কারাগারে নেয়ার পর থেকে বিএনপি কিছুদিন লাগাতার অনশন, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এক পর্যায়ে কর্মসূচি পালন থেকে সরে আসে বিএনপি। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে নামমাত্র কিছু কর্মসূচি পালন করে আসছে তারা। এভাবে ২ বছর দায়সারা কর্মসূচি পালন করলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর তেমন কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি বিএনপি। বিষয়টি দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে স্বীকারও করেছেন বিএনপি নেতারা।
মানবিক বিবেচনায় খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য তাঁর জামিন চেয়েছিলেন আইনজীবীরা। এ বিষয়ে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানি হয়। শুনানি শেষে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়। জামিন আবেদন খারিজ করা হলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণে বলে, যদি আবেদনকারী (খালেদা জিয়া) প্রয়োজনীয় সম্মতি দেন, তাহলে মেডিকেল বোর্ড দ্রুত তার অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্টের (বায়োলজিক এজেন্ট) জন্য পদক্ষেপ নেবে, যা বোর্ড সুপারিশ করেছে।
খালেদা জিয়াকে যেদিন কারাগারে পাঠানো হয় সেদিন বড় কোনো প্রতিবাদ হয়নি। তারপর থেকে কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে নেতাদের মধ্যে সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়নি। যদিও প্রথম দিন থেকেই বিএনপি তাদের নেত্রীকে মুক্ত করার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে আসছিলো এবং শুরুর দিকে দলের নেতাকর্মী ও আইনজীবীরা আশাবাদী থাকলেও ধীরে ধীরে তারা আশাহত হন। বিএনপি নেতাকর্মী এবং আইনজীবীরা এখন ধরেই নিয়েছেন, সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় বা আন্দোলনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা বিএনপির পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবিতে বিগত ২ বছরে মানববন্ধন, অনশন, বিক্ষোভ, সভা-সেমিনার ছাড়া রাজপথে বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। কোনো কোনো কর্মসূচি সরকারের অনুমতি না পেয়ে পালনই করার সাহস দেখায়নি অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলটি। আদালতেও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেনি দলের আইনজীবী প্যানেল।
আইনজীবীদের মতে, বিএনপি চেয়ারপারসন কেবল দুই মামলায় জামিন পেলে কারামুক্ত হতে পারবেন। একটি হলো ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা, যেটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন। অপরটি হলো জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা। যে মামলায় ৭ বছরের দ- হয়েছে তাঁর। মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগে আপিল বিচারাধীন অবস্থায় আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি বিষয়ে তার আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যরা সক্রিয় হলেও বিএনপির শীর্ষ নেতারা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে সমঝোতাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। কিন্তু সেখানেও তারা সফল হতে পারছেন না।
বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, শীর্ষ নেতারা সরকারের কাছে পুরোপুরি বিক্রি হয়ে গেছেন। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তারা কোনো আন্দোলন করবেন না Ñ এমন মুচলেকা দিয়ে বসে আছেন। এর বিনিময়ে তারা সরকারের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা নিচ্ছেন। কেউ গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলছেন, কেউ বাড়ি বা ব্যবসা রক্ষা করছেন, কেউ নতুন ব্যবসায় নামছেন। এর বিনিময়ে তারা বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় করার কাজ থেকে বিরত থাকছেন। ফলে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি এখন নড়বড়ে। সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী না হওয়ায় অন্তত ঢাকা উত্তরে দলটি মেয়র পদ ছিনিয়ে নিতে পারেনি। সরকারের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতার কারণে নির্বাচনের দিন ঢাকা উত্তরে কোনো কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতা এমনকি মধ্যম সারির নেতাদেরও ভোটকেন্দ্রে দেখা যায়নি।
দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপির শীর্ষ নেতারা যতদিন এই বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি পরিহার না করবেন, ততদিন খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে না। কারণ সরকার তো আর সেধে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যবস্থা করবে না! সরকারকে বাধ্য করার যে কাজটি বিএনপি নেতাদের করার কথা, সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে সে পথটি বন্ধ করে রেখেছে তারা নিজেরাই।